• ই-পেপার

পবিত্র কোরআন নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত পাঁচ জাদুঘর

ডিজিটাল ব্যস্ততা ও সিলাতুর রাহিম

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ডিজিটাল ব্যস্ততা ও সিলাতুর রাহিম
সংগৃহীত ছবি

একটি সময় ছিল যখন আত্মীয়তার খবর জানতে প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো না। ঈদের চাঁদ উঠলে খোঁজ নেওয়া হতো নানাবাড়ির, নতুন ফসল আসলে ভাগ চলে যেত চাচার বাড়িতে। কারো অসুস্থতার খবরে দূর গ্রামের পথও সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত। মোবাইল ফোন ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবু যোগাযোগ থেমে থাকেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ছিল আজকের চেয়ে দৃঢ়, আন্তরিক এবং বিশুদ্ধ।

আমরা এখন ‘সংযোগের যুগে’ বাস করছি। আজকের প্রযুক্তি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে পৃথিবীকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মহাদেশ পেরিয়ে কথা বলা যায়, দূরদেশে থাকা স্বজনের মুখ দেখা যায়, মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কিন্তু এই অভূতপূর্ব যোগাযোগ-বিপ্লবের মাঝেই একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—যোগাযোগ কি সত্যিই সম্পর্ককে শক্তিশালী করছে, নাকি আমরা যোগাযোগের প্রাচুর্যের মধ্যেই সম্পর্কের অনুভব হারিয়ে ফেলছি?

সম্ভবত আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি এটিই। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে বেশি বিচ্ছিন্ন। আমাদের বন্ধু তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আত্মীয়তার পরিধি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন শত মানুষের পোস্ট দেখেন, অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান করেন, অথচ মাসের পর মাস কোনো খালা, ফুফু, মামা কিংবা চাচার খোঁজ নেন না।

ইসলাম এই সংকট বহু আগেই খেয়াল করেছে। তাই এই বিষয়টিকে নিছক সামাজিক শিষ্টাচারের পর্যায়ে রাখেনি। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে ইসলাম ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘সিলাতুর রাহিম’। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার উছিলায় তোমরা একে অপরের নিকট (নিজেদের হক) চেয়ে থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকেও বিরত থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১)

আয়াতটি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ককে এখানে আল্লাহভীতির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল পারিবারিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনেরও একটি অংশ। বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক মানবজীবনের সবচেয়ে প্রাচীন সামাজিক কাঠামো। রাষ্ট্রের জন্মের আগে পরিবার ছিল, আধুনিক কল্যাণব্যবস্থার আগে আত্মীয়তা ছিল। বিপদে-আপদে, অসুস্থতায়, দুঃসময়ে মানুষ প্রথমে যাদের দিকে তাকিয়েছে, তারা ছিল তার স্বজনরা। তাই আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হওয়া মানে কেবল কয়েকটি সম্পর্কের অবনতি নয়; বরং সমাজের ভেতরের মানবিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া।

আজকের পৃথিবীতে মানুষকে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার একটি হলো একাকীত্ব। প্রযুক্তি মানুষের চারপাশে শব্দ তৈরি করেছে, কিন্তু সবসময় সঙ্গ তৈরি করতে পারেনি। অনলাইন উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব সম্পর্ক কমেছে। বৃদ্ধ বাবা-মা, একাকী আত্মীয়, অবহেলিত স্বজন—এই বাস্তবতা কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে নয়, এটি সম্পর্কের অগ্রাধিকার এবং তার অনুভব কমে যাওয়ার ফল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ুতে বরকত আসুক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)

এখানে ‘বরকত’ শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সভ্যতা মানুষকে সাফল্যের বহু সূত্র দিয়েছে, কিন্তু জীবনে বরকত এনে দেওয়ার কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। বরকত আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর সেই বরকতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে নবী করিম (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে সিলাতুর রাহিমের অর্থ শুধু ঈদে কুশল বিনিময় নয়। এর অর্থ হলো খোঁজ নেওয়া, পাশে দাঁড়ানো, অভিমান ভাঙা, প্রয়োজনে সবার আগে এগিয়ে আসা। এমনকি সম্পর্কের অপর প্রান্ত থেকে সাড়া না এলেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। কারণ ইসলাম সম্পর্ককে প্রতিদানের ভিত্তিতে নয়, দায়িত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে।

