ছয় দিন ধরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. আরিফুল্লাহ জেলিন (২৬) নিখোঁজ রয়েছেন।
গত ৮ জুলাই সন্ধ্যার পর বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকার কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে তার খোঁজ মিলছে না। থানায় জিডির পর পুলিশ তৎপর হলেও এখনো কোনো হদিস মিলেনি। এদিকে জেলিনের পরিবারকে সন্ধানের কথা জানিয়ে দুই দফা অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।
মো. আরিফুল্লাহ জেলিন ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মিনাপুর গ্রামের বাসিন্দা।
নিখোঁজ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেলিনের মামা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল জেলিন। ছুটি শেষে ৭ জুলাই সিলেটে এসে বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার কোয়ার্টারে ফিরে সে। পরদিন সন্ধ্যার পর কোয়ার্টার থেকে বের হওয়ার পর থেকে সে নিখোঁজ। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। সিলেট ফেরার পর কর্মস্থলেও আর যোগ দেয়নি জেলিন, বাড়িতেও ফেরেনি।’
নিখোঁজের ঘটনার একদিন পর গত ৯ জুলাই সিলেট মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন জেলিনের সহকর্মী ধনঞ্জয় কুণ্ডু।
জেলিনের মা ফরিদা ইয়াসমিন জানান, গত ৭ এপ্রিল ঢাকায় চাকরিতে যোগ দেন জেলিন এবং পরে তাকে সিলেটে স্থানান্তর করা হয়। সিলেটে যোগ দেওয়ার পর কাজে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কথা বলে ছেলে প্রায়ই তাকে ফোন দিতেন। পরে ছেলের আবদারে তিনি গত ১৩ এপ্রিল সিলেট আসেন এবং ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ১৫ এপ্রিল গ্রামের বাড়ি ফিরে যান। ছুটি কাটিয়ে গত ৭ জুলাই জেলিন পুনরায় সিলেটে কর্মস্থলে ফেরেন।’
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। জেলিন নিখোঁজ হয়েছেন, নাকি অন্য কোনো কারণে কোথাও চলে গেছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
সিলেট মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান বলেন, ‘পারিবারিক সূত্রে যতটুকু জানতে পেরেছি, তিনি চাকরি করতে ইচ্ছুক ছিলেন না।’
ওসি বলেন, ‘সবশেষ তার মোবাইল লোকেশন গোয়াইনঘাটে শনাক্ত করা গিয়েছিল। সেখানে যে এলাকার লোকেশন পাওয়া গিয়েছিল সেখানে আমরা খুঁজেছি কিন্তু পাওয়া যায়নি। আমাদের চেষ্টায় ত্রুটি করছি না।’
পরিবারের বিপর্যস্ততার সুযোগে দুই দফা অর্থ নিয়েছে প্রতারক চক্র। প্রথম দফায় ১০ জুলাই কিডন্যাপ করা হয়েছে, মুক্তিপণ চেয়ে ২০ হাজার টাকা এবং পরে ১৩ জুলাই আবারও সন্ধান পাওয়া গেছে, চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে বলে আরো ৫ হাজার টাকা নিয়ে নেয় প্রতারকরা।
জেলিনের মামা আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ধান চেয়ে পোস্ট দেওয়া হয়। ১০ জুলাই একটি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে বলে, ‘আপনার ছেলেকে আমরা কিডন্যাপ করেছি। তাকে ফেরত চাইলে এক লাখ টাকা দিতে হবে। আমরা তখন জেলিনের কণ্ঠ শুনতে চাইলে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, আগে টাকা পাঠাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পরে আমরা ২০ হাজার টাকা নগদের মাধ্যমে পাঠাই। কিন্তু টাকা পাঠানোর পর কণ্ঠ শোনানোর বদলে শুধু জেলিনের ফোন থেকে একটি মিসড কল দেওয়া হয়। পরে আবার ফোন করে বলে, পুরো এক লাখ টাকা না দিলে কিছুই হবে না। এরপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।’
এ ঘটনার তিন দিনের মাথায় ১৩ জুলাই সকালে আরেকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, ‘জেলিনকে সিরাজগঞ্জে পাওয়া গেছে। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে, রক্ত লাগবে, চিকিৎসার জন্য ৯ হাজার ৭০০ টাকা জরুরি দরকার। ট্রুকলার অ্যাপ নম্বরটির পরিচয় এসআই ফারুক দেখে তারা আশ^স্ত হয়ে তারা ৫ হাজার টাকা বিকাশ করেন। এরপর থেকে আর ওই নম্বরে যোগাযোগ করা যায়নি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান বলেন,‘আমি তাদের বারবার বলেছি, এরা প্রতারক, এরা চাইলে টাকা দিয়েন না। কিন্তু তারপরও তারা দিয়েছেন, দিচ্ছেন।’
এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘এরাতো বিভিন্ন জায়গা থেকে এভাবে প্রতারণা করে। আমরা সে বিষয়ে যাওয়ার চেয়ে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে মনোযোগ দিচ্ছি।’






