দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম মৎস্য ও পোনা উৎপাদনের কেন্দ্র পটিয়া উপজেলা। উপজেলার শত শত বাণিজ্যিক মাছের খামার ও রেণু উৎপাদন কেন্দ্র থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাছ ও পোনা সরবরাহ হয় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই খাতকে ঘিরেই জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো পরিবার। কিন্তু এবারের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় সেই সম্ভাবনাময় মৎস্য খাত নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য অফিসের প্রাথমিক হিসাব বলছে, বন্যায় প্রায় ১ হাজার ৪০০টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অন্তত ৩ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এটি কেবল প্রাথমিক হিসাব। ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পুকুরের পানি উপচে পড়ে মাছ ও পোনা পাশের খাল, বিল ও নদীতে চলে গেছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে গেছে, কোথাও আবার পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে কয়েক মাসের লালন-পালন করা বাজারজাত মাছ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন রেণু উৎপাদনকারী খামারিরা।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাইদগাঁও, কেলিশহর, দক্ষিণ ভূর্ষি ও ধলঘাট ইউনিয়নে রেণু উৎপাদনকারী খামারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে খরনা, শোভনদণ্ডী, কচুয়াই, ছনহরা, আশিয়া, কাশিয়াইশ, কুসুমপুরা ও পটিয়া পৌরসভা এলাকায় বাণিজ্যিক মাছচাষিদের অধিকাংশ পুকুর পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে গেছে। শুধু মাছ হারানোই নয়, পুকুরের বাঁধ, স্লুইস, জাল, পাম্প, খাদ্য ও অন্যান্য অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। বহু চাষি এক মৌসুমের পুরো বিনিয়োগ হারিয়েছেন। পটিয়ায় মোট পুকুরের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ৫০০, পুরো চট্টগ্রামের দুই-তৃতীয়াংশ নার্সারি পটিয়াতে। পটিয়া থেকেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় মাছ চাষিরা পোনা নিয়ে যায়।
.jpg)
পটিয়া পৌরসভার হক ফিশারিজের মালিক এনামুল হক বলেন, ‘এক রাতের বন্যায় আমার কয়েকটি পুকুরের প্রায় সব মাছ বেরিয়ে গেছে। শুধু মাছ নয়, পুকুরের অবকাঠামোও নষ্ট হয়েছে। লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন সরকারি সহযোগিতা ছাড়া নতুন করে উৎপাদনে ফেরা কঠিন।’
মৎস্যচাষি রকিব হাসান বলেন, ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বিক্রির সময় ঘনিয়ে এসেছিল। কিন্তু বন্যার পানিতে সব মাছ ভেসে গেছে। এখন ঋণের কিস্তি দেব কিভাবে, সংসার চালাব কিভাবে—সেটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
খামারিদের অভিযোগ, বন্যার আগাম সতর্কতা থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় মাছ রক্ষায় কোনো কার্যকর কারিগরি সহায়তা বা জরুরি প্রস্তুতি ছিল না। ফলে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ পুকুরের মাছ বেরিয়ে যায়। তবে উপজেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, এবারের পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রম।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে এমন অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ঘটনা ঘটেনি। ফলে অনেক চাষির পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। যেসব পুকুর এখনো পুরোপুরি তলিয়ে যায়নি, সেখানে জাল বা বাঁশের বানা দিয়ে মাছ আটকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বন্যার পর পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় মাছের রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি চুন প্রয়োগ এবং আপাতত সম্পূরক খাদ্য ও সার প্রয়োগ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের প্রকৃত তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে, যাতে সরকারি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।’
মৎস্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘পটিয়ার রেণু উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব শুধু উপজেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী মৌসুমে পোনার সংকট দেখা দিলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলাসহ আশপাশের জেলার মাছচাষও ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মাছের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
স্থানীয় চাষিদের দাবি, ক্ষতির তালিকা তৈরির পাশাপাশি দ্রুত আর্থিক অনুদান, বিনা মূল্যে পোনা ও মাছের খাদ্য বিতরণ, সহজ শর্তে পুনর্বাসন ঋণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর সংস্কারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। অন্যথায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ‘মৎস্য ও পোনার ভাণ্ডার’ হিসেবে পরিচিত পটিয়ার এই সম্ভাবনাময় খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়ে যেতে পারে।
এদিকে পটিয়ার মৎস্য খাত শুধু মাছ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রেণু উৎপাদন, মাছের খাদ্য ব্যবসা, পরিবহন, বরফকল, আড়ত, খুচরা বিক্রেতা এবং হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। ফলে এই বন্যার প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত পুনর্বাসন করা না গেলে আগামী মৌসুমে মাছ উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দামও বাড়তে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিদের দাবি, শুধু ক্ষতির তালিকা করলেই হবে না জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক অনুদান, বিনা মূল্যে পোনা বিতরণ, মাছের খাদ্য সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এবারের বন্যার ক্ষত কাটিয়ে ওঠা অনেক খামারির পক্ষেই সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে কৃষি ও প্রাণিসম্পদের পর এবার মৎস্য খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে পটিয়ায়। প্রাথমিক ক্ষতির অঙ্ক ৩ কোটি টাকা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, ইউনিয়নভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের পর ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বাড়তে পারে। তাই দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং কার্যকর পুনর্বাসনই এখন পটিয়ার মৎস্য খাতকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।