• ই-পেপার

ইসলামে শাস্তি আইন

  • মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

ভ্রমণের ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করার হুকুম : ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ভ্রমণের ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করার হুকুম : ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

মানুষ সাধারণত ভ্রমণপ্রিয়। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বনভূমি কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা—প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য ও বিভিন্ন স্থানের বৈচিত্র্য মানুষকে মুগ্ধ করে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন সেই স্মৃতিগুলো ভিডিওর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা খুবই সহজ। অনেকেই ভ্রমণে গিয়ে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরে তা ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে এমন ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা কি বৈধ? নাকি তা অপ্রয়োজনীয় কাজের অন্তর্ভুক্ত?

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো— কোনো কাজের মধ্যে যদি বৈধ উপকারিতা থাকে, তাহলে তা অনুমোদিত হতে পারে; আর যদি নিছক সময় নষ্ট, আত্মপ্রদর্শন বা অর্থহীন বিনোদনের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা পরিহার করাই উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের কল্যাণ, উপকার ও বৈধ উদ্দেশ্যসম্পন্ন কাজ ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো, সে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করবে।’ (তিরমিজি) 
এই হাদিস মুসলমানকে অর্থহীন কাজ ও সময়ের অপচয় থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।

ভিডিও ধারণের বৈধতা সম্পর্কে সমকালীন ফকিহদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফিকে প্রচলিত হাতে আঁকা ছবির হুকুমের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, আবার অনেক আলেম এটিকে আলোক-প্রতিফলনের মাধ্যমে বাস্তব দৃশ্য সংরক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন। যারা ভিডিও ধারণকে বৈধ বলেছেন, তারাও সাধারণত এটিকে প্রয়োজন, উপকারিতা ও শরিয়তসম্মত উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলেছেন। প্রখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী (দা.বা.) লিখেছেন, ‘যে ছবির স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা নেই এবং যা কোনো স্থায়ী বস্তুর ওপর খোদিত হয় না, তা অনেকটা ছায়ার মতো। কারণ ছবিটি পর্দায় স্থির থাকে না; বরং প্রকাশিত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়।’ (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, ৪/১৬৪)

তবে তিনি এবং অন্যান্য অনেক আলেম এও উল্লেখ করেছেন যে, এ ধরনের বিষয়কে প্রয়োজন ও উপকারিতার গণ্ডির মধ্যে রাখা উচিত। আলেমে দ্বীন মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনি (রহ.) বলেন, ‘ফটোগ্রাফির ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবাধ বৈধতার কথা বলা এবং একে নিছক ছায়া ধারণ বলে দাবি করা উচিত নয়। বরং প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের বৈধ উপকারিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।’ (রাওয়াইউল বায়ান ফি তাফসিরি আয়াতিল আহকাম, ২/৩০০)

সুতরাং কেউ যদি ভ্রমণের ভিডিও ধারণ করে মানুষের সামনে কোনো এলাকার সৌন্দর্য তুলে ধরতে চান, ভ্রমণ-সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করতে চান, ঐতিহাসিক বা প্রাকৃতিক নিদর্শন পরিচিত করাতে চান, শিক্ষা ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেন অথবা ভবিষ্যতের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করেন, তাহলে অনেক আলেমের মতে তা বৈধতার আওতায় আসতে পারে। বিশেষত যখন ভিডিওতে গান, অশ্লীলতা, পর্দাহীনতা, হারাম দৃশ্য, অহংকার বা আত্মপ্রচার না থাকে।

কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় শুধুই অর্থহীন বিনোদন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ, খ্যাতি অর্জন, লাইক-ভিউ সংগ্রহ কিংবা সময় নষ্ট করা, তাহলে তা ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন মুমিনের উচিত প্রতিটি কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা—‘এ কাজটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানুষের উপকার বা অন্তত কোনো বৈধ প্রয়োজন পূরণ করছে?’

অতএব, ভ্রমণের ভিডিও ধারণ ও ইন্টারনেটে প্রকাশ করার বিষয়টি এমন কোনো কাজ নয়, যাকে সর্বাবস্থায় হারাম বা সর্বাবস্থায় বৈধ বলা যায়। বরং এর হুকুম অনেকাংশে উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। ভিডিওতে যদি হারাম কিছু না থাকে এবং তা মানুষের বৈধ উপকার, শিক্ষা, তথ্য প্রদান বা স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে অনেক আলেমের মতে তা জায়েজ হতে পারে। তবে নিছক মজা, খ্যাতি অর্জন বা অনর্থক সময় ব্যয়ের উদ্দেশ্যে ভিডিও তৈরি ও প্রচার করা একজন সচেতন মুসলমানের জন্য শোভনীয় নয়। কারণ মুমিনের জীবন মূল্যবান, আর তার সময় আরো মূল্যবান। তাই প্রযুক্তির ব্যবহারও হওয়া উচিত দায়িত্বশীলতা, উপকারিতা এবং আল্লাহভীতির আলোকে।

ওআইসির কার্যক্রম গতিশীল করতে আরব-ইরাক বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ওআইসির কার্যক্রম গতিশীল করতে আরব-ইরাক বৈঠক
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সংস্থার আওতায় যৌথ ইসলামী কার্যক্রমের উন্নয়ন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওআইসির ভূমিকা আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

ওআইসিতে সৌদি আরবের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. সালেহ বিন হামাদ আল-সুহাইবানি জেদ্দায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে ওআইসিতে ইরাকের নবনিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি ও জেদ্দায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল রাষ্ট্রদূত মাওলুদ আহমেদ আল-মাশহাদানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রদূত আল-মাশহাদানি ওআইসিতে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করেছেন।

সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় পক্ষ ওআইসির কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও পরামর্শ প্রক্রিয়া আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং সংস্থার বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে আলোচকরা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওআইসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্ব্বিত উদ্যোগ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। তারা যৌথ ইসলামী কার্যক্রমের বিকাশ, সংস্থার সেবার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওআইসির নেতৃত্বপূর্ণ অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছে ইরাক। এ প্রেক্ষাপটে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সৌদি আরব-ইরাকের এই বৈঠককে সংস্থার কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসলামে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালনের গুরুত্ব

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
ইসলামে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালনের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

একজন সৎ মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হলো দায়িত্ববোধ। সভ্যতার অগ্রগতি, রাষ্ট্র/প্রতিষ্ঠানের সাফল্য এবং পারস্পরিক আস্থার মূলেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

ইসলাম প্রত্যেক মানুষকেই দায়িত্বশীল আচরণের উৎসাহ দেয়। একজন মুমিনের জন্য তার ঈমানের মৌলিক দায়িত্ব পালন করা যেমন জরুরি, তেমনি তার পারিবারিক দায়িত্ব, পেশাদারি দায়িত্ব ও (নাগরিক/নেতা বা কর্মকর্তা হিসেবে) রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজে এমন একটি প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে যে কেউ কেউ সুযোগ পেলেই দায়িত্বে অবহেলা করে, কর্তব্য পালনে শৈথিল্য দেখায়; আবার বিভিন্ন কৌশল, অজুহাত বা চাতুর্যের মাধ্যমে নিজেদের প্রাপ্য কিংবা অপ্রাপ্য সুবিধাও ভোগ করে নেয়। বাহ্যিকভাবে তারা সফল মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি নৈতিক অবক্ষয় এবং আমানতের খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম দায়িত্বকে শুধু প্রশাসনিক বা সামাজিক বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তাদের হকদারের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

প্রতিটি দায়িত্বই একেকটি আমানত। সেই আমানতের যথাযথ হক আদায় না করে শুধু সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, ‘আর যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে যত্নশীল।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৮)

বর্তমান সমাজে এমন অনেক মানুষকে দেখা যায়, যারা দায়িত্ব পালনে উদাসীন; কিন্তু মূল্যায়ন, সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নতি কিংবা সম্মান অর্জনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই মানসিকতা ন্যায়বিচার ও তাকওয়ার পরিপন্থী।

এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশি হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে শাস্তি থেকে মুক্ত মনে কোরো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৮)

আলোচ্য আয়াতে এমন লোকদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা ঘোষিত হয়েছে, যারা শুধু তাদের বাস্তব কৃতিত্ব নিয়েই খুশি নয়, বরং তারা চায় যে তাদের খাতায় এমন কৃতিত্বও লেখা হোক বা প্রকাশ করা হোক, যা তারা করেনি। এই রোগ যেরূপ রাসুল (সা.)-এর যুগে ছিল এবং যার কারণে আয়াত নাজিল হয়, অনুরূপ বর্তমানেও পদাভিলাষী ও যশান্বেষী  প্রকৃতির মানুষের মধ্যে এবং প্রোপাগান্ডা ও আরো বিভিন্ন চালাকি ও চাতুর্যের মাধ্যমে নেতৃত্ব লাভকারী বা বসের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণকারীদের মধ্যেও ব্যাপক হারে এ রোগ পাওয়া যায়।

