জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দুই বছর পূর্ণ হলো বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই)। ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের সেই দৃশ্য দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলে এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই)বিকালে আবু সাঈদের বাড়িতে বাবা-মা-ভাইয়ের সাথে কথা হয়। তাদের দাবি অতিদ্রুত রায় কার্যকর হোক’-আবু সাঈদের মা-বাবা ও সহযোদ্ধাদের।
আরো পড়ুন
ইসরায়েলি কারাগারে নিপীড়নের ভয়াবহ তথ্য জানালেন জার্মান অধিকারকর্মী
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণা করে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। তবে রায় ঘোষণার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তা কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা, পরিবারের সদস্য এবং তার সহযোদ্ধারা। তাদের একটাই দাবি-দ্রুত রায় কার্যকর করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ছেলের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল, ছেলেটা আর নেই। আজ ওর কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। আদালত যে রায় দিয়েছেন, সেটা যদি বেঁচে থাকতে কার্যকর হতে দেখতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা শান্তি পেতাম। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুত কার্যকর হোক।’
মা মনোয়ারা বেগমের কণ্ঠেও একই বেদনা। তিনি বলেন, ‘‘দুই বছর হয়ে গেল। প্রতিদিন ছেলের কবরের কাছে যাই। মনে হয়, এই বুঝি ফোন দিয়ে বলবে, ‘মা, কেমন আছো?’ কিন্তু সেই ডাক আর আসে না। সংসারের হাল ধরার কথা ছিল আমার বাবাটার। দেশের জন্য নিজের জীবন দিয়ে গেল। যারা আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সবার আগে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসা সিয়াম আহসান আয়ান বলেন, ‘নিজের পরিবার, বাবা-মা কিংবা নিজের জীবনের কথা না ভেবে আবু সাঈদ দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মামলার রায় হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এখন সেই রায় দ্রুত কার্যকর করতে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চাই। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা-বিচার যেন দ্রুত বাস্তবায়ন হয়।’
শহীদ আবু সাঈদের সহযোদ্ধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পার হয়ে গেল। প্রথম শহীদের মামলার রায় হয়েছে, কিন্তু তা এখনো কার্যকর হয়নি। ন্যায়বিচারের পূর্ণতা আসবে তখনই, যখন রায় বাস্তবায়ন হবে। আমরা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানাই।’
আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘আমাদের পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে,তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। তবে রাষ্ট্র যদি দ্রুত বিচার কার্যকর করে, তাহলে অন্তত মনে হবে আবু সাঈদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে।’’
বড় ভাই রমজান আলী বলেন, ‘আবু সাঈদ শুধু আমাদের পরিবারের সদস্য ছিল না, সে দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আমরা চাই, বিচার দ্রুত কার্যকর হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দিলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়া হয়। উত্তেজনাপূর্ণ সেই মুহূর্তে আবু সাঈদ পুলিশের সামনে বুক উঁচিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন সকালে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় শোক আর হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে তাকে দাফন করা হয়। দুই বছর পরও সেই কবরের পাশে প্রতিদিন জড়ো হয় স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস। আর তাদের কণ্ঠে আজও একই আবেদন-আবু সাঈদকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, কিন্তু ন্যায়বিচারের শেষ ধাপ হিসেবে আদালতের রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।