ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ৩ লাখ জনগনের জন্য নেই কোনো পাবলিক টয়লেট। বি ক্যাটাগরীর পৌরসভায় প্রায় ৪০ হাজার জনগন বসবাস করলেও নেই কোনো গণশৌচাগার। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র উপজেলা পরিষদ চত্বরের কাছাকাছি বা ঢাকা-বাঞ্ছারামপুর- নবীনগর আঞ্চলিক সড়কের প্রাণকেন্দ্র মাতু বাড়ির মোড়ের চৌরাস্তায় নেই কোনো পাবলিক টয়লেট । পুরো এলাকায় পাবলিক টয়লেট না থাকায় যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ফলে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ৪০টি দপ্তর রয়েছে সদর উপজেলায়। প্রতিদিন উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নের শত শত বাসিন্দারা কোনো কোন কাজে সদর উপজেলায় বিভিন্ন প্রয়োজনে এসে পাবলিক টয়লেটের অভাবে ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন। এছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রয়েছে প্রায় সব ব্যাংকর শাখা। রয়েছে টয়লেট বিহীন ডজনখানেক শপিংমল, মার্কেট। ফলে, এ এলাকায় সব সময় জনাকীর্ণ থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবলিক টয়লেটের অভাবে সবচেয়ে বেশী সমস্যায় পড়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। পুরুষরা রাস্তাঘাটের অলি-গলিতে প্রস্রাব করতে পারলেও নারীরা পরে বেকাদায়। প্রতাবগঞ্জ বাজারে ব্যবসায়ীদের জন্য পৌরসভার উদ্যোগে একটি টয়লেট নির্মাণ করা হলেও সেখানে নারীদের ব্যবহারের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। সেটিও এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ দশা।
ছলিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ এলাকায় কোনো পাবলিক টয়লেট না থাকায় যেখানে সেখানে মূত্র ত্যাগ করছে মানুষ। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হলে আমাদেরকেও আশপাশের ব্যাংক বা ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনুরোধ করতে হয়।’
পাড়াতলি গ্রামের বাসিন্দা পারভিন আক্তার জানান, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট গুলোতে জরুরি ভিত্তিতে পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা উচিত। নাগরিকদের জন্য ফ্রি পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, অনেকের টাকা দিয়ে টয়লেট ব্যবহার করার সামর্থ্য থাকে না।
সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম বলেন, ‘গণশৌচাগারের তীব্র সংকটে বেগ চেপে রাখার অভ্যাস গড়েছেন অনেকে। আর বাকিরা চক্ষুলজ্জা এড়িয়ে খোলা আকাশের নিচে সাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘পাবলিক টয়লেট সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন কর্মজীবী ও নারী শিক্ষার্থীরা। বিড়ম্বনা এড়াতে তাদের অনেকেই নিয়েছেন অপর্যাপ্ত পানি পানের কৌশল। আছেন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।’
একজন নারী বলেন, ‘আমরা যখন বাইরে যাই আমরা চেষ্টা করি যতটা কম পানি ও খাবার গ্রহণ করা যায়। আমরা আশেপাশে এত এটিএম বুথ দেখি কিন্তু কোনো পাবলিক টয়লেট বা ওয়াশরুম দেখা যায় না। আবার যেগুলো আছে সেগুলোও মেয়েদের জন্য ব্যবহারের উপযোগী না।’
নারী উদ্যোক্তা মুন্নী বেগম বলেন, ‘অনেকসময় দেখা যায় আমাদের চেপে থাকতে হয়। এতে তো শরীরের ক্ষতি হয়। ওয়াশরুমের জন্য শপিংমল বা রেস্টুরেন্ট খুঁজতে হয়। আবার রাত হলে তো তাও পাওয়া যায় না।বাঞ্ছারামপুরে এতো এতো শপিংমল থাকলেও ওয়াশরুম নেই।’
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণশৌচাগার সংকট মাথায় নিয়ে বাঞ্ছারামপুরে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে চলছে। বাড়ছে ইউরিন ইনফেকশন, কিডনি বিকল আর রেচনতন্ত্রের জটিল রোগ আক্রান্তের সংখ্যা।
এ প্রসঙ্গে বাঞ্ছারামপুর সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ( টিএইচও) ডা. রঞ্জন বর্মন বলেন, ‘চেপে ধরে রাখলে প্রস্রাবের থলিতে অনেক প্রস্রাব থাকে। সেক্ষেত্রে মাংসপেশিগুলো সবসময় প্রসারিত অবস্থায় থাকে। পরবর্তীতে তার সংকুচিত হওয়ার যে শক্তি, সে তীব্রতা স্বাভাবিক অবস্থায় আর আসে না। প্রসারিত হয়েই থাকে। সেক্ষেত্রে প্রস্রাব করার পরও দেখা যায় তাদের প্রস্রাব যথেষ্ট পরিমাণে জমা থাকে। এটা থেকে পরে পাথর, ইনফেকশন, কিডনি নষ্ট হওয়ার একটা বড় কারণ হতে পারে।’
বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার( ভূমি) রবিউল হাসান ভূইয়া পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে জানান, পৌরসভার যথেষ্ট বাজেট রয়েছে। অর্থ কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা জায়গা নিয়ে। প্রপার প্লেসে আমরা পাবলিক টয়লেটের জন্য জায়গা পাচ্ছি না। তবে, অনুসন্ধান চলছে। আশাকরি, খুব দ্রুত জায়গার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।