• ই-পেপার

যে কারণে মহানবী (সা.) বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিয়েছেন

বদনজর থেকে বাঁচাতে শিশুর কপালে টিপ দেওয়া কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
বদনজর থেকে বাঁচাতে শিশুর কপালে টিপ দেওয়া কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

সন্তান আল্লাহ তাআলার অমূল্য নেয়ামত। তাই প্রত্যেক বাবা-মা চান, তাদের সন্তান সব ধরনের অকল্যাণ, বিপদ-আপদ ও মানুষের কুদৃষ্টি (বদনজর) থেকে নিরাপদ থাকুক। আমাদের সমাজে অনেকেই এই উদ্দেশ্যে শিশুর কপালে কালো টিপ, গালে কালি বা কপালে কালো দাগ দিয়ে থাকেন। অনেকে বিশ্বাস করেন, এতে শিশুর ওপর বদনজর লাগে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্বাস ও প্রথার কোনো ভিত্তি কি কোরআন-সুন্নাহে আছে? নাকি এটি শুধুমাত্র লোকাচার ও কুসংস্কার? একজন মুসলিমের জন্য কোরআন-হাদিসের আলোকে বিষয়টি জানা অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বদনজর সত্য।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৪০)


অতএব, বদনজর থেকে বাঁচার চেষ্টা অবশ্যই করতে হবে। তবে সেই চেষ্টা হতে হবে শরিয়তসম্মত উপায়ে।

কপালে কালো টিপ দিলে কি বদনজর থেকে রক্ষা পাওয়া যায়?
পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে কোথাও শিশুর কপালে কালো টিপ, গালে কালি বা কালো দাগ দেওয়ার মাধ্যমে বদনজর থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো নির্দেশ নেই। এ ধরনের বিশ্বাসের কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। যদি কেউ মনে করে কালো টিপ নিজেই বদনজর প্রতিরোধ করে, তাহলে এটি ভ্রান্ত বিশ্বাস। কারণ উপকার-অপকারের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্টে আক্রান্ত করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ রোধ করারও কেউ নেই।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১০৭)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার জন্য কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করারও কেউ নেই।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৭)

কালো টিপ দেওয়ার প্রথা যেভাবে চালু হয়
উপমহাদেশে শিশুদের কপালে কালো টিপ দেওয়ার রীতি বহুদিনের একটি লোকাচার। অনেক গবেষকের মতে, এটি হিন্দু সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং পরবর্তীতে লোকবিশ্বাস হিসেবে মুসলিম সমাজের একাংশেও প্রবেশ করেছে। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় এ প্রথার উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে এবং এগুলোর সবকটি ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়।  রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৩১)
অতএব, যদি কোনো কাজ অন্য ধর্মের বিশেষ ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়, তাহলে মুসলিমের উচিত তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা।

বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় নাতি হাসান ও হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর জন্য এ দোয়া পড়তেন—

 أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

উচ্চারণ : উঈযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ মিন কুল্লি শাইত্বানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।

অর্থ  : ‘আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৭১)

আরও যেসব আমল সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত
বদনজর ও সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য নিয়মিত—
১. আয়াতুল কুরসি (সুরা বাকারা : ২৫৫) পাঠ করা।
২. সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস (তিন কুল) সকাল-সন্ধ্যায় এবং ঘুমের আগে পড়া।
৩. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দোয়া নিয়মিত আদায় করা।
৪. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখা।
এসবই পবিত্র কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নিরাপত্তার উপায়।

বদনজর একটি বাস্তব বিষয় এবং ইসলাম তা স্বীকার করেছে। কিন্তু বদনজর থেকে রক্ষার জন্য শিশুর কপালে কালো টিপ দেওয়া, কালি লাগানো বা এ ধরনের লোকাচারের ওপর নির্ভর করার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। একজন মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত—উপকার ও ক্ষতির একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। তাই কুসংস্কার, লোকবিশ্বাস কিংবা ধর্মীয় ভিত্তিহীন প্রথার পরিবর্তে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী দোয়া, জিকির, আয়াতুল কুরসি, তিন কুল এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলই একজন মুসলিমের প্রকৃত আশ্রয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের সব ধরনের বদনজর, শয়তানের অনিষ্ট, বিপদ-আপদ ও সকল অকল্যাণ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

দোয়া ইউনুস পাঠের বিশেষ উপকারিতা

মুফতি ওমর বিন নাছির
দোয়া ইউনুস পাঠের বিশেষ উপকারিতা
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন কখনো সুখে, কখনো দুঃখে; কখনো স্বস্তিতে, কখনো কঠিন পরীক্ষায় অতিবাহিত হয়। এমন অনেক সময় আসে, যখন সব পথ যেন বন্ধ হয়ে যায়, কোনো সমাধান চোখে পড়ে না। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মহান আল্লাহ। বিপদে আল্লাহর দিকে ফিরে আন্তরিকভাবে দোয়া করা নবী-রাসুলদের সুন্নত। আর এমনই এক মহিমান্বিত দোয়া হলো দোয়া ইউনুস, যা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং যার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন।