তবে যারা প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ আছে, তারাই কৃতিত্বের আসল হকদার। মহান আল্লাহ যাদের কর্তৃত্ব দিয়েছেন, তাদের উচিত প্রকৃত দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে তাদের হক বুঝিয়ে দেওয়া। কারণ কিয়ামতের দিন যার যার পরিধি অনুযায়ী প্রত্যেক দায়িত্বশীলকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাব দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন,  ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তোমাদের ওপর দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দায়িত্ব পালন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র বা বিশ্ব, সব পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্বের পরিধি অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ফলে নিজে যেমন দায়িত্ববোধ এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই, তেমনি কোনো দায়িত্বহীন ব্যক্তিকেও অন্যায়ভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সব ভুল, বিলম্ব বা দুর্বলতাকে দায়িত্বে অবহেলা বলা যায় না। মানুষ সীমাবদ্ধ, তার সামর্থ্য ও পরিস্থিতিরও সীমা আছে। কখনো অসুস্থতা, অপ্রত্যাশিত সংকট, দক্ষতার ঘাটতি বা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে ত্রুটি হতে পারে। ইসলাম ইচ্ছাকৃত গাফিলতি ও অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য রেখেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব প্রদান করেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)

কিন্তু যখন কেউ সচেতনভাবে চালাকি করে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, অথচ সুবিধা গ্রহণে কৌশলী হয়ে ওঠে, তখন তা নৈতিক সংকটে রূপ নেয়। এমন ব্যক্তি হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা হারায়। সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে বাহ্যিক সাফল্যও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কারো পক্ষেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আন্তরিকতা, জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা এবং দায়িত্ব পালনের চেষ্টা একজন মানুষকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে। পক্ষান্তরে দায়িত্বে গাফিলতি করে চাতুর্যের মাধ্যমে সুবিধাভোগ করা সাময়িক লাভ দিলেও তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। মহান আল্লাহ সবাইকে তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতা দান করুন। আমিন।
 

জনকল্যাণ ও সম্পদের বণ্টনে ইসলামী অর্থনীতি

হাবিবুল্লাহ ফারহান
জনকল্যাণ ও সম্পদের বণ্টনে ইসলামী অর্থনীতি
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য হচ্ছে মানবকল্যাণ। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য। ইসলামের লক্ষ্য হলো নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কল্যাণমূলক সমাজ গড়ে তোলা। এটি সুদ, ঘুষ, ও ফটকাবাজি নিষিদ্ধ করে এবং জাকাত, সদকা ও ওশরের মতো কাঠামোগত ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্রদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করে।

ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি হলো ইসলামে সম্পদের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ। মানুষ শুধু তার আমানতদার বা প্রতিনিধি। এ ক্ষেত্রে সম্পদ উপার্জন, উৎপাদন ও ভোগে হারাম-হালালের ব্যবধান নিশ্চিত করা হয়। এ অর্থনীতি সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য জাকাত, ওশর, জিজিয়া, সদকাতুল ফিতর ইত্যাদি ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, কালোবাজারি, অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন, চুরি, ডাকাতি, শোষণ, মজুদদারি, জুলুম প্রভৃতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সম্পদের উপার্জন ও ভোগ অবশ্যই হালাল ও বৈধ উপায়ে হতে হবে।

ইসলামী অর্থনীতি রিবা বা সুদমুক্ত অর্থনীতি। সুদভিত্তিক লেনদেন সামাজিক শোষণের মূল কারণ। ইসলাম সুদ নিষিদ্ধ করে এর পরিবর্তে লাভ-লোকসান অংশীদারির  (Profit and Loss Sharing) নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে।

ইসলাম ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য কমানোর জন্য বাধ্যতামূলক দান বা জাকাত প্রদান এবং উত্তরাধিকার আইন প্রবর্তন করেছে, যা সমাজে সম্পদ সঞ্চয় রোধ করে।

ইসলাম সৎ ও স্বচ্ছ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহিত করেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ ও ঘাম শুকানোর আগেই তা পরিশোধের কড়া নির্দেশ দিয়েছে, যাতে মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে।

ইসলামী অর্থনীতিতে জনকল্যাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। জনসেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় বায়তুল মাল বা কেন্দ্রীয় কোষাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সব ধরনের অর্থনৈতিক জুলুম এবং একচেটিয়া দখলদারি নীতির পথ বন্ধ করা। কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, বরং গোটা সমাজের সার্বিক কল্যাণ সাধন ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য। অর্থকে সবার মধ্যে সঞ্চারিত করা, তা পুঞ্জীভূত করে না রাখা; আল্লাহর নির্ধারিত পথে অর্থ ব্যয় করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়। আল্লাহ বলেছেন : ‘আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৪)

ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম চাওয়া হলো মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা এবং সামাজিক সাম্য ও স্থিতি সংরক্ষণ। এর ফলে সমাজে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে। কেউ অভাবে থাকবে না, না থাকবে ক্ষুধার্ত। রাষ্ট্র আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে এবং নাগরিকদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও কর্মের সুযোগ তৈরি করে দেবে। এর মাধ্যমে সমাজে গড়ে উঠবে সাহায্য, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ। মানুষের জীবিকা সম্পর্কে কোরআনের বাণী হচ্ছে : ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার জীবিকার ব্যবস্থা (আল্লাহ) করেননি।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)

ইসলামী অর্থব্যবস্থা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হয়। এখানে ন্যায়বিচার ও ইনসাফপূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থার অনুসরণ করা হয়। ধনীদের থেকে জাকাতের অর্থ গরিব, অসহায় ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টনের মধ্যে দিয়ে সমাজের সাম্য অর্জন করা হয়।

ইসলামের সূচনালগ্নেই মুসলিম সমাজে এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যা ছিল ন্যায়, স্বচ্ছতা ও মানবকল্যাণের অনন্য উদাহরণ। এই কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘বাইতুল মাল’ তথা মুসলিমদের কোষাগার।

‘বাইতুল মাল’ বলতে সেই স্থান বা ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারি সম্পদ—যেমন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, কর, অনুদান ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয় এবং সেগুলো যথাযথভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। সাহাবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিমদের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত হন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)।

তবে ইসলামে বাইতুল মাল বা কোষাগারের গোড়াপত্তন কে করেন এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।

প্রথম মত অনুযায়ী, আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ই সর্বপ্রথম এই কোষাগারের গোড়াপত্তন করেন। তিনি ‘আস-সুনহ’ নামক স্থানে এটি উদ্বোধন করেন। তবে তিনি কোনো প্রহরী নিয়োগ করেননি। কারণ তাঁর শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল বিশ্বাস ও তাকওয়া।

পরবর্তী সময়ে তিনি কোষাগারটি নিজের ঘরে স্থানান্তর করেন, যাতে সহজে তা তত্ত্বাবধান করতে পারেন। সেখানে সংগৃহীত সম্পদ দরিদ্র ও অভাবী মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। এ ছাড়া যুদ্ধের জন্য ঘোড়া, অস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা হতো এই তহবিল থেকেই। আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর তত্ত্বাবধান করেন।

দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ছিলেন মুসলিমদের কোষাগার গোড়াপত্তনের প্রথম ব্যক্তি। তাঁদের মতে, মহানবী (সা.)-এর যুগে এবং আবু বকর (রা.)-এর সময়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কোষাগার ছিল না। তবে বেশির ভাগ ঐতিহাসিকের মতে, এই মতটি সঠিক নয়, বরং আবু বকর (রা.)-ই সর্বপ্রথম ‘বাইতুল মাল’ গোড়াপত্তন করেন এবং এর দায়িত্বে আবু উবাইদাহ (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠা এবং তার সঠিক পরিচালনা আমাদের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এটি শুধু অর্থ সংরক্ষণের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রতীক। (তারিখুল খোলাফা, পৃষ্ঠা-৬৪, মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-২৪৫-২৪৬)

বাইতুল মালের প্রধান আয়ের উৎসগুলো ছিল জাকাত, ওশর, খুমুস (খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), খারাজ (ভূমি রাজস্ব) ও জিজিয়া কর। এর মধ্যে জাকাতের খাতগুলো সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট এবং তা অন্য কোনো সাধারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করার সুযোগ ছিল না। (কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা : ২১-২৪)

রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে খলিফা উমর (রা.) ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্টার খাতা তৈরি করেন, যা ছিল মূলত একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট পরিকল্পনা। তিনি বাইতুল মালের অর্থ দিয়ে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ৪/২২০)

এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাজেটের কিছুটা মিল দেখা যায়।