• ই-পেপার

মসজিদুল হারামে প্রায় এক কোটি মুসল্লি

প্রিয়জনের বিচ্ছেদে পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
প্রিয়জনের বিচ্ছেদে পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

প্রিয়জনের বিচ্ছেদ মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। বাবা-মা, সন্তান, জীবনসঙ্গী, আত্মীয় কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের মৃত্যু বা বিচ্ছেদ হৃদয়কে গভীরভাবে শোকাহত করে। এমন মুহূর্তে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন, কিন্তু ইসলাম শোককে হতাশায় নয়—ধৈর্য, দোয়া ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসায় রূপান্তর করতে শিক্ষা দেয়। তাই বিপদ-আপদ ও প্রিয়জন হারানোর বেদনাময় সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে একটি মহামূল্যবান দোয়া শিখিয়েছেন। দোয়াটি হলো-

 إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

উচ্চারণ : ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহুম্মা আজুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়া আখলিফ লী খাইরাম মিনহা।
অর্থ : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)

সুরা মুলক তিলাওয়াতের মহিমান্বিত ফজিলত

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুরা মুলক তিলাওয়াতের মহিমান্বিত ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

মৃত্যুর পরই শুরু হয় আখিরাতের প্রথম ধাপ—আলমে বরজাখ বা কবরের জীবন। এ জীবনে সফলতার জন্য প্রয়োজন ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর রহমত। তাই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এমন কিছু আমল নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা আখিরাতের পথে আলোর দিশা হয়ে দাঁড়ায়। সেই মহামূল্যবান আমলগুলোর অন্যতম হলো প্রতিদিন সুরা মুলক তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সুরার এমন ফজিলতের কথা জানিয়েছেন, যা প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে এ সুরার প্রতি বিশেষ ভালোবাসা সৃষ্টি করে।

সুরা মুলক পবিত্র কোরআনের ৬৭তম সুরা। এতে মোট ৩০টি আয়াত রয়েছে। ‘মুলক’ অর্থ—রাজত্ব, সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় ক্ষমতা। সুরার শুরুতেই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—‘অতি বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১)
এই সুরায় আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টি জগতের নিখুঁত ব্যবস্থা, মৃত্যু ও জীবনের উদ্দেশ্য, কিয়ামত, জান্নাত-জাহান্নাম এবং মানুষের জবাবদিহিতার বিষয় অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

সুরা মুলক পাঠের মহিমান্বিত ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সুরা আছে। তা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, অবশেষে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেটি হলো—‘তাবারাকাল্লাজি বিইয়াদিহিল মুলক’।” (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪০০)»

অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘এটি (সুরা মুলক) কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী।’ (সুনান নাসায়ি)

সহিহ হাদিসে আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা সাজদা ও সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত না করে ঘুমাতে যেতেন না।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯২)
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তিলাওয়াত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

সুরা মুলকের বিষয়বস্তু
১. আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার ঘোষণা (আয়াত ১–৪) এ অংশে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, জীবন-মৃত্যুর উদ্দেশ্য এবং সাত আসমানের নিখুঁত সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

২. জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতা (আয়াত ৫–১৫) অবিশ্বাসীদের পরিণতি, জাহান্নামের ভয়াবহতা এবং মুমিনদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ তুলে ধরা হয়েছে।

৩. আল্লাহর শাস্তির সতর্কবার্তা (আয়াত ১৬–২২) মানুষকে অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

৪. মানুষকে আত্মসমালোচনার আহ্বান (আয়াত ২৩–২৪) আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন—তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় দিয়েছেন; অথচ মানুষ খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

৫. কিয়ামত সম্পর্কে মানুষের প্রশ্ন (আয়াত ২৫–২৭) অবিশ্বাসীরা কিয়ামতের সময় জানতে চাইলেও এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

৬. আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা (আয়াত ২৮–৩০) শেষ আয়াতগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন, পানি, রিজিক—সবকিছুই আল্লাহর দান; তিনি চাইলে মুহূর্তেই তা কেড়ে নিতে পারেন।

কখন সুরা মুলক পড়বেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা সাজদা ও সুরা মুলক তিলাওয়াত না করে কোনো দিন ঘুমাতেন না। তার মানে এই নয় যে সুরাটি দিনে পড়া যাবে না। যেকোনো সময়ই পড়া যাবে, তবে রাতে বিশেষ জিকির হিসেবে এ সুরা পড়া উত্তম। সুরাটি নামাজের সঙ্গে পড়াও ভালো। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে অর্থ বুঝে পড়লে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়।

আমাদের করণীয়
১. প্রতিদিন রাতে সুরা মুলক তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা।
২. সুরাটি মুখস্থ করার চেষ্টা করা।
৩. অর্থ ও তাফসির বুঝে পড়া।
৪. এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
৫. সন্তানদেরও এ সুরা শেখানো।

সুরা মুলক আল্লাহর মহিমা, আখিরাতের জবাবদিহি এবং ঈমানকে দৃঢ় করার এক অনন্য শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সুরার বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন এবং নিয়মিত তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত প্রতিদিন বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এ সুরা পাঠ করা, এর অর্থ অনুধাবন করা এবং এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গঠন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুরা মুলকের বরকত লাভের তাওফিক দান করুন, কবরের শাস্তি থেকে হেফাজত করুন এবং কিয়ামতের দিন এ সুরার সুপারিশ নসিব করুন। আমিন।
 

জুমার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

মুফতি ওমর বিন নাছির
জুমার দিন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী
সংগৃহীত ছবি

সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমার দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময়। এটি মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এই দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে এবং কিয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিনেই। তাই জুমার দিন শুধু একটি ইবাদতের দিন নয়; বরং এটি ঈমান, আত্মশুদ্ধি, ঐক্য ও আখিরাতের স্মরণে নিজেকে প্রস্তুত করার এক মহামূল্যবান সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের ফজিলতের পাশাপাশি এ দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত ভবিষ্যতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও সংবাদ দিয়েছেন। এসব ভবিষ্যদ্বাণী মানুষের জন্য সতর্কবার্তা, যাতে তারা গাফিলতি ছেড়ে আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

১. কিয়ামত সংঘটিত হবে জুমার দিনেই
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দিনগুলোর ওপর সূর্য উদিত হয়, তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এ দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে এবং কিয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিনেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)

এ হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতি জুমা কিয়ামতের একটি স্মারক। তাই প্রতিটি জুমাকে আখিরাতের প্রস্তুতির নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

২. জুমার দিন এমন একটি সময় রয়েছে, যখন দোয়া কবুল হয়
নবী (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম বান্দা সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কল্যাণের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ অবশ্যই তা কবুল করেন।’ এরপর তিনি হাতের ইশারায় বোঝালেন, সেই সময়টি খুবই অল্প।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৫২)

আলেমদের অধিকাংশের মতে, এই সময়টি আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

৩. দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘মদিনার প্রতিটি প্রবেশপথে ফেরেশতা পাহারায় থাকবে। তাই সেখানে প্লেগ এবং দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৮০)

আরো বর্ণিত হয়েছে, দাজ্জাল জুমার দিন মদিনার নিকটবর্তী এক লবণাক্ত প্রান্তরে অবস্থান করবে এবং শহরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হবে। এটি মহানবী (সা.)-এর একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী, যা শেষ যুগের ঘটনাবলির অংশ।

৪. জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পাঠের নির্দেশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। অতএব এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কেননা তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

এ হাদিস অনুযায়ী জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা বিশেষ আমল।

৫. জুমার দিনের গুরুত্ব অবহেলা করলে অন্তর মোহরাঙ্কিত হয়ে যায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা