ইসলামের শিক্ষা হলো নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার Submissive (আত্মসমর্পিত-অনুগত) সমাজ বিনির্মাণ। প্রিয় নবী (সা.)-এর দর্শন ‘সহজ করো, জটিল করো না। সুসংবাদ দাও, ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়ো না।’ (বুখারি)
মরুর ঊষর-ধূসর প্রান্তরে প্রিয় নবী (সা.)-এর আগমনের প্রতীক্ষায় প্রকৃতি সেজে ছিল মায়াবী রূপসজ্জায়। গাছে গাছে সবুজের সমারোহ, ম ম গন্ধে খেজুরের ছড়াগুলো উঁকি দিচ্ছে আর পাখ-পাখালির কূজন, নদীর কলতান ও বাতাসের উদাসী গুঞ্জরণ ইসলামে পরিবেশের তাৎপর্য শিক্ষা দেয়। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস (WED) ১৯৭২ সালে মানব পরিবেশবিষয়ক স্টকহোম সম্মেলনের সময় জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ১৯৭৩ সালে ‘একমাত্র পৃথিবী’ (Only One Earth) এ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রথমবার উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালে আজারবাইজানের বাকু (Now For Climate) ‘এখন জলবায়ুর জন্য’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদযাপনের আয়োজন করেছে। জরুরি জলবায়ু পদক্ষেপ এবং পৃথিবী থেকে আসা সংকেত, যেমন ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, চরম আবহাওয়া এবং বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়ের প্রতি সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। এ প্রচারাভিযানটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের মধ্যে সংযোগ তুলে ধরে।
নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য বৃক্ষের বিকল্প নেই। বৃক্ষ ও জীবজগৎ পরস্পর সম্পৃক্ত, কিন্তু নির্বিচার বৃক্ষ নিধনে পরিবেশ-প্রকৃতিতে দেখা দিচ্ছে বিরূপ প্রভাব। একদিকে খরা ও মরুময়তা, অন্যদিকে অতিবর্ষণ ও বন্যায় তৈরি হচ্ছে ভারসাম্যহীন, ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা।
মানুষ ও প্রাণীর খাদ্যসহ নানা সুবিধার আয়োজন এবং সব প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ‘আকাশ থেকে আমি পানি বর্ষণ করি উপকারী বৃষ্টি এবং তা দিয়ে আমি উদ্যান, শস্যরাজি সৃষ্টি করি ও সমুন্নত খেজুর বৃক্ষ—যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। আমার বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ; বৃষ্টি দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি মৃতভূমিকে...।’(সুরা : কাফ, আয়াত : ০৯—১১)
তিনি আরো বলেন, ‘আর পানিতে যা আল্লাহ আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন, এরপর পৃথিবীকে সুজলা সুফলা করেছেন...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৪)
জলবায়ু পরিবর্তনের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা প্রতিরোধে বৃক্ষরোপণই একমাত্র সমাধান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই লতা ও উদ্যান সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদবিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জয়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন। তারা একে অন্যের সদৃশ এবং সদৃশহীনও হয়ে থাকে, যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল উঠানোর দিন তার জাকাত (হক) প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না। কারণ তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’(সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)
বৃক্ষরোপণ একটি ইবাদত তথা আমল ও জিকির। পৃথিবীর সব সৃষ্টি মহান আল্লাহর অনুগত ও ইবাদতরত, সুরা আর-রাহমানে আছে—‘ওয়াস্সাজারু ইয়াসজুদান...অর্থাৎ সূর্য ও চাঁদ ঘোরে হিসাব মতো, তৃণলতা বৃক্ষ উভয়েই তাঁর অনুগত...।’ (আয়াত : ৫, ৬)
আরো পড়ুন
দরুদ পাঠের বিশেষ পাঁচ সময়
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটি পাতাও ঝরে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৯) প্রিয় নবী (সা.) বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা প্রবহমান দান তুল্য কল্যাণকর ইবাদত অবহিত করে বলেন, ‘যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষরোপণ করে অথবা শস্য ফলায় এবং তা থেকে মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকাস্বরূপ গণ্য হব্যে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের লক্ষ্য হলো—
সচেতনতা বৃদ্ধি
সহযোগিতা বৃদ্ধি
বৃক্ষরোপণ
পরিচ্ছন্নতা অভিযান
শিক্ষামূলক কর্মশালা
টেকসই অনুশীলন
সৃজনশীল প্রচারাভিযান।
বস্তুত পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণ একটি ইবাদত ও আত্মরক্ষামূলক তৎপরতা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সঞ্চয়। এ জন্য বর্ষাকাল খুবই উপযুক্ত এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ টিকে থাকার উপায় ও একান্ত জরুরি অগ্রাধিকারের বিষয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া, গাজীপুর