• ই-পেপার

শান্তির প্রতীক্ষায় ফিলিস্তিন

দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দাঁত সোজা করা কি বৈধ

মুফতি ওমর বিন নাছির
দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে দাঁত সোজা করা কি বৈধ
সংগৃহীত ছবি

মানুষ স্বভাবগতভাবেই সৌন্দর্যপ্রিয়। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি জীবনযাপন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলামও মানুষের এই স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি; বরং সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও শোভনতার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। তবে ইসলামে সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রেও কিছু নীতিমালা রয়েছে, যাতে মানুষ সৌন্দর্যের নামে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম না করে। আধুনিক যুগে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে এবং দাঁতের স্বাভাবিক গঠন ঠিক রাখতে ব্রেস বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—দাঁতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দাঁত সোজা করা কি শরিয়তসম্মত?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : তিন, আয়াত : ৪)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে আদমসন্তান! তোমরা প্রত্যেক ইবাদতের সময় তোমাদের সৌন্দর্য ও শোভা গ্রহণ করো।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)


এসব আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ইসলাম মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তবে এই সৌন্দর্যচর্চা হতে হবে বৈধ ও শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)

এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে বৈধ উপায়ে সৌন্দর্য অর্জন ও পরিচ্ছন্ন থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় কাজ। তবে একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু কৃত্রিম সৌন্দর্যচর্চার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, যা আল্লাহর সৃষ্টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিবর্তন করার শামিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ওইসব নারীর ওপর লানত করেছেন যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দাঁতের মাঝে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করে এবং এভাবে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন আনে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৩১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১২৫)

কিন্তু এই হাদিসের অর্থ বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করতে হবে। হাদিসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে স্বাভাবিক দাঁতকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে নতুন ধরনের সৌন্দর্য সৃষ্টি করাকে। এখানে চিকিৎসা, রোগ নিরাময় বা জন্মগত ত্রুটি সংশোধনের কথা বলা হয়নি। তাই ইসলামী আইনবিদগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো শারীরিক ত্রুটি দূর করা, বিকৃতি সংশোধন করা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ নয়।

প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) লিখেছেন, ‘যেসব চিকিৎসা বা ওষুধ মুখমণ্ডলের দাগ দূর করে এবং চেহারাকে সুন্দর করে, সেগুলোতে কোনো বাধা নেই।’ (উমদাতুল কারি, ১৪/১৭৯)

একইভাবে ইমাম নববি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, যদি কোনো পরিবর্তন চিকিৎসা বা ত্রুটি দূর করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ নয়; বরং বৈধ।

এসব মূলনীতির আলোকে দাঁত অত্যধিক বাঁকা হলে, উঁচু-নিচু হলে, চোয়ালের গঠনগত সমস্যার কারণে দাঁত বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলে, খাওয়া-দাওয়া বা কথা বলায় অসুবিধা সৃষ্টি হলে কিংবা মুখমণ্ডলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে ব্রেস বা অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে দাঁত সোজা করা সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বিদ্যমান ত্রুটি সংশোধন এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।

অতএব বলা যায়, কোনো দাঁত যদি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তা সংশোধনের জন্য ব্রেস বা আধুনিক দন্তচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনো বাধা নেই। বরং এটি চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত একটি বৈধ ব্যবস্থা। কারণ ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য সমর্থন করে এবং মানুষের কষ্ট ও ত্রুটি দূর করার পথকে সহজ করে দেয়। এটাই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী সৌন্দর্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ।

ইসলামে একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
ইসলামে একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষণীয়
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে ‘একাধিক বিবাহ’ বা ‘বহুবিবাহ’ শব্দটি অনেকের কাছে যেন একটি রোমান্টিক কল্পনা, ব্যক্তিগত ভোগবিলাস কিংবা সীমাহীন চাহিদা পূরণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ ইসলামের মহান বিধানকে নিজেদের প্রবৃত্তির হাতিয়ার বানিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন একাধিক বিয়ে করা মানেই পুরুষত্বের গৌরব বা বিশেষ সফলতা! অথচ ইসলাম কখনোই বহুবিবাহকে ফ্যান্টাসি, খেল-তামাশা বা কামনার স্বাধীন লাইসেন্স হিসেবে দেয়নি। বরং এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ সামাজিক বিধান, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, ইনসাফ, তাকওয়া ও জবাবদিহির ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছে। আর ইসলাম বহুবিবাহকে ‘অনুমতি’ দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। এমনকি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজন স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সমাজে বিধবা, এতিম, অসহায় নারী, যুদ্ধ-পরবর্তী সংকট কিংবা পারিবারিক বিশেষ সমস্যার সমাধানে এটি কল্যাণকর হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নারীদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করো—দুই, তিন বা চার পর্যন্ত। তবে যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা বহুবিবাহের অনুমতির সঙ্গে সঙ্গে ‘ন্যায়বিচার’কে প্রধান শর্ত বানিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে প্রবৃত্তির স্বাধীনতা নয়; বরং দায়িত্বশীলতা ও ইনসাফই মুখ্য। আর ইনসাফহীন বহুবিবাহ ভয়ংকর গুনাহ। অনেক মানুষ বহুবিবাহের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু স্ত্রীদের হক, মানসিক নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও সময় বণ্টনের কথা ভাবে না। অথচ ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। মহানবী (সা.)  বলেছেন, ‘যার দুই স্ত্রী আছে, অতঃপর সে একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে (অন্যজনের প্রতি অবিচার করে), সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে যে তার শরীরের এক পাশ বাঁকা থাকবে।’ (নাসায়ি, হাদিস নং : ৩৯৫২, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১৩৩)

আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বহুবিবাহকে হাস্যরস, ট্রেন্ড কিংবা পুরুষের ‘ফ্যান্টাসি’ হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু একজন মুমিনের জীবন প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হয় না; বরং তাকওয়া দ্বারা পরিচালিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তিকে দমন করেছে, জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল।’ (সুরা : নাজিয়াত, আয়াত : ৪০-৪১)

সুতরাং ইসলাম মানুষকে কামনার পেছনে ছুটতে শেখায় না; বরং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের স্বপ্নে বিভোর; অথচ প্রথম স্ত্রীর হক আদায়েই সে ব্যর্থ। সংসারের খরচ, মানসিক যত্ন, সন্তানের দায়িত্ব—সব কিছু অবহেলিত হয়। তাইতো মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৩৮৯৫)
অতএব, সত্যিকারের দ্বিনদার পুরুষ সে-ই, যে নিজের পরিবারের হক আদায়ে সচেতন।

যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি, সামাজিক কল্যাণ ও শরিয়তের সীমারেখা রক্ষা করে বহুবিবাহ করে—তবে তা বৈধ ও কখনো কখনো কল্যাণকরও হতে পারে। কিন্তু যদি এটি শুধু সৌন্দর্যপ্রীতি, রোমাঞ্চ, অহংকার বা অস্থির কামনার বহিঃপ্রকাশ হয়, তবে সেই নিয়ত মারাত্মক বিপজ্জনক। কারণ ইসলাম নিয়তের ওপর গুরুত্ব দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ১)

ইসলামের বিধানগুলো মানুষের কল্যাণ, পবিত্রতা ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রণীত। কিন্তু যখন কোনো বৈধ বিষয়কে মানুষ প্রবৃত্তি, অহংকার কিংবা দুনিয়াবি মোহের উপকরণ বানিয়ে ফেলে, তখন সেই বৈধ বিষয়ও ফিতনা ও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বহুবিবাহের ক্ষেত্রেও আজ এমনটি ঘটছে। অনেকেই শরিয়তের গভীর উদ্দেশ্য না বুঝে এটিকে ‘পুরুষের স্বাধীনতা’ বা ‘রোমান্টিক কল্পনা’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ফলে পরিবারে অশান্তি, নারীর প্রতি জুলুম, সন্তানদের মানসিক বিপর্যয় এবং দ্বীনের সৌন্দর্য বিকৃত হচ্ছে। অনেক পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ের কথা চিন্তা করলেও প্রথম স্ত্রীর আবেগ, ত্যাগ ও অনুভূতির মূল্যায়ন করে না। অথচ একজন স্ত্রী তার যৌবন, শ্রম, ভালোবাসা ও জীবন একটি সংসারের জন্য ব্যয় করে। ইসলাম তার অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের সাথে সদাচরণের সাথে জীবনযাপন কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

সুতরাং স্ত্রীর মনে অকারণে কষ্ট দেওয়া, তাকে অনিরাপত্তায় ফেলা বা অবমূল্যায়ন করা ইসলাম কখনো সমর্থন করেনা। আর একজন ব্যক্তি যখন ইনসাফ ছাড়া একাধিক বিয়ে করে, তখন তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে থাকে সন্তানরা। পরিবারে ঝগড়া, অবহেলা, আর্থিক সংকট ও মানসিক অস্থিরতা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেয়। অথচ মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৮৯৩)

অতএব, একজন পিতা যদি নিজের প্রবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সন্তানদের হক নষ্ট করে, তবে তাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। বহুবিবাহ শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। একাধিক পরিবার পরিচালনা করা, সমান ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং সবার মৌলিক অধিকার পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব। কেননা অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম পরিবারের খরচই ঠিকভাবে বহন করতে পারে না। ফলে স্ত্রী ও সন্তানরা কষ্টে জীবনযাপন করে। এটি শরিয়তের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তি যেন তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করে।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৭)

আজ অনেকেই মনে করে একাধিক বিয়ের আকাঙ্ক্ষাই যেন ‘পুরুষত্বের’ প্রমাণ। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যে নিজের কামনাকে প্রশ্রয় দেয়; বরং সে-ই শক্তিশালী, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৬১১৪)

ইসলাম বহুবিবাহকে কখনোই ফ্যান্টাসি বা প্রবৃত্তির খেলায় পরিণত করেনি। এটি কোনো পুরুষতান্ত্রিক সীমাহীন ভোগবিলাসের লাইসেন্সও নয়। বরং এটি একটি ভারী আমানত, যার সঙ্গে জড়িত ইনসাফ, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ ও কঠিন জবাবদিহি। অতএব, যে ব্যক্তি বহুবিবাহের কথা ভাববে, তাকে আগে নিজের ঈমান, চরিত্র, আর্থিক সামর্থ্য, ন্যায়বিচার ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ ইসলাম শুধু ‘বিয়ে করার অনুমতি’ দেয়নি; বরং ‘হক’ আদায়ের বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে। তাই প্রয়োজন—বহুবিবাহকে ফ্যান্টাসির চশমায় নয়, বরং কোরআন-সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা। তাহলেই মানুষ বুঝতে পারবে—ইসলাম কামনার ধর্ম নয়; বরং ন্যায়, সংযম, দায়িত্ব ও পবিত্রতার ধর্ম।

কোরআনের বাণী

আল্লাহ যখন আসমান গুটিয়ে নেবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহ যখন আসমান গুটিয়ে নেবেন
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

یَوۡمَ نَطۡوِی السَّمَآءَ كَطَیِّ السِّجِلِّ لِلۡكُتُبِ ؕ كَمَا بَدَاۡنَاۤ اَوَّلَ خَلۡقٍ نُّعِیۡدُهٗ ؕ وَعۡدًا عَلَیۡنَا ؕ اِنَّا كُنَّا فٰعِلِیۡنَ

সরল অনুবাদ :
সে দিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৪)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
একজন লেখক যেমন লেখার পর খাতাপত্র গুটিয়ে রেখে দেন। যেমন অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, তেমনি আল্লাহ তাআলাও কেয়ামতের আগে আকাশ ও পৃথিবী গুটিয়ে নেবেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আকাশ তাঁর ডান হাতে গুটানো থাকবে।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৬৭) 

