এক দিনের সফরে আগামীকাল শনিবার (১৩ জুন) কক্সবাজারে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন পর তাঁর এ সফর ঘিরে জেলাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গাসংকট এবং এর স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা।
সফরসূচি অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী খাল খনন-সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। উল্লেখ্য, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে পিএমখালী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এরপর তিনি পেকুয়া উপজেলায় গিয়ে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে কক্সবাজার জেলার প্রথম শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করবেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
এ ছাড়া পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বিকেলে চকরিয়া বাসস্টেশনে আয়োজিত জনসভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরে একটি সুধী সমাবেশে যোগদান শেষে রাতেই ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। পুরো সফরে তাঁর সঙ্গে থাকবেন কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের প্রধান প্রত্যাশা হলো রোহিঙ্গাসংকটের কার্যকর সমাধান। জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতে, দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজার এসংকটের ভার বহন করে চলেছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংকট স্থানীয় জনগণের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
তাদের অভিযোগ, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বনভূমি উজাড়, পাহাড় কাটা, স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, মজুরি হ্রাস, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি এবং মাদক পাচারের মতো সমস্যা প্রকট হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া এবং জাল পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও প্রশাসনকে বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সেবার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
কক্সবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের অনেকেই অতীতের সফল প্রত্যাবাসন উদ্যোগের কথা স্মরণ করে বলেন, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার এবং ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সরকারের সময়ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হবে বলে তারা আশাবাদী।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফের মানুষ প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গা সংকটের ভার বহন করছে। শুরুতে এটি মানবিক সংকট ছিল, কিন্তু এখন এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কক্সবাজার সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরো জোরদার করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।’
এ সময় তিনি উখিয়া অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উখিয়া কলেজকে জাতীয়করণের দাবিও জানান।