পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি দিনের বেশির ভাগ সময় ঘুম ঘুম লাগে, তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। অনেকেই এটিকে অলসতার লক্ষণ মনে করলেও চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত তন্দ্রা ভাবের পেছনে জীবনযাপনের অভ্যাসের পাশাপাশি বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও দায়ী থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুম শুধু শারীরিক পরিশ্রমের ফল নয়। দীর্ঘ সময় একটানা বসে কাজ করা, একই ধরনের একঘেয়ে কাজে ব্যস্ত থাকা, নিয়মিত শরীরচর্চা না করা কিংবা রাতের শিফটে কাজ করার কারণে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাব পড়ে দিনের বেলায়, ফলে বারবার ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়।
শরীরের হরমোনের পরিবর্তনও এ সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশেষ করে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এতে ক্লান্তি, অবসাদ এবং অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা বাড়তে পারে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বা কমে গেলে শরীরে দুর্বলতা তৈরি হয়, যার সঙ্গে তন্দ্রাভাবও যুক্ত হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, কিডনি বা লিভারের কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলেও সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব অনুভূত হতে পারে।
ডায়রিয়া, বমি বা অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে গেলে দুর্বলতার পাশাপাশি ঘুম পেতে পারে। একইভাবে পর্যাপ্ত পানি পান না করলে পানিশূন্যতার কারণে ক্লান্তি, মাথা ঝিমঝিম এবং তন্দ্রা ভাব দেখা দিতে পারে।
রক্তশূন্যতাও এ সমস্যার একটি পরিচিত কারণ। শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। ফলে সারাক্ষণ ক্লান্তি ও ঘুমের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
ভাইরাসজনিত সংক্রমণের সময় এবং অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অবসাদ ও ঘুম ঘুম ভাব থাকতে পারে। আবার রাতে ভালোভাবে ঘুম না হওয়া বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যায় ঘুমের সময় বারবার শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ওজন, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও এমন হতে পারে। বিশেষ করে অ্যালার্জি, ঠান্ডা, ব্যথানাশক বা উদ্বেগ কমানোর কিছু ওষুধ ঘুমের প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাবের সঙ্গে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন, সবসময় ক্লান্ত লাগা, মাথাব্যথা বা মাথা ঝিমঝিম করা, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।
সমস্যা কমাতে যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত সময় ঘুমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থাকা, স্ক্রিনের সামনে কম সময় কাটানো, পর্যাপ্ত পানি পান এবং সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুললে অনেক ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া যায়। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, কিডনি বা লিভারের রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। কোনো ওষুধ খাওয়ার পর অতিরিক্ত ঘুম পেলে সেটিও চিকিৎসককে জানানো উচিত।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ, ভাইরাসজনিত অসুস্থতা বা কিছু ওষুধের কারণে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ঘুম ঘুম ভাব থাকতে পারে। তবে যদি দুই থেকে চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এ সমস্যা স্থায়ী হয়, স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায় বা এর সঙ্গে অন্য শারীরিক উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ নির্ণয় করে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।







