দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। মানুষের জীবন, সম্পদ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত থাকেন, ইসলাম তাদের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ মর্যাদা ও বিরাট সওয়াবের সুসংবাদ। ইসলামি পরিভাষায় সীমান্ত ও জনপদ রক্ষার উদ্দেশ্যে শত্রুর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থাকাকে বলা হয় ‘রিবাত’। কুরআন ও হাদিসে এই আমলের এমনসব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।
কোরআনে সীমান্ত পাহারায় সতর্ক থাকার নির্দেশ
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সীমান্তে ও প্রহরায় নিয়োজিত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ২০০)
মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, এ আয়াতে মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘রাবিতু’ শব্দটি সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে।
একদিনের সীমান্ত পাহারা দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও উত্তম
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯২)
দুনিয়ার বিপুল সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনা করেও সীমান্ত পাহারার প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হাদিসটি এই মহান আমলের অসাধারণ ফজিলত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
একদিন-একরাতের প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন ও একরাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আত্মনিবেদিত দায়িত্ব পালন অনেক সময় দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।
মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না সওয়াব
একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে তার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তার জন্য রিজিক প্রবাহিত হতে থাকবে এবং সে কবরের পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
সাধারণত মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।
যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন এক রাতের কথা বলব না, যা কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সে হলো ওই প্রহরীর রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে হয়তো সে তার পরিবারের কাছে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।’ (আল মুসতাদরাক আলা আসসহিহাইন, হাদিস : ২৪২৪, তারগিব ওয়াত তারহিব : ১২৩২)
এ হাদিস সীমান্তরক্ষীদের আত্মত্যাগ, ঝুঁকি ও আন্তরিকতার উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরে।
যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়; দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)
এ হাদিসে সীমান্ত ও জনপদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
একটি রাতের প্রহরায় জান্নাতের সুসংবাদ
হুনাইনের যুদ্ধের রাতে সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সারা রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে প্রহরা দেন এবং নামাজ ও প্রয়োজন ছাড়া একবারও দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেননি। পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি নিজের জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫০১)
এ সুসংবাদ তার নিষ্ঠা, সতর্কতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্ব পালনের ফলস্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল।
জান্নাতের সুসংবাদ যাদের জন্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুসংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে সদা প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।’ (বুখারি ২৮৮৭)
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা
বর্তমান সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যদি তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহান ইবাদত। একদিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান, একদিন-একরাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। যারা দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিঃসন্দেহে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।
ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতকে নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য নিবেদিত দায়িত্বশীল কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে। সীমান্ত পাহারা তারই একটি উজ্জ্বল ও অনন্য উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী সব সদস্যের খেদমত কবুল করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।