আজ আমাদের প্রযুক্তি আছে, আপন আপন শিডিউল আছে, স্মার্টফোন আছে; কিন্তু জীবনের সম্পর্কগুলোর জন্য নির্ধারিত সময় নেই। হয়তো সমস্যাটি প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যাটি অগ্রাধিকারে। যে মানুষটি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কাটাতে পারে, সে যদি সপ্তাহে এক দিন কোনো আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য সময় বের করতে না পারে, তবে সেটি ব্যস্ততার সমস্যা নয়; সেটি মূল্যবোধের সমস্যা।

ডিজিটাল যুগে তাই সিলাতুর রাহিমের শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইসলাম মানুষকে শুধু সংযুক্ত থাকতে শেখায় না; সংযুক্ত থাকার অর্থও শেখায়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা, আত্মীয়তার বন্ধন জীবিত রাখা এবং স্বজনের পাশে দাঁড়ানো—এসবই এমন আমল, যার প্রভাব পৃথিবীতেও পড়ে, আখিরাতেও। যোগাযোগের এই বিপ্লবী যুগে আমাদের নতুন করে মনে রাখা দরকার—একটি ফোনকল প্রযুক্তির কাজ, কিন্তু খোঁজ নেওয়া হৃদয়ের কাজ। আর হৃদয়ের এই সম্পর্কগুলোকেই ইসলাম ‘সিলাতুর রাহিম’ নামে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।
 

অমুসলিমদের প্রতি সৌজন্য ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
অমুসলিমদের প্রতি সৌজন্য ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত
সংগৃহীত ছবি

মানুষের ইতিহাস মূলত সহাবস্থানের ইতিহাস। ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ যুগে যুগে পাশাপাশি বসবাস করেছে, একে অপরের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছে। ইসলাম আবির্ভূত হয়েছিল এমন এক সমাজে, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষ একই ভূখণ্ডে জীবনযাপন করত। তাই ইসলাম শুধু মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিধান দিয়েই থেমে থাকেনি; বরং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও আচরণের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক নীতিমালা উপস্থাপন করেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমকালীন বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণার মধ্যে একটি হলো—অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিকে শুধু সংঘাত ও দূরত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর গভীরে পাঠ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে। সেখানে দেখা যায়, যে অমুসলিম মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈরিতা পোষণ করে না, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখে এবং সামাজিক সম্প্রীতির অংশ হয়ে ওঠে, তার সঙ্গে ন্যায়বিচার, সদাচার, সৌজন্য ও মানবিক সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন, সাহাবায়ে কিরামের আমল এবং ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস এই সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ঘৃণা নয় বরং ন্যায়, অবিচার নয় বরং মানবিকতা, বিদ্বেষ নয় বরং উত্তম চরিত্র।

এ কারণেই কোরআন মাজিদ অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে আবেগ বা প্রতিশোধকে নয়, বরং ন্যায়বিচারকে মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা দ্বিনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)

এই আয়াত ইসলামী সামাজিক নীতির একটি মৌলিক ভিত্তি। এখানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈরিতা বা যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও ন্যায়বিচার করা শুধু বৈধই নয়, বরং আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ।

ইমাম ইবন কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, তাদের সঙ্গে সদাচার, সৌজন্য ও ন্যায়বিচার প্রদর্শনের অনুমতি এই আয়াতে প্রদান করা হয়েছে।’ কোরআনের এই নীতির বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিতে। মদিনায় তিনি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে একটি বহুধর্মীয় সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সামাজিক চুক্তি করেছিলেন, তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন।

শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, এক ইহুদি বালক অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আবার একবার তাঁর সামনে দিয়ে একটি ইহুদির জানাজা অতিক্রম করলে তিনি সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যান। সাহাবায়ে কিরাম বিস্মিত হয়ে বললেন, এটি তো একজন ইহুদির জানাজা। উত্তরে তিনি বললেন, ‘সে কি একজন মানুষ নয়?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩১২)

মাত্র কয়েকটি শব্দে উচ্চারিত এই বক্তব্য ইসলামের মানবিক দর্শনের গভীরতাকে প্রকাশ করে। মানুষের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম ভারসাম্যপূর্ণ। আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর মুশরিক মা তাঁর কাছে এলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন কি না। উত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৬২০)

এই হাদিস প্রমাণ করে, ধর্মীয় পার্থক্য আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার কারণ নয়। বরং আত্মীয়তার অধিকার রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও আমরা একই আদর্শের প্রতিফলন দেখি। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এক বৃদ্ধ অমুসলিমকে ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যৌবনে তার কাছ থেকে কর নেওয়া হবে আর বার্ধক্যে তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হবে—এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

হানাফি ফিকহের প্রখ্যাত ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) তাঁর ‘আল-খারাজ’ গ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ করে অমুসলিম নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকারের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। তবে ইসলামের এই সৌজন্য ও মানবিকতা কখনো বিশ্বাসগত আপসের নাম নয়। মুসলমান অমুসলিমের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ও সদয় হবে, কিন্তু নিজের ঈমান, আকিদা ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবে। ইসলাম যেমন অন্যের অধিকার সংরক্ষণের শিক্ষা দেয়, তেমনি নিজের বিশ্বাসের দৃঢ়তাও বজায় রাখতে বলে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) লিখেছেন, ‘অমুসলিমের প্রতি ন্যায়বিচার করা ইসলামের অপরিহার্য শিক্ষা। অন্যায় করা কিংবা তার অধিকার হরণ করা কোনো অবস্থায় বৈধ নয়।’

আজকের বিশ্বে যখন ধর্মীয় বিভাজন, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা নানা সংকট তৈরি করছে, তখন ইসলামের এই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। ইসলাম মানুষকে তার ধর্মের কারণে ঘৃণা করতে শেখায় না; বরং অন্যায়ের বিরোধিতা করতে এবং মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে শেখায়।

একজন অমুসলিম যদি মুসলমানদের প্রতি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আচরণ করে, প্রতিবেশী হিসেবে সহযোগিতা করে, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখে এবং কোনো বৈরিতায় লিপ্ত না থাকে, তাহলে তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা, ব্যবসায়িক লেনদেনে সততা রক্ষা করা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামী শিক্ষারই অংশ। বস্তুত ইসলামের শক্তি তার ন্যায়পরায়ণতায়, সৌন্দর্য তার চরিত্রে এবং বিশ্বজনীনতা তার মানবিকতায়। একজন মুসলমানের আচরণে যখন কোরআনের ন্যায়বিচার, নববী আদর্শের সৌজন্য এবং ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ একত্রে প্রতিফলিত হয়, তখন সে কেবল নিজের ধর্মকেই প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং মানবতার জন্য ইসলামের প্রকৃত বার্তাও তুলে ধরে।

চারটি মহাবিপদ থেকে বাঁচার নববী দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
চারটি মহাবিপদ থেকে বাঁচার নববী দোয়া
সংগৃহীত ছবি

জীবন চলার পথে মানুষ নানা ধরনের বিপদ, দুঃখ-কষ্ট ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। একজন মুমিন জানে, এসব থেকে প্রকৃত নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দোয়া শিখেয়েছেন, যাতে জীবনের কঠিন পরীক্ষা, দুর্ভাগ্য, অশুভ পরিণতি এবং শত্রুর আনন্দের কারণ হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। দোয়াটি হলো-


اللهمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلَاءِ، وَدَرَكِ الشَّقَاءِ، وَسُوءِ الْقَضَاءِ، وَشَمَائَةِ الْأَعْدَاءِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাহদিল বালা-ই ওয়া দারাকিশ শাকা-ই ওয়া সুইল ক্বদা-ই ওয়া শামাতাতিল আদা-ই।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ভয়াবহ বিপদ (বিপদের তীব্রতা), দুর্ভাগ্যে পতিত হওয়া, ভাগ্যের অশুভ পরিণতি এবং দুশমনের খুশি হওয়া থেকে আশ্রয় চাই।

সূত্র : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় অনিষ্ট থেকে বাঁচতে সর্বাধিক পরিমাণ এ দোয়া পাঠ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৪৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭০৭)
 

হাদিসের বাণী

যখন বান্দার জন্য আল্লাহর ভালোবাসা অবধারিত হয়ে যায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যখন বান্দার জন্য আল্লাহর ভালোবাসা অবধারিত হয়ে যায়
সংগৃহীত ছবি

আবু ইদরিস খাওলানি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার দামেস্কের একটি মসজিদে প্রবেশ করে একজন যুবককে দেখতে পেলাম, যাঁর দাঁত খুবই সুন্দর। তাঁর সঙ্গে অনেক মানুষও বসে আছেন। যখন তারা কোনো বিষয়ে ইখতিলাফ করছে, তার সমাধানের জন্য তাঁর দিকে ফিরছে এবং তাঁর কথাকে গ্রহণ করছে। তখন আমি তার ব্যাপারে জানতে চাইলাম। আমাকে বলা হলো, তিনি হলেন মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)।

তারপর আগামীকাল হলে আমি আগে আগে মসজিদে এসে দেখি, তিনি আমার আগেই চলে এসেছেন। সালাত আদায় করছেন। আমি তাঁর সালাত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকলাম। সালাত পড়ে আমি তাঁর সামনে এসে সালাম দিয়ে বললাম, ওয়াল্লাহি! আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তিনি বললেন, সত্যি, ওয়াল্লাহি? আমি বললাম, আল্লাহর কসম। পুনরায় তিনি বললেন, আল্লাহর কসম? আমি বললাম, আল্লাহর কসম। তখন তিনি আমার চাদরের কোনা ধরে আমাকে তাঁর দিকে টান দিয়ে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যারা আমার খুশির জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে, পরস্পর উঠা-বসা করে এবং আমার সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করে, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা অবধারিত হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর : ২২০৩০, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নম্বর : ২৫১০)


শিক্ষা ও বিধান 
১. আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা ইবাদত। তাই কোনো ব্যক্তিকে তার ঈমান, তাকওয়া ও নেক আমলের কারণে ভালোবাসা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল।

২. কাউকে ভালোবাসলে তা প্রকাশ করা সুন্নত। আবু ইদরিস (রহ.) সরাসরি মুআজ (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।’ এতে বোঝা যায়, কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে তাকে তা জানিয়ে দেওয়া উত্তম।

৩. নেককার ব্যক্তিদের সান্নিধ্য কাম্য। মানুষ মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর কাছে জটিল বিষয়ে সমাধান নিতে আসত। এটি প্রমাণ করে যে জ্ঞানী ও নেককারদের কাছে গিয়ে উপকৃত হওয়া এবং তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

৪. ইলম ও প্রজ্ঞার মর্যাদা অনেক। মুআজ (রা.)-এর মতামত মানুষ গ্রহণ করত। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে ইসলামে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারীদের বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়েছে।

৫. মুমিনের ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। তাই আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি; ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পার্থিব লাভ নয়।

৬. আল্লাহর জন্য সাক্ষাৎ করা মহৎ আমল। আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে, তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা অবধারিত হয়ে যায়।

৭. মানুষের ভালোবাসা লাভের চেয়ে অনেক বড় বিষয় হলো আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা। এই হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা বলা হয়েছে, যা আল্লাহর ভালোবাসা নিশ্চিত করে।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত ঈমানি সম্পর্ক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে ওঠে। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মানুষকে ভালোবাসে, তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাদের সাক্ষাৎ করে, সে আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসার অধিকারী হয়ে যায়। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!