জেদ্দা কর্নিশের শান্ত এক শীতের সকাল। হঠাৎ একটি অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা যেন উন্মোচন করল স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর রহস্য। পৌরসভার একটি গাড়ি রাস্তার বড় গর্তে পড়ে গেলে প্রকৌশলীরা দেখতে পান, সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচের প্রায় সব বালু ও মাটি ধুয়ে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ বিখ্যাত আল-জাজিরা (আল-রাহমা) মসজিদের নিচে কার্যত কোনো দৃশ্যমান ভিত্তিই অবশিষ্ট নেই। অথচ শত শত টনের ইটের তৈরি সেই মসজিদটি তখনও অটল দাঁড়িয়ে—কোনো ফাটল নেই, ধসের কোনো চিহ্ন নেই। মুহূর্তেই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে প্রকৌশলী ও স্থাপত্যবিদদের মধ্যে। কীভাবে সম্ভব হলো এমন ঘটনা? সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্বের খ্যাতিমান মিশরীয় স্থপতি আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিলের সাহসী নকশা, ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী এবং এক অসাধারণ স্থাপত্য-দর্শনের গল্পে।
সম্প্রতি আথির প্ল্যাটফর্মের ‘বিতাফসিল’ অনুষ্ঠানে আল-ওয়াকিল জেদ্দা ও মদিনার বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণের নেপথ্যের এমনই বহু অজানা গল্প তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৮০-এর দশকে জেদ্দার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ ফারসিকে একটি প্রবাল দ্বীপের ওপর মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেন আল-ওয়াকিল। আন্তর্জাতিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে ৪০ মিটার গভীর কংক্রিট ও স্টিলের ভিত্তি নির্মাণের পরামর্শ দিলেও তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন।
তিনি রড ও কংক্রিটের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী ইট, পোড়ামাটি, গম্বুজ ও খিলানভিত্তিক নির্মাণশৈলী ব্যবহার করে মসজিদটি নির্মাণ করেন। সমুদ্রের আর্দ্রতা, লবণাক্ত পরিবেশ ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই নকশা ছিল অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত।
পরে যখন সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচের মাটি ধুয়ে নিয়ে বড় ধরনের ফাঁপা জায়গা তৈরি করেও ভবনটিতে কোনো ফাটল সৃষ্টি করতে পারেনি, তখন অনেকের কাছেই এটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ দৃঢ়তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে ওঠে।
জেদ্দায় সফলতার পর আল-ওয়াকিলকে মদিনার কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদের সংস্কার ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন এবং মিকাত জিল হুলাইফা। মসজিদে কুবার কাজ চলাকালে ঘটে আরেকটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। এক বৃদ্ধ ব্যক্তি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই নির্মাণকাজে অংশ নিতে অনুরোধ করেন। নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে বাধা দিলে তিনি বলেন, ‘তোমরা কি মনে করো, তোমরাই এই মসজিদ নির্মাণ করছ? চারদিকে তাকাও, ফেরেশতারা এখানে তাওয়াফ করছে, তারাই এই মসজিদ নির্মাণ করছে।’ আল-ওয়াকিল বলেন, সেই বৃদ্ধের কথাগুলো আজও তার হৃদয়ে গেঁথে আছে।
আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিলের বিশ্বাস, একটি স্থাপনার সৌন্দর্য শুধু নকশায় নয়; বরং মানুষের শ্রম, দক্ষতা ও আন্তরিকতায় নিহিত। ইতালীয় শিল্পী সিলভিও বিকি এবং প্রখ্যাত স্থপতি হাসান ফাতির কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন—এমন বিস্ময়কর স্থাপত্য-দক্ষতা।
তার ভাষায়, ‘যখন মানুষের হাত কাজ করে না, তখন তার চিন্তাশক্তিও ক্ষয় হতে থাকে।’ এ কারণেই তিনি কাদা, ইট ও প্রাকৃতিক উপকরণভিত্তিক নির্মাণশৈলীর পক্ষে সোচ্চার ছিলেন এবং অতিরিক্ত কংক্রিটনির্ভর স্থাপত্যের সমালোচনা করতেন। তার মতে, দক্ষ কারিগরের হাতে গড়া প্রতিটি দেয়ালে এক ধরনের সৌন্দর্য ও কল্যাণের ছাপ থাকে, যা যান্ত্রিক নির্মাণে পাওয়া যায় না।
আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিলের কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। জেদ্দার আল-জাজিরা (আল-রাহমা) মসজিদের নকশার জন্য তিনি ১৯৮৪ সালে লন্ডনের একটি স্থাপত্য সাময়িকীর পুরস্কার লাভ করেন। পরে ১৯৮৯ সালে একই মসজিদের জন্য অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার।
এ ছাড়া ইসলামিক স্থাপত্যে অবদানের জন্য তিনি কিং ফাহাদ পুরস্কার, আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের সম্মানসূচক ফেলোশিপ এবং ২০০৮ সালে ক্ল্যাসিকাল স্থাপত্যে অবদানের জন্য রিচার্ড ড্রেইহাউস পুরস্কারে ভূষিত হন। এমনকি ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসও তাকে অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের নকশা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আল-ওয়াকিলের মতে, স্থাপত্য শুধুমাত্র ইট-পাথরের সমষ্টি নয়; বরং এটি মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যবোধের এক জীবন্ত প্রকাশ।
সূত্র : আল জাজিরা ও উইকিপিডিয়া




