সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে স্কেলের মূল বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসংক্রান্ত হিসাব কষতে হিমশিম খাচ্ছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার! এজন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি বারবার বৈঠক করেও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারছে না। গতকালও সচিবালয়ে এ-সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুপারিশমালা চূড়ান্ত করতে এ মাসে আরো দুই-তিনটি বৈঠকের প্রয়োজন হবে। মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে চলমান আর্থিক সংকটের কারণে ড. ইউনূস সরকার ঘোষিত পে স্কেলের রূপরেখা সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারছে না নির্বাচিত সরকার। অনেকটা বাধ্য হয়েই কিছু কাটছাঁট করবে। এজন্য সুপারিশ করা গ্রেডগুলোতে মূল বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা এবং ভাতাদিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত পে স্কেল বাস্তবায়ন তিন ধাপে করা হতে পারে। যদিও এতে প্রযুক্তিগত কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেসব অসুবিধা কাটিয়ে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে সচিব কমিটি। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করবে সরকার। তবে ১ জুলাই থেকেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন দেখিয়ে সে হিসেবে বেতন-ভাতাদি প্রাপ্য হবেন সরকারি চাকুরেরা।
আরো পড়ুন
বিদ্যুৎ নিয়ে চরম অস্বস্তি
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘সচিব কমিটি এখনো সুপারিশমালা জমা দেয়নি। তাদের হয়তো আরো কিছু সময় লাগবে।’
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা হয়তো এক বা দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সচিব কমিটি সে বিষয়টিও দেখছে। এখানে তিন ধাপ পর্যন্তও প্রয়োজন হতে পারে।’
এদিকে এসব কারণে নতুন পে স্কেলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হলেও গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করা সম্ভব হয়নি। অথচ পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিন কাটছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন পেনশনভোগীরা। কেননা তারা বর্তমানে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তাই সরাসরি কোনো তথ্য পান না। নির্ভর করতে হয় গণমাধ্যমের ওপর। ফলে পে স্কেলের সর্বশেষ তথ্য জানতে বারবার ফোন করেন গণমাধ্যমকর্মীদের।
আরো পড়ুন
ভারত-জাপান উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে সরকার নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। তবে বেতন বৃদ্ধির ধরন, কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে, কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে এবং কবে গেজেট প্রকাশ হবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। এজন্য সচিব কমিটি ধারাবাহিক সভা করে আসছে। সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে বর্তমান সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাসিক বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্রাচুইটি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে মূল বেতনকে কয়েক ধাপে ভাগ করে কার্যকর করতে গেলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেটাও বেশ জটিল কাজ। গতকালের সভায় এসব বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো তা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আবদুল মালেক বলেন, ‘২০১৫ সালের পে স্কেল বাস্তবায়নের সময় বেশির ভাগ কাজ ম্যানুয়ালি করা হতো। তখন সার্ভিস বুক ও সংশ্লিষ্ট নথিতে হাতে বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। বর্তমানে সবকিছু প্রযুক্তিনির্ভর। যদি প্রথম ধাপে ৫০ বা ৬০ শতাংশ মূল বেতন দেওয়া হয় এবং পরে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর হয়, তাহলে দুই দফায় পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে একযোগে এ পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল।’
আরো পড়ুন
বিভক্তি নয়, দেশ বাঁচাতে ঐক্য চাই
সরকারের অবস্থান কী? : প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল যথাসময়ে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। সে অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তবে গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। শুধু জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
আরো পড়ুন
সোনা চোরাচালানে ৫০ মাফিয়া
একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর হবে। তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে কিংবা বেতন বৃদ্ধির হার কত হবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
বাজেট বক্তৃতায় ছিল ১ জুলাইয়ের ঘোষণা
নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সেই বাজেট ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তবে পে স্কেলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি করা সম্ভব হয়নি।
গেজেট প্রকাশ কবে?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, পে স্কেলের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক পর্যালোচনা শেষে গেজেট প্রকাশে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। কেননা বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশমালাই এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
আরো পড়ুন
শনাক্ত হয়নি শীর্ষ সন্ত্রাসী খুনে জড়িতরা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পে স্কেলের কাঠামো, বাস্তবায়নের ধাপ, আর্থিক প্রভাব এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত গেজেট জারি করা হবে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, গেজেট কিছুটা দেরিতে প্রকাশ হলেও কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে গণনা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা বকেয়াসহ বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।
আগের কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?
২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। সে অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার সেই সুপারিশ হুবহু গ্রহণ করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি দেশের রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন খসড়া তৈরি করেছে। বর্তমানে সেই খসড়ার ভিত্তিতেই গেজেট চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
অন্যদিকে সদ্য শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন, গ্রাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
আরো পড়ুন
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, নতুন পে স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা এবং পেনশনভোগীদের সমন্বিত সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হবে। তবে পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য বাজারচাপ মোকাবেলা করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’
আরো পড়ুন
রোনালদোর বিদায় শেষ আটে স্পেন
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ১৪ লাখ চাকরিজীবী : সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ছিল নতুন অর্থবছরের শুরুতেই গেজেট প্রকাশ এবং বেতন বৃদ্ধির কাঠামো স্পষ্ট হবে। কিন্তু জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চললেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে বেতন কত বাড়বে, কোন ধাপে কার্যকর হবে, ভাতা কখন যুক্ত হবে এবং অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
হাবিবুর রহমান নামে অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার মতো যারা এখন আর সার্ভিসে নাই তারা তো গণমাধ্যম ছাড়া সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত বা তথ্য জানতে পারি না। পে স্কেলের বিষয়টা যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে।’
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন