বর্তমান সময়ে বিদেশে কর্মসংস্থান, ব্যবসা কিংবা বসবাসের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের ভিসার ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে অনেক স্থানে ‘ভিসা ব্যবসা’ নামে একটি প্রচলিত প্রথা গড়ে উঠেছে। দেখা যায়, কেউ সরকারি বা কোম্পানির দেওয়া ভিসা অধিক মূল্যে বিক্রি করছেন, আবার কেউ ভিসা সংগ্রহে নিজের খরচ ও পরিশ্রমের বিনিময়ে নির্ধারিত অর্থ নিচ্ছেন। এ দুটি বিষয়কে অনেকে একই মনে করলেও ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এদের বিধান এক নয়।
কেননা ভিসা নিজেই কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়; বরং এটি একটি অনুমতিপত্র। তাই এর ওপর শরিয়তের সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান প্রযোজ্য হয় না। তবে ভিসা সংগ্রহে বৈধ সেবা, সময়, শ্রম ও ব্যয়ের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম বৈধ ব্যবসাকে অনুমোদন দিয়েছে; কিন্তু এমন কোনো লেনদেন বৈধ নয়, যেখানে বিক্রয়ের উপযুক্ত বস্তুই নেই বা অন্যায়ভাবে অর্থ গ্রহণ করা হয়।
ভিসা কি ব্যবসার পণ্য?
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিক্রয়যোগ্য বস্তুর কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন— এক. তা মাল (সম্পদ) হতে হবে। দুই. বিক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে। তিন. শরিয়তসম্মতভাবে হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। কিন্তু ভিসা কোনো সম্পদ নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদত্ত প্রবেশ বা কাজের অনুমতি। ফলে এটি স্বাধীনভাবে কেনাবেচার পণ্য নয়। এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরাম (নিরেট অধিকার)-এর ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ বলেননি।
আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ির গ্রন্থে এসেছে, ‘নিরেট অধিকার-এর বিনিময় বা বিক্রয় বৈধ নয়।’ আবার রাদ্দুল মুহতার-এ আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, ‘অগ্রক্রয়ের অধিকার (حق الشفعة)-এর মতো বিমূর্ত অধিকার বিক্রি করা যায় না। এর ওপর ওয়াকফ বা হিবা (দান) করাও বৈধ নয়।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৪/৫১৮, ৭/৩৩–৩৪)
অতএব, ভিসা যেহেতু একটি অনুমতিগত অধিকার, তাই সেটিকে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে বিক্রি করা শরিয়তের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাহলে ভিসার জন্য অর্থ নেওয়া কখন বৈধ?
যদি কোনো ব্যক্তি—
১. ভিসা সংগ্রহে বৈধভাবে আবেদন করেন,
২. দৌড়ঝাঁপ করেন,
৩. কাগজপত্র প্রস্তুত করেন,
৪. সময় ও শ্রম ব্যয় করেন,
৫. সরকারি ফি বা অন্যান্য বৈধ খরচ বহন করেন,
তাহলে তিনি তার প্রকৃত ব্যয় এবং বৈধ সেবার পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারবেন। এটি ভিসা বিক্রি নয়; বরং বৈধ সেবা বা প্রতিনিধিত্ব-এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ।
কখন ভিসা বিক্রি হারাম হবে?
নিম্নোক্ত অবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বৈধ হবে না—
১. কোম্পানি বা সরকার কাউকে বিনামূল্যে ভিসা দিয়েছে কর্মী আনার জন্য;
২. ভিসা সংগ্রহে কোনো ব্যক্তিগত ব্যয় বা শ্রম হয়নি;
৩. শুধুমাত্র ‘ভিসা আছে’—এই কারণে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
এক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে বিক্রি হচ্ছে একটি অনুমতি, যা বিক্রয়যোগ্য সম্পদ নয়। ফলে এভাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ অন্যায় উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সুতরাং ভিসা নিজেই কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। এটি একটি অনুমতিপত্র বা নিরেট অধিকার মাত্র। আর ‘কোনো জিনিসের শুধুমাত্র অধিকার’ সাধারণভাবে কেনাবেচা করা শরিয়তসম্মত নয়। তবে ভিসা সংগ্রহে প্রকৃত খরচ, বৈধ শ্রম, সময় ও সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ বৈধ। কোনো খরচ বা শ্রম ছাড়াই শুধু ভিসার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বৈধ নয়। দালালি, এজেন্সি বা প্রতিনিধিত্বের সেবার পারিশ্রমিক এবং ভিসা বিক্রি—এ দুটি বিষয় এক নয়।
ইসলাম মানুষের উপার্জনকে হালাল ও স্বচ্ছ রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ভিসাকে ব্যবসার পণ্য বানিয়ে মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে, যদি কেউ বৈধভাবে সেবা প্রদান করে তার ন্যায্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রকৃত শ্রম, ব্যয় বা বৈধ সেবার বিনিময় ছাড়া শুধুমাত্র ভিসাকে পণ্য বানিয়ে অধিক মূল্যে বিক্রি করা ইসলামী ফিকহের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, এ বিষয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উচিত আল্লাহভীতি অবলম্বন করা, সন্দেহজনক লেনদেন থেকে বিরত থাকা এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য মুফতিদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ঘটনার আলোকে ফতোয়া গ্রহণ করা। কারণ হালাল উপার্জন শুধু দুনিয়ার বরকতেরই কারণ নয়; বরং আখিরাতের সফলতারও অন্যতম ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুক। আমিন।