দোয়া ইউনুস কী?
হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন অবাধ্যতা করলে তিনি আল্লাহর অনুমতির আগেই তাদের এলাকা ত্যাগ করেন। সমুদ্রযাত্রার সময় তিনি একটি বিশাল মাছের পেটে বন্দি হন। চারদিকে অন্ধকার—সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। এমন অসহায় অবস্থায় তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে মহান আল্লাহর দরবারে বিনয়ভরে যে দোয়া করেছিলেন, সেটিই আজ দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত। দোয়াটি হলো—

لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ : ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি সর্বপ্রকার ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭)

কোরআনে দোয়া ইউনুসের শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর স্মরণ করুন জুন-নুনের (ইউনুসের) কথা। তিনি রাগান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন, আমি তাঁকে সংকীর্ণ অবস্থায় ফেলব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহ্বান করলেন—‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ এরপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭–৮৮)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা শুধু ইউনুস (আ.)-কে উদ্ধার করার ঘটনাই উল্লেখ করেননি; বরং ঘোষণা করেছেন, যে মুমিন আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকেও বিপদ থেকে মুক্তি দেন।

দোয়া ইউনুসের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুন-নন (ইউনুস আ.)-এর দোয়া ছিল—‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন।’ কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি কোনো বিষয়ে এ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)

আরেক বর্ণনায় এসেছে, এই দোয়া মানুষের দুশ্চিন্তা ও সংকট দূর করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।

দোয়া ইউনুস কীভাবে পড়বেন?
দোয়া ইউনুস পাঠের জন্য শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। বিপদ, দুশ্চিন্তা, অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা যে কোনো কঠিন সময়ে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে যতবার সম্ভব এই দোয়া পড়া উত্তম। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে কোথাও কোথাও ‘খতমে ইউনুস’ নামে নির্দিষ্ট সংখ্যা—যেমন এক লাখ পঁচিশ হাজার বার—এই দোয়া পড়ানোর প্রচলন রয়েছে। কিন্তু এসবের শরয়ি কোনো দলিল নেই। তাই এ ধরনের প্রথা পরিহার করা উচিত। কেননা ইসলামের শিক্ষা হলো—বান্দা নিজেই নিজের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। নিজের মুখে, নিজের হৃদয়ের আকুতি নিয়ে করা দোয়া আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।

দোয়া ইউনুস পাঠের উপকারিতা
আন্তরিকতার সঙ্গে দোয়া ইউনুস পাঠ করলে আল্লাহর ইচ্ছায়—

১. বিপদ-আপদ ও সংকট থেকে মুক্তি লাভের আশা করা যায়।
২. দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়।
৩. আল্লাহর প্রতি ভরসা ও ঈমান আরো দৃঢ় হয়।
৪. নিজের ভুলের জন্য তওবা ও আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
৫. আল্লাহর রহমত ও সাহায্য লাভের পথ সুগম হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, সব উপকারই আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের ওপর নির্ভরশীল। এই দোয়া কোনো যান্ত্রিক বা নিশ্চিত ফলদায়ক সূত্র নয়। দোয়া ইউনুস কোরআনে বর্ণিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ দোয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দোয়া ইউনুসের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে আন্তরিকতার সঙ্গে তা আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
 

বন্যায় নিঃস্ব পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিদান

মুফতি ওমর বিন নাছির
বন্যায় নিঃস্ব পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিদান
সংগৃহীত ছবি

বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি অসংখ্য মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্বপ্নকে মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একটি ভয়াবহ বন্যার পর কত পরিবার খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, পোশাক, আশ্রয়—এমনকি প্রিয়জন হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। এমন সময় একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে তার সহমর্মিতা, দানশীলতা ও মানবসেবার মাধ্যমে। তাই বন্যাকবলিত নিঃস্ব মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

তাই সমাজের যে কোনো  বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বন্যাদুর্গত মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এই নির্দেশনারই বাস্তব প্রয়োগ।

দান করলে আল্লাহ বহুগুণে প্রতিদান দেন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়; প্রতিটি শীষে থাকে একশত দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য আরো বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬১)
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য যে অর্থ, খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী ব্যয় করা হয়, তা কখনো নষ্ট হয় না। আল্লাহ তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দুনিয়া ও আখিরাতে প্রতিদান দেন।

বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য করলে আল্লাহ সাহায্য করেন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
এ হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। আমরা যখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, তখন আল্লাহও আমাদের জীবনের সংকট ও বিপদে সাহায্যের দরজা খুলে দেন।

দুঃখ-কষ্ট দূর করলে কিয়ামতের কঠিন দিনেও মুক্তি মেলে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
বন্যার্ত মানুষের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ কিংবা আশ্রয়ের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করলে আল্লাহ কিয়ামতের ভয়াবহ বিপদ থেকে সেই ব্যক্তিকে মুক্তি দান করবেন।

সৃষ্টির প্রতি দয়া করলে আল্লাহও দয়া করেন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষের প্রতি দয়া করে, পরম দয়ালু আল্লাহও তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করো, আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৪)

বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। কেননা সদকা বিপদ-আপদ দূর করে। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা বিপদ দূর করে এবং অশুভ মৃত্যু প্রতিরোধ করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৬৬৪)
দুর্যোগের সময় দান-সদকা করা শুধু অন্যের উপকারই করে না; আল্লাহর ইচ্ছায় তা দাতার জীবনেও বরকত ও নিরাপত্তার কারণ হতে পারে।

যে ছয় উপায়ে বন্যার্তদের সাহয্য করবেন
১. বন্যাদুর্গত পরিবারকে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া।
২. চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩. পোশাক, কম্বল ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।
৪. শিশুদের জন্য দুধ, পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা।
৫. বিশ্বস্ত ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা করা।
৬. তাদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা এবং মানসিক সাহস জোগানো।


বন্যার্ত ও নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি মহান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। একজন মুমিনের ঈমানের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট ভাগ করে নেয়। আজ যাদের ঘরবাড়ি, খাদ্য ও জীবিকা বন্যার পানিতে ভেসে গেছে, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাও আল্লাহর কাছে মহামূল্যবান আমল। আসুন, সামর্থ্য অনুযায়ী দান, সহযোগিতা ও আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে বন্যাদুর্গত নিঃস্ব পরিবারের পাশে দাঁড়াই। কারণ মানুষের প্রতি আমাদের দয়া ও সহমর্মিতাই আখিরাতে আল্লাহর রহমত ও জান্নাত লাভের অন্যতম বড় মাধ্যম হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন এবং আমাদের দান ও সেবাকে কবুল করুন। আমিন।

বন্যাকবলিত এলাকায় করণীয় তিনটি আমল

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বন্যাকবলিত এলাকায় করণীয় তিনটি আমল
সংগৃহীত ছবি

বন্যা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা প্রতিবছর মানুষের জীবনযাত্রা, সম্পদ ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব, রোগব্যাধির বিস্তার এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি দেখা দেয়।

ইসলাম ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি মানুষের কল্যাণ, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও হাদিসে বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা : বন্যার সময় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। তাই এ সময়ে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ এবং নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মহানবী (সা.) মদিনায় এসে মানুষের সুপেয় পানির সংকট দেখে ‘রুমা’ কূপটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনায় আগমন করার পর দেখলেন যে সেখানে সুপেয় পানি পান করার ব্যবস্থা নেই।

এক ইহুদির ‘রুমা’ নামক একটি কূপ থাকলেও যার পানি অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কূপটি ব্যক্তিমালিকানা থেকে সরিয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন ‘কে রুমা নামক কূপটি কিনে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? এবং এর বিনিময়ে জান্নাতে আরো উত্তম পুরস্কার লাভ করবে?’ এ কথা শুনে উসমান (রা.) এই কূপ খরিদ করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করলেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৭০৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫১১ ও ৫৫৫)

২. বানভাসি মানুষের সহযোগিতা : বানভাসি মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ কাজ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। এ অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব এবং একটি বড় ইবাদত। অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা মানুষদের প্রতি মহান আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও সাহায্য বর্ষণ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে, আল্লাহ তাআলাও তার কল্যাণে রত থাকবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪৬)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি ব্যয় করো, আমিও তোমার প্রতি ব্যয় করব।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৫২)।

৩. বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন : বর্ষায় বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বৃক্ষ ও তরুলতা প্রকৃতির প্রাণ হিসেবে কাজ করে; এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বায়ু বিশুদ্ধকরণ, মাটিক্ষয় রোধ, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় গাছের চারা সহজে বেড়ে ওঠে। তাই এ সময়কে বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশগত কাজ নয়; বরং এটি একটি সওয়াবপূর্ণ ইবাদতও বটে। একটি গাছ বহু বছর ধরে মানুষকে ফল, ছায়া ও অক্সিজেন প্রদান করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে; তত দিন গাছ রোপণকারীর সওয়াবও চলমান থাকে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মুসলমান কোনো বৃক্ষ রোপণ করে, তারপর তা থেকে কোনো মানুষ, পশু বা পাখি ভক্ষণ করে, এর বিনিময়ে কিয়ামতে তার জন্য একটি সদকার সওয়াব রয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪০৫৩)

পরিশেষে বলা যায়, বন্যা মোকাবেলায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, বানভাসি মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কাজ। এসব কাজ একদিকে সামাজিক দায়িত্ব, অন্যদিকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের পুরস্কার লাভের অন্যতম মাধ্যম। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে যেমন দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে, তেমনি একটি মানবিক, কল্যাণমুখী ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠন করা সহজ হবে।

যে কারণে মহানবী (সা.) বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিয়েছেন | কালের কণ্ঠ