কক্সবাজারে ডাকাতের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নিহত বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩) হত্যা মামলায় ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার পরপরই কক্সবাজারের আদালত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয় আদালত প্রাঙ্গণে।
পরে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একে একে আদালত ভবন থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানে তুলে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। রায়কে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় সাধারণ মানুষ, নিহত সেনা কর্মকর্তার স্বজন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। নিহত সেনা কর্মকর্তা লে. তানজিম টাঙ্গাইল জেলার বাসিন্দা। রামু সেনানিবাস এই তরুণ সেনা কর্মকর্তার স্মরণে রামু ক্যান্টনমেন্ট পরিচালিত স্কুল এন্ড কলেজের নাম দিয়েছে লে. তানজিম স্কুল এন্ড কলেজ।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে প্রকাশ ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ডাকাত প্রবণ এলাকা পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাহসী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩)। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মামলা সূত্রে আরো জানা গেছে, ঘটনার রাতে ডুলাহাজারা এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের বাড়ি ডাকাতি করার সময় রামু সেনানিবাসের মেজর উজ্জলের নেতৃত্বে ৩২ জন সেনার একটি চৌকস দলসহ যৌথবাহিনী ডাকাত দলকে ধরার জন্য ওঁৎ পেতে ছিলেন। ডাকাতদল সেনা উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় মোরশেদ নামের এক ডাকাতকে পেছন থেকে ঝাপটে ধরেন লে. তানজিম।
অনেক ধস্তাধস্তির পর ডাকাত মোরশেদ ছাড়া না পেয়ে অপর সঙ্গীয় ডাকাত আমিন, নাসির ও হেলালকে ডাক দেয়। তখন তারা তিন ডাকাত এসে লে. তানজিমকে তার ঘাড়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে ছিনিয়ে নেয় মোরশেদকে। তানজিমের গায়ে জ্যাকেট পরিহিত থাকায় ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় ঘাড় ও গলা। আহত তরুণ সেনা কর্মকর্তা লে. তানজিমকে রামু সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে গেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতিসহ হত্যা মামলা দায়ের করেন চকরিয়া থানায়। একই ঘটনায় চকরিয়া থানার উপ-পরিদর্শক আলমগীর হোসেন অস্ত্র আইনে আরো একটি মামলা করেন। পরে তদন্তভার পান চকরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবিলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম চৌধুরী জানান, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আলামত পর্যালোচনা শেষে আদালত এ রায় দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অস্ত্র মামলায়ও কয়েকজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদী পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর কালের কণ্ঠকে জানান- ‘মামলায় ১৮ আসামির মধ্যে ১৩ জনের শাস্তি হয়েছে এবং অপর ৫ জন খালাস পেয়েছেন। ১৮ আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডাদেশ দিয়েছেন।’
তিনি জানান, মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ৬ জন আসমি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার কথা স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছেন। মামলায় স্বাক্ষী ছিলেন ৫২ জন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ আসামি হচ্ছেন- মো. হেলাল উদ্দিন, নুরুল আমিন, মোরশেদ আলম (পলাতক) ও নাসির উদ্দিন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্তরা হলেন- জালাল উদ্দিন, মো. আরিফ উল্লাহ, মো. আনোয়ার হাকিম, মো. ইসমাইল হোসেন প্রকাশ হোসেন, এনামুল হক এনাম ওরফে তোতলা এনাম, মোহাম্মদ কামাল ওরফে ভেন্ডি কামাল, মোহাম্মদ এনাম, আবদুল করিম প্রকাশ মো. করিম ও জিয়াবুল করিম।
খালাস প্রাপ্তরা হলেন- মোহাম্মদ ছাদেক, আনোয়ার ইসলাম, শাহ আলম, আবু হানিফ ও মিজবাহ উদ্দিন। দণ্ডিতরা সবাই কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা এলাকার বাসিন্দা।
তদন্ত শেষে পুলিশ দুই মামলায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তদন্তে এজাহারভুক্ত কয়েকজনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয় এবং নতুন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মামলার শুরু থেকেই ঘটনার বিষয়টি আলোচিত ছিল। নিহত সেনা কর্মকর্তা তানজিমের পরিবারের সদস্যরা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।