বুকে জাতীয় পতাকা। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। এক হাতে গাছের চারা, অন্য হাতে মাটি খোঁড়ার খুন্তি। তীব্র রোদ কিংবা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সড়কের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন যুবকটি।
ছেলেটির নাম এনামুল হক (২৭)। কোনো শিশুর জন্ম হলে কিংবা কেউ না ফেরার দেশে চলে গেলে তার নামে সড়কের পাশে রোপণ করেন গাছের চারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১২ মাসে এনামুল রোপণ করেছেন প্রায় দেড় হাজার চারা। বৃক্ষরোপণের পক্ষে ভিন্নধর্মী প্রচার ও মানুষের সচেতনতা বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘গ্রিনম্যান এনামুল স্যার’ নামে একটি ফেসবুক আইডি পরিচালনা করেন তিনি।
গাছ লাগানোর ছবি ও ভিডিও আইডিতে পোস্ট করার পর জেলায় রাতারাতি এখন আলোচিত ব্যক্তি এনামুল। তিনি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বলাই শিমুল ইউনিয়নের নদিয়া গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী তিনি। বর্তমানে বসবাস করছেন ময়মনসিংহের নান্দাইলে।
প্রকৃতিপ্রেমী এই তরুণ নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেন। পড়ার খরচ বাদ দিয়ে উপার্জিত বাকি টাকায় সংসার চালান। সেখান থেকে আবার টাকা বাচিয়ে ব্যয় করেন প্রকৃতির পেছনে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তার প্রধান কারণ হিসেবে নির্বিচারে গাছ কাটাকে দায়ী করছেন এনামুল। তার ভাষ্য, ‘মানুষ যেভাবে অকারণে গাছ কাটছে, সে তুলনায় গাছ লাগানো হচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃতিকে বাঁচাতে না পারলে আমাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই আমি উদ্যোগ নিয়েছি, আমৃত্যু সারা দেশে এভাবে গাছ লাগিয়ে যাব।
এনামুলের গাছ লাগানোর পেছনে রয়েছে আরো একটি মানবিক গল্প। তিনি শুধু গাছই লাগান না, সেসব গাছের নামকরণ করেন কোনো না কোনো মানুষের নামে। এনামুলের এই মহৎ কাজ ফেসবুকের মাধ্যমে দেখে দেশ-বিদেশের বহু প্রবাসী এবং সাধারণ মানুষ তার পোস্টে লাইক-কমেন্ট করেন।
এনামুল তখন নিজ খরচে সেই মন্তব্যকারীদের নাম অথবা তাদের বাবা-মা ও সন্তানদের নামে একটি করে চারা রোপণ করেন। পৃথিবীতে নতুন কোনো শিশুর আগমনকে কিংবা পৃথিবী ছেড়ে কারো চলে যাওয়াকে স্মরণীয় রাখতে গাছ রোপণকে নেশায় পরিণত করেছেন তিনি।
এনামুলের এই সবুজ বিপ্লবের ছোঁয়া লেগেছে নান্দাইল ও এর আশপাশের অঞ্চলের সড়কগুলোতে। ইতোমধ্যে তিনি নিজ উদ্যোগে নান্দাইল চৌরাস্তা থেকে আঠারবাড়ি সড়ক; কেন্দুয়া থেকে নেত্রকোনা সড়ক; নান্দাইল থেকে কানারামপুর সড়ক এবং নান্দাইল চৌরাস্তা থেকে তাড়াইল সড়কের দুই পাশে শত শত চারা রোপণ করেছেন।
মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার রহস্য উন্মোচন করে এনামুল জানান, মানুষ যেন গাছের গুরুত্ব বুঝতে পারে, গাছ না থাকলে যে আমাদের এভাবে মাস্ক পরে কৃত্রিম অক্সিজেন নিয়ে বাঁচতে হবে- সেই বার্তাটির প্রতীকী রূপ দেন।
এ ব্যাপারে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইয়ুথ সোসাইটির নান্দাইল উপজেলা শাখার সভাপতি খন্দকার সুফি আব্দুল্লাহ বলেন, প্রকৃতির প্রতি এনামুলের এমন ভালোবাসা আমাদের পুরো যুব সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা। ইয়ুথ সোসাইটির পক্ষ থেকে তার এই মহান উদ্যোগকে স্যালুট জানাই।






