একটি সময় ছিল যখন আত্মীয়তার খবর জানতে প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো না। ঈদের চাঁদ উঠলে খোঁজ নেওয়া হতো নানাবাড়ির, নতুন ফসল আসলে ভাগ চলে যেত চাচার বাড়িতে। কারো অসুস্থতার খবরে দূর গ্রামের পথও সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত। মোবাইল ফোন ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবু যোগাযোগ থেমে থাকেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ছিল আজকের চেয়ে দৃঢ়, আন্তরিক এবং বিশুদ্ধ।
আমরা এখন ‘সংযোগের যুগে’ বাস করছি। আজকের প্রযুক্তি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে পৃথিবীকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মহাদেশ পেরিয়ে কথা বলা যায়, দূরদেশে থাকা স্বজনের মুখ দেখা যায়, মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কিন্তু এই অভূতপূর্ব যোগাযোগ-বিপ্লবের মাঝেই একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—যোগাযোগ কি সত্যিই সম্পর্ককে শক্তিশালী করছে, নাকি আমরা যোগাযোগের প্রাচুর্যের মধ্যেই সম্পর্কের অনুভব হারিয়ে ফেলছি?
সম্ভবত আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি এটিই। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে বেশি বিচ্ছিন্ন। আমাদের বন্ধু তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আত্মীয়তার পরিধি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন শত মানুষের পোস্ট দেখেন, অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান করেন, অথচ মাসের পর মাস কোনো খালা, ফুফু, মামা কিংবা চাচার খোঁজ নেন না।
ইসলাম এই সংকট বহু আগেই খেয়াল করেছে। তাই এই বিষয়টিকে নিছক সামাজিক শিষ্টাচারের পর্যায়ে রাখেনি। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে ইসলাম ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘সিলাতুর রাহিম’। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার উছিলায় তোমরা একে অপরের নিকট (নিজেদের হক) চেয়ে থাকো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকেও বিরত থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১)
আয়াতটি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ককে এখানে আল্লাহভীতির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল পারিবারিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনেরও একটি অংশ। বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক মানবজীবনের সবচেয়ে প্রাচীন সামাজিক কাঠামো। রাষ্ট্রের জন্মের আগে পরিবার ছিল, আধুনিক কল্যাণব্যবস্থার আগে আত্মীয়তা ছিল। বিপদে-আপদে, অসুস্থতায়, দুঃসময়ে মানুষ প্রথমে যাদের দিকে তাকিয়েছে, তারা ছিল তার স্বজনরা। তাই আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হওয়া মানে কেবল কয়েকটি সম্পর্কের অবনতি নয়; বরং সমাজের ভেতরের মানবিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া।
আজকের পৃথিবীতে মানুষকে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার একটি হলো একাকীত্ব। প্রযুক্তি মানুষের চারপাশে শব্দ তৈরি করেছে, কিন্তু সবসময় সঙ্গ তৈরি করতে পারেনি। অনলাইন উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব সম্পর্ক কমেছে। বৃদ্ধ বাবা-মা, একাকী আত্মীয়, অবহেলিত স্বজন—এই বাস্তবতা কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে নয়, এটি সম্পর্কের অগ্রাধিকার এবং তার অনুভব কমে যাওয়ার ফল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ুতে বরকত আসুক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)
এখানে ‘বরকত’ শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সভ্যতা মানুষকে সাফল্যের বহু সূত্র দিয়েছে, কিন্তু জীবনে বরকত এনে দেওয়ার কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। বরকত আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর সেই বরকতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে নবী করিম (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে সিলাতুর রাহিমের অর্থ শুধু ঈদে কুশল বিনিময় নয়। এর অর্থ হলো খোঁজ নেওয়া, পাশে দাঁড়ানো, অভিমান ভাঙা, প্রয়োজনে সবার আগে এগিয়ে আসা। এমনকি সম্পর্কের অপর প্রান্ত থেকে সাড়া না এলেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। কারণ ইসলাম সম্পর্ককে প্রতিদানের ভিত্তিতে নয়, দায়িত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে।
আজ আমাদের প্রযুক্তি আছে, আপন আপন শিডিউল আছে, স্মার্টফোন আছে; কিন্তু জীবনের সম্পর্কগুলোর জন্য নির্ধারিত সময় নেই। হয়তো সমস্যাটি প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যাটি অগ্রাধিকারে। যে মানুষটি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কাটাতে পারে, সে যদি সপ্তাহে একদিন কোনো আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য সময় বের করতে না পারে, তবে সেটি ব্যস্ততার সমস্যা নয়; সেটি মূল্যবোধের সমস্যা।
ডিজিটাল যুগে তাই সিলাতুর রাহিমের শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইসলাম মানুষকে শুধু সংযুক্ত থাকতে শেখায় না; সংযুক্ত থাকার অর্থও শেখায়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা, আত্মীয়তার বন্ধন জীবিত রাখা এবং স্বজনের পাশে দাঁড়ানো—এসবই এমন আমল, যার প্রভাব পৃথিবীতেও পড়ে, আখিরাতেও। যোগাযোগের এই বিপ্লবী যুগে আমাদের নতুন করে মনে রাখা দরকার—একটি ফোনকল প্রযুক্তির কাজ, কিন্তু খোঁজ নেওয়া হৃদয়ের কাজ। আর হৃদয়ের এই সম্পর্কগুলোকেই ইসলাম ‘সিলাতুর রাহিম’ নামে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।




