মাত্রা কিছুটা কমলেও টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে। সঙ্গে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। সবমিলিয়ে সিলেট বিভাগের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কোথাও উন্নতি, অপরিবর্তিত। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে আগের তুলনায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়েছেন মানুষ।
এদিকে, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। বরং সব পয়েন্টে নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্যা আতঙ্ক আপাতত কাটছে না।
সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবিগঞ্জ জেলায় আগের দিনের তুলনায় রবিবার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। জেলার এক-দুইটি নিম্নাঞ্চল ছাড়া প্রায় সব এলাকায় বন্যার পানি নেমে গেছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে বন্যার পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানা গেছে, পানি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রায় খালি হয়ে গেছে। তবে বাড়ি ফিরে অনেক পরিবার দেখতে পাচ্ছেন, ঘরবাড়ি কাদায় ভরে গেছে, আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। অনেক কাঁচা ঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।
জেলার আব্দাবখাই, নোয়াগাঁও ও কালীগঞ্জ ছাড়া বাকী গ্রামগুলো থেকে পানি প্রায় নেমে গেছে। পানি নামলেও অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট, কাঁদা জমে থাকা সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বাঁধ ও বসতঘর মেরামতের পাশাপাশি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পুনর্বাসন সহায়তার দাবি জানিয়েছে।
কৃষিখাতে প্রভাব
কৃষিখাতেও বন্যার প্রভাব পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষি জমির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মঈনুল হক বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় ডুবে রয়েছে সেসব এলাকার পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি ফিরেছেন। আমরা নদী ভাঙ্গনের জায়গাটি পুনরায় বাঁধ দেওয়ার জন্য কাজ করছি।’
মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি
উজানে বৃষ্টিপাত কমায় মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে। মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেছেন মানুষ।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের মনু নদীর দুটি স্থান উজিরপুর, একামুধা এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। অপরদিকে কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকরিয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙ্গে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ভাঙন দিয়ে বন্যার পানি প্রবল বেগে বের হয়ে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত করে। গত কয়েকদিনে বন্যায় ৩৫টি গ্রামের প্রায় অর্ধ লাখের অধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তলিয়ে যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। অনেকই বাড়ি-ঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন। বন্যা কবলিত অনেক এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে দেয়া হয় শুকনো খাবার। তবে এখন পানি কমছে।
রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের বন্যায় আক্রান্ত রফিক মিয়া, জসিম মিয়া ও আছিয়া বেগম বলেন, গত ৩ দিন পানির নিচে থাকার পর গতকাল শনিবার রাত থেকে ঘর বাড়ি থেকে পানি নামা শুরু করেছে। ঘরে খাবার নেই, অনেকে সরকারি সাহায্য পাচ্ছে, আমরা এখনো পাইনি। এছাড়াও আমাদের পরিবারের বাচ্চাকাচ্চার জ্বর উঠেছে আবার কারো ডায়রিয়া আক্রান্ত।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘বন্যা কবলিত এলকায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। একই সাথে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত করা আছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্তরা চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন। নিচু এলাকায় অনেক স্থানে পানি রয়েছে।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘বন্যার্তদের জন্য ইতোমধ্যে খাবার, চাল ও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যা কবলিত প্রতিটি এলাকায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। আমরা মনিটারিং করছি।’
বন্যায় মৌলভীবাজারে কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি
বন্যায় মৌলভীবাজার জেলার ফসলি জমি ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর ক্ষত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় আউস ধান, আমন বীজতলা ও সবজি চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় আউস আবাদ হয়েছে ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর। এর মধ্যে ২৪৮ হেক্টর বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। আমন বীজতলা অর্জিত তিন হাজার ৭৯ হেক্টরের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৫০ হেক্টর, খরিফ ২ সবজি আবাদ হয়েছে ২৩৬ হেক্টরে এর মধ্যে বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ৬৪ দশমিক ৫০ হেক্টর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। কৃষকদের দ্রুত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চললে কৃষকরা বড় ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন।’
এদিকে, বন্যায় জেলার গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগে বিপর্যয় ও গ্রামীণ সড়কগুলোর বড় অংশের ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট ভেঙেছে, পানিতে তলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বন্যায় গ্রামীণ সড়কগুলোর কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। আমরা মাঠপর্যায়ে জরিপ কাজ চালাচ্ছি। পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হতে আরো তিন-চার দিন সময় লাগবে।’
জরিপ শেষে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
সুনামগঞ্জে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম
সুনামগঞ্জ জেলায় কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। রবিবার (১২ জুলাই) দুপুর থেকে কুশিয়ারা নদীর পানি মার্কুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
এদিকে, সুনামগঞ্জ ও ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৩৮ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। একই সময় সুরমা নদীর পানি বেড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ৭ দশমিক ৪৩ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলাতেই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।’
সিলেট বৃষ্টি কমলেও নদীতে বেড়েছে পানি
আগের দুই দিনের টানা বৃষ্টির পর রবিবার সারাদিন বৃষ্টি ছিল না। তবে শেষ বিকেলে ফের বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টিপাত কমলেও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট জেলার সব পয়েন্টে নদনদীর পানি আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।
এর মধ্যে কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদী বিপৎসীমার মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ সেন্টিমিটার, এছাড়া সিলেট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি শূন্য দশমিক ৯৪ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ার পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৯১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাকি পয়েন্টেও নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছিল।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘উজানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাবে সিলেটের সব নদ-নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’
[প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ প্রতিনিধির তথ্যের ভিত্তিতে।]