কুড়ি বছর পর গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপি নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করল। দেশের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটে, বিশেষ করে ইউনূস সরকারের দেড় বছরের অপশাসনের কারণে দেশে যখন দারিদ্র্য বেড়েছে, বিনিয়োগ বন্ধ, বেকারত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনজীবনে চরম বিপর্যয়, সেই সময়ে দেশের সবাই তাকিয়ে ছিল এই বাজেটের দিকে। প্রস্তাবিত বাজেট কিছুটা হলেও জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি খাত উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
যেকোনো অসুখ সারাতে প্রথম দরকার রোগ নির্ণয়। অর্থমন্ত্রী বাজেটে অর্থনৈতিক সংকটের কারণ সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন। আর এই অসুখ সারাতে তিনি যে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন সেটাও সঠিক। তিনি সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছেন, অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলতে হলে বেসরকারি খাতকে সতেজ করতে হবে। হতাশাগ্রস্ত, নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাতই যে অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের মূল চাবিকাঠি তা বাজেটে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়া এবং কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি করা এ বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। নিয়মনীতি বা আইনি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অযথা বিলম্ব দূর করে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্য রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে।
শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপণ্যে ০.৫ শতাংশ উৎসে কর, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইলেকট্রিক যানবাহন খাতে করছাড় প্রশংসনীয়। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধান অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ সাধুবাদযোগ্য। এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন চালু প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেটে টার্নওভার কর ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে সহজ করবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই বাজেট যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। তবে, বাজেট বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং অতীতের আবর্জনা পরিষ্কার করা হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসায়য়ীদের আস্থা ফেরাতে হবে।
ইউনূস সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মব সন্ত্রাস করে বহু কলকারখানা লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। লাখ লাখ শ্রমিক মুহূর্তেই বেকার হয়ে যায়, ইউনূস সরকারের আমলে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলাসহ অসংখ্য হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে তাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলা হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তারা কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। ইউনূস সরকারের দেড় বছরের নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়িয়ে বিনিয়োগের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিলেন ইউনূস সরকারের নিযুক্ত গভর্নর। বাংলাদেশকে দেউলিয়া বানিয়ে বিদেশি দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করাই যেন ছিল ইউনূস সরকারের মূল উদ্দেশ্য। এই সময় দেশের অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ দেউলিয়া হওয়ার পথে। অনেকের কারখানা বন্ধ থাকার পরও তাদের ব্যাংকের সুদ গুনতে হচ্ছে।
ইউনূস সরকারের ১৮ মাসে সবধরনের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব ফেলে রাখা হয়েছিল। ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তারা হতাশায় জর্জরিত। বেসরকারি খাত এক অন্ধকার টানেলে বন্দি হয়ে আছে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে, প্রথমে ইউনূসের রেখে যাওয়া আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের বিদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয়। বিদেশ যেতে হয়। ইউনূস সরকার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে অন্যায়ভাবে বহু ব্যবসায়ীর বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। এভাবে বিনা কারণে ২১ মাস বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা নজিরবিহীন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইতিমধ্যে তিন মাস কেটে গেলেও এখনো ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। মনে হয়, ইউনূস সরকারের ভ্রান্ত নীতি থেকে সরে আসেনি বর্তমান সরকার। তারাও যেন একই পথে হাঁটছে। ইউনূসের এসব বিনিয়োগ বিনাশী পদক্ষেপ বহাল রেখে বেসরকারি খাতকে আস্থায় নেওয়া অসম্ভব।
দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে হলে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। বেসরকারি খাতে একটি ভয়হীন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
সরকার এবারের বাজেটে বেসরকারি খাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানি বন্ধ করতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ব্যবসা করার জন্য নিবন্ধন, বিভিন্ন অনুমোদন, ছাড়পত্রসহ অন্যান্য সরকারি সেবার আবেদন সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা মতামত বা ছাড়পত্র না দিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। কোম্পানির নামের ছাড়পত্র, নিবন্ধন আবেদন, ফি পরিশোধ ও সনদ প্রদান পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছোট ও নতুন ব্যবসার জন্য অনলাইনভিত্তিক প্রাথমিক অনুমোদন ব্যবস্থা রাখা হবে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত কাজ শুরু করে পরবর্তী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বাকি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারেন। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা সহজ করতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স সেবা ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় সেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এই উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। একজন শিল্প উদ্যোক্তাকে নতুন কারখানা স্থাপনের জন্য বিভিন্ন জায়গার একাধিক ছাড়পত্র নিতে হয়। ঘাটে ঘাটে ঘুরতে হয়। একটি ছাড়পত্র বাকি থাকলেও কারখানা চালু করা যায় না। বর্তমান আইনেও এসব ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে এই সময়ের মধ্যে ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। সব ছাড়পত্র পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। শুরুতেই উদ্যোক্তা ঋণখেলাপি হয়ে পড়েন। ছাড়পত্র পেতে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দপ্তরে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে যেন দয়া ভিক্ষা করতে হয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের। কোনো কোনো ছাড়পত্র প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এমন আচরণ করেন যে মনে হয়, এদেশে শিল্প কারখানা স্থাপন করা যেন রীতিমতো অপরাধ।
ভূমি অফিসে হয়রানি, বিদ্যুতের জন্য ভোগান্তি, জামানতের টাকা দিয়েও গ্যাস সংযোগ না পাওয়া যেন এদেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়তি। পদে পদে এভাবে হয়রানির সম্মুখীন হতে হয় একটি কারখানা স্থাপনের জন্য। ব্যবসায়ীরা যেন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। বাজেটে নির্দেশনা মাঠে আমলা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা মানছেন কি না তা তদারকি করা দরকার।
ঈদের পর কোরবানির বর্জ্য অপসারণের কথাই ধরা যাক। মাঠের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তারা অনেক গালভরা কথা বললেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের আশ্বাসে চুপচাপ বসে না থেকে নিজেই বেরোলেন সরেজমিন বর্জ্য অপসারণের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে। তিনি দেখলেন কর্মকর্তাদের সুন্দর কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। তিনি কয়েকজনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। এটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর একটি অসাধারণ পদক্ষেপ। বিনিয়োগ বাড়াতে এ ধরনের মাঠ পরিদর্শন জরুরি। সরকার বিভিন্ন লাইসেন্স ও ছাড়পত্র প্রদানে যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে তা মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত মনিটরিং করা হলে আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা যেতে পারে। বাজেট বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে সরকারের পার্টনার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সরকার এবং বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আস্থায় আনা। ইউনূস সরকার বেসরকারি খাতে যে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল তা দূর করা। পাশাপাশি দরকার বিনিয়োগ সহায়ক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। অর্থমন্ত্রী যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি মাইলফলক হতে পারে যদি তা বাস্তবায়ন করা যায়। আর এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন, সব বাধা দূর করে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন



































