টানা ১০ দিনের ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, বন্যা, পাহাড় ধস ও ভূমিধসে ভেঙে পড়েছে পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
জেলার দুই পৌরসভা ও সাত উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের শত শত কিলোমিটার সড়ক, সেতু, কালভার্ট, গাইডওয়াল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এখনো অনেক এলাকা পানির নিচে থাকায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রবিবার সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢলে কোথাও সড়ক ভেঙে নদীতে বিলীন হয়েছে, কোথাও কালভার্ট ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। অনেক জায়গায় পাহাড় ধসে সড়কে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলা সদর থেকে দুর্গম রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো।
সরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও জেলা প্রশাসন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলো হলো বান্দরবান সদরের কুহালং, সুয়ালক, টংকাবতী, রাজবিলা ও জামছড়ি; লামা সদরের আজিজনগর, গজালিয়া, সরই, রূপসীপাড়া, ফাঁসিয়াখালী ও ফাইতং এবং আলীকদম সদর, চৈক্ষ্যং, নয়াপাড়া ও কুরুকপাতা ইউনিয়ন।
এ ছাড়া নাইক্ষ্যংছড়ি সদরের বাইশরী, দোছড়ি, ঘুমধুম ও সোনাইছড়ি; রুমা সদরের পাইন্দু, রেমাক্রী প্রাংসা ও গালেংগ্যা; রোয়াংছড়ি সদরের তারাছা, নয়াপতং ও আলেক্ষ্যং এবং থানচি সদরের রেমাক্রী, তিন্দু ও বলিপাড়া ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ প্রামীণ ও সংযোগ সড়ক এখনো ব্যবহারের অনুপযোগী। কোথাও সড়কের অর্ধেক অংশ ধসে গেছে, কোথাও সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে পড়েছে। ফলে দুর্গম এলাকার হাজারো মানুষ এখনো বিচ্ছিন্ন অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
এলজিইডির হিসাবে ক্ষতি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান জেলায় সংস্থাটির আওতায় প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পাকা, কাঁচা ও ইউনিয়ন সড়ক রয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অন্তত ২১ কিলোমিটার সড়ক এবং অসংখ্য ছোট-বড় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ দেওয়ান কালের কণ্ঠকে জানান, মাঠপর্যায়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে এখনো অনেক এলাকা পানির নিচে। পানি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে। তবে এই হিসাব আরো বাড়তে পারে।
সওজের সড়কে ক্ষতি
বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতায় রয়েছে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার সড়ক। এর মধ্যে বান্দরবান-কেরাণীহাট-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, বান্দরবান-রাঙামাটি-বাঙ্গালখালিয়া সংযোগ সড়ক এবং বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ এখনো পানিতে ডুবে আছে।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিকভাবে অন্তত ৫৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে গেছে তিনটি আরসিসি সেতু ও সাতটি বেইলি সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সচল করতে স্বল্পমেয়াদে প্রায় সাত কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পুনর্নির্মাণে আরো প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
জেলা পরিষদের অধীনে অবকাঠামোর ক্ষতি
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে রয়েছে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক এবং বিস্তৃত অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। পাহাড়ি জনপদে নির্মিত পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা সড়ক, সেতু, কালভার্ট এবং জনসেবামূলক স্থাপনাগুলোর বড় অংশই ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলার অধিকাংশ দুর্গম এলাকা এখনো বন্যাকবলিত থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ সম্ভব হয়নি। পানি নেমে গেলে প্রকৌশলীরা সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বিস্তারিত হিসাব প্রস্তুত করবেন।
উন্নয়ন বোর্ডের হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলায় এক হাজার ৯৮৯টি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট এক হাজার ৩৮৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার এবং বাস টার্মিনাল।
বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন মোহাম্মদ ইয়াছির আরাফাত বলেন, চলমান বন্যা ও পাহাড় ধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পানি নেমে যাওয়ার পর সরাসরি পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে। এখনই নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতির হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়।
পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বান্দরবান সদর ও লামা পৌরসভার প্রশাসকরা জানান, কয়েকদিন ধরে তাদের প্রধান কাজ ছিল জলাবদ্ধ এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার, আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং জরুরি সেবা সচল রাখা। ফলে এখনো অবকাঠামোগত ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।
একই তথ্য জানিয়েছেন জেলার সাত উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)রা। তারা জানান, পানি সরে গেলে ইউনিয়নভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে মেরামত ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা বলেন, বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের অধিকাংশ সড়ক নির্মিত হয়েছে খাড়া ঢাল ও পাহাড় কেটে। টানা ভারি বৃষ্টিতে এসব এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় অবকাঠামোগুলোও বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে শুধু মেরামত নয়, ভবিষ্যতের দুর্যোগ বিবেচনায় টেকসই নকশায় পুনর্নির্মাণের বিকল্প নেই।
বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এলজিইডি ও সওজের ক্ষতির পরিমাণই ৮০ কোটির বেশি। এর সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, দুই পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য সরকারি অবকাঠামোর ক্ষতি যুক্ত হলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির অঙ্ক সহজেই কয়েক শ কোটি টাকা ছাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।