এ সম্পর্কে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, মহানবী (সা.) বলেন,  ‘আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে মুষ্টিবদ্ধ করবেন ও আকাশমন্ডলীকে গুটিয়ে নিজের ডান হাতে রাখবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৫৪৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৭৮৭)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বলেছিলেন, যদি জমিন মুষ্টিবদ্ধ থাকে এবং আসমানসমূহ তাঁর ডান হাতে থাকে তাহলে মানুষ কোথায় থাকবে? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, তারা জাহান্নামের পুলের উপর থাকবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৭৯১)

এক বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সপ্ত আকাশকে তাদের অন্তর্বর্তী সব সৃষ্টবস্তুসহ এবং সপ্ত পৃথিবীকে তাদের অন্তর্বর্তী সব সৃষ্টবস্তুসহ গুটিয়ে একত্রিত করে দেবেন। সবগুলো মিলে আল্লাহ তাআলার হাতে সরিষার একটিদানা পরিমাণ হবে। (তাফসিরে জাকারিয়া)


আর سِجِلّ এর অর্থ দপ্তর বা রেজিষ্টার। অর্থ এই যে, লেখকের লেখার পর যেমন কাগজপত্র গুটিয়ে নেওয়া সহজ, তেমনি সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর জন্য আকাশ সুবিস্তৃত হওয়ার সত্ত্বেও তা নিজের হাতের মধ্যে গুটিয়ে নেওয়া কোন কঠিন বিষয় নয়। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

ডিজিটাল যুগে গিবত : পরচর্চার নতুন চেহারা

মুফতি সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ডিজিটাল যুগে গিবত : পরচর্চার নতুন চেহারা
সংগৃহীত ছবি

একসময় গিবত হতো চায়ের দোকানের আড্ডায়, পাড়ার বৈঠকে কিংবা বন্ধুমহলের গল্পে। আজ প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে গিবতের রূপও বদলে গেছে। এখন একটি স্ক্রিনশট, একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ইনবক্স বার্তাই পরিণত হতে পারে গিবত, অপবাদ ও চরিত্রহননের অস্ত্রে। ইসলাম মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণা কর।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

গিবতের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)  বলেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞেস করা হলো, যদি তার মধ্যে সেই বিষয়টি সত্যিই থাকে? তিনি বললেন, ‘যদি তা তার মধ্যে থাকে, তবে তুমি তার গিবত করলে; আর যদি তা না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি, কারও ব্যক্তিগত ভুল, পারিবারিক ঘটনা কিংবা পুরোনো কোনো বক্তব্যের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, সরাসরি মুখোমুখি না বলে অনলাইনে আলোচনা করলে তা গিবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে মাধ্যম নয়, মূল বিষয় হলো অন্যের অপ্রিয় বিষয় তার অনুপস্থিতিতে প্রচার করা। সে কাজ মজলিসে হোক বা মুঠোফোনের পর্দায়—উভয় ক্ষেত্রেই এর বিধান একই। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭)

ডিজিটাল যুগে এই হাদিসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ একটি অসতর্ক মন্তব্য, একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট বা একটি যাচাইহীন শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডিজিটাল গিবতের পরিসর অনেক বড়। একসময় একটি কথার শ্রোতা ছিল কয়েকজন; এখন একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে গুনাহের বিস্তারও বহুগুণ বেড়ে যায়, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় একজন মানুষের সম্মান।

এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে একজন মুসলমানের জন্য আঙুলের ইবাদতও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে, কোনো মন্তব্য লেখার আগে কিংবা কোনো স্ক্রিনশট ফরোয়ার্ড করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—এতে কি কারও সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে নীরব থাকাই তাকওয়ার পরিচয়।

ডিজিটাল মাধ্যম আমাদের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নৈতিকতারও পরীক্ষা নিচ্ছে। একজন মুমিনের পরিচয় শুধু তার নামাজ বা রোজায় নয়; বরং তার জিহ্বা ও কীবোর্ড কতটা মানুষের ক্ষতি থেকে নিরাপদ, তার মধ্যেও নিহিত। আজকের অনলাইন পৃথিবীতে গিবত থেকে বেঁচে থাকাই নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।