বাংলাদেশের সংগীতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সংগীত প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রাদার্স মিউজিক এবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুটের সঙ্গে কাজ করার। প্রতিষ্ঠানটির আমন্ত্রণে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তাদের আন্তর্জাতিক কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন চিরকুটের প্রতিষ্ঠাতা ও ভোকাল শারমিন সুলতানা সুমী।
গত ২১ জুলাই ম্যানহাটনে অবস্থিত ওয়ার্নার ব্রাদার্স মিউজিকের আন্তর্জাতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ সারুবিন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় চিরকুটের সংগীত, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য যৌথ কাজের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়।
সুমীর ভাষ্য, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত ও আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় ব্যান্ড হিসেবে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চিরকুটের ধারাবাহিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই এই আমন্ত্রণ এসেছে।
বৈঠকের সময় ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রতিনিধিরা সুমীর উপস্থিতিতেই চিরকুটের পাঁচ থেকে ছয়টি গান শোনেন। এর আগে তারা ব্যান্ডটির সংগীত নিয়ে গবেষণাও করেছিলেন। গান শোনার পর তাদের মন্তব্য ছিল, ‘অল অব ইয়োর সংস আর ইউনিক, ইউ আর ভেরি ইউনিক!’
চিরকুটের প্রশংসা করে জশ সারুবিন বলেন, ব্যান্ডটির স্বকীয় সংগীতধারা এবং সৃষ্টিশীলতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
জশ সারুবিন যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত অঙ্গনের একজন অভিজ্ঞ এঅ্যান্ডআর (আর্টিস্টস অ্যান্ড রিপার্টোয়ার) নির্বাহী। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কলাম্বিয়া রেকর্ডস, অ্যারিস্তা রেকর্ডস, আইল্যান্ড ডেফ জ্যাম, ভার্জিন রেকর্ডস এবং সনি/এটিভি মিউজিক পাবলিশিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত অ্যালবামের বিশ্বব্যাপী বিক্রি ৪ কোটির বেশি কপি। লেডি গাগাকে সাইন করার পাশাপাশি লিওনেল রিচি, কার্লোস স্যান্টানা, পিঙ্ক, এভরিল ল্যাভিন, জন ম্যাকলাফলিন ও পিক্সি লটসহ বহু আন্তর্জাতিক শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
চিরকুটের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়টিকে নিজেদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সৃষ্টিশীলতা ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন সুমী। তাঁর বিশ্বাস, এটি বাংলাদেশের সংগীতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।
সুমী বলেন, ‘সারা পৃথিবীর কিংবদন্তি শিল্পীদের নিয়ে কাজ করা এমন মানুষেরা যখন আমন্ত্রণ জানান, তখন সেটি ভীষণ অনুপ্রেরণার এবং সম্মানের। ওই ঐতিহাসিক অফিসে ঢোকার পর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, সেই খুলনা থেকে, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে আজ আবার বিশ্বসংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা ম্যানহাটনে, শতবর্ষী ওয়ার্নার ব্রাদার্সের অফিসে দাঁড়িয়ে আছি। ব্যান্ড মেম্বারদের মিস করছিলাম। আমি এবং চিরকুট স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ, আমাদের জীবনে এমন আরেকটি সুন্দর দিন দেওয়ার জন্য। আশা করি সামনে ভালো এবং নতুন কিছু অপেক্ষা করছে।’
দীর্ঘ ২৪ বছরের পথচলায় চিরকুট ‘আহারে জীবন’, ‘মরে যাব’, ‘যাদুর শহর’, ‘দুনিয়া’, ‘কানামাছি’, ‘উধাও’ ও ‘দামী’র মতো মৌলিক গান দিয়ে দেশ-বিদেশে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছে।
ব্যান্ডটি ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কনসার্ট, আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এছাড়া নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও ব্যান্ডের সঙ্গে তাদের একাধিক আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশনও রয়েছে।
চিরকুটের বিশ্বাস, ওয়ার্নার ব্রাদার্স মিউজিকের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য এই সহযোগিতা শুধু ব্যান্ডটির জন্যই নয়, বাংলাদেশের সংগীতশিল্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশের সংগীতশিল্পী এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।




