বিবাহিত জীবনের কিছুদিন যাওয়ার পরই অনেক দম্পতির মনে একটি প্রশ্ন জাগে—‘সবকিছু কি ঠিক আছে, নাকি আমাদের চিকিৎসা নেওয়া দরকার?’ বিশেষ করে যখন সন্তান আসতে দেরি হয়, তখন আইভিএফ (টেস্টটিউব শিশু) নামটির কথা মাথায় এলেও সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
আজ ২৫ জুলাই, ‘বিশ্ব আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) দিবস’। ১৯৭৮ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের প্রথম টেস্টটিউব শিশু লুইস ব্রাউন। এরপর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক চিকিৎসার বদলিতে লাখ লাখ নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফুটিয়েছে এই প্রযুক্তি।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—কখন একজন দম্পতির আইভিএফ-এর কথা ভাবা উচিত? আর চিকিৎসা শুরুর আগেই বা কী কী বিষয় মাথায় রাখা জরুরি? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন নতুন দিল্লির বিখ্যাত এলান্টিস হেলথকেয়ারের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. মান্নান গুপ্তা।

কখন আর দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাবেন?
ড. মান্নান গুপ্তার মতে, কতদিন চেষ্টা করছেন এবং নারীর বয়স কত—এই দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার সময় নির্ধারণ করা উচিত:
-
নারীর বয়স ৩৫ বছরের কম হলে: কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে টানা ১ বছর চেষ্টা করার পরও যদি সন্তান না আসে, তবে আর দেরি না করে ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।
-
নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে : বয়সের সাথে সাথে সন্তান ধারণের ক্ষমতা কমতে থাকে। তাই ৩৫ বছর পার হয়ে গেলে টানা ৬ মাস চেষ্টার পরও সন্তান না এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কাদের জন্য আইভিএফ প্রয়োজন হতে পারে?
সব বন্ধ্যাত্বেই যে আইভিএফ লাগবে, বিষয়টি তেমন নয়। তবে নিচের সমস্যাগুলো থাকলে চিকিৎসকরা আইভিএফ-এর পরামর্শ দেন: ১. নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত থাকলে।
২. পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা অনেক কম বা শুক্রাণুর মান দুর্বল হলে।
৩. ডিম্বাণু তৈরিতে বা নিঃসরণে (ওভিউলেশন) সমস্যা থাকলে।
৪. জরায়ুর জটিল সমস্যা যেমন—অ্যান্ডোমেট্রিওসিস থাকলে।
৫. সব রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও সন্তান না এলে।
৬. সাধারণ ওষুধ বা অন্য চিকিৎসায় কাজ না হলে।
আইভিএফ নিয়ে সাধারণ কিছু ভুল ধারণা
চিকিৎসক জানান, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো আইভিএফ নিয়ে কিছু ভুল ধারণা রয়ে গেছে:
-
ভুল ধারণা ১: “বয়স কোনো বিষয় নয়, আইভিএফ করলেই সন্তান হবে।”
বাস্তবতা: আইভিএফ-এর সফলতার প্রধান চাবিকাঠি হলো নারীর বয়স। বয়স বাড়লে ডিম্বাণুর গুণমান ও সংখ্যা কমতে থাকে, যা সফলতার হার কমিয়ে দেয়।
-
ভুল ধারণা ২: “আইভিএফ করলেই যমজ সন্তান হয়।”
বাস্তবতা: আগে একাধিক ভ্রূণ জরায়ুতে দেওয়া হতো বলে যমজ শিশু বেশি হতো। কিন্তু এখন আধুনিক প্রযুক্তিতে একটিই ভালো মানের ভ্রূণ স্থাপন করা হয়, ফলে একটি সন্তান হওয়ার ধারণাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক।
আইভিএফ শুরুর আগে দম্পতিদের যা করা উচিত
আইভিএফ চিকিৎসায় ভালো ফল পেতে ল্যাবরেটরির প্রযুক্তির পাশাপাশি দম্পতির নিজেদের জীবনযাত্রাও অনেক বড় ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা শুরুর আগেই দম্পতিদের যে নিয়মগুলো মানা উচিত:
-
সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ওজন: পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খেতে হবে। অতিরিক্ত বা খুব কম ওজন দুটোই গর্ভধারণে বাধা দেয়, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
-
পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম : প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে হবে এবং হালকা হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে।
-
বাজে অভ্যাস ত্যাগ : ধূমপান, মদ্যপান বা যেকোনো ধরনের মাদক সেবন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
-
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও সাপ্লিমেন্ট : ডায়াবেটিস, প্রেসার বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে তা আগেই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ফোলিক অ্যাসিডের মতো প্রয়োজনীয় ভিটামিন খাওয়া শুরু করতে হবে।
সবশেষে চিকিৎসক মনে করিয়ে দেন, আইভিএফ কোনো ম্যাজিক বা অলৌকিক কিছু নয়—এটি একটি বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা। সবার ক্ষেত্রে প্রথমবারেই ফল নাও আসতে পারে, তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।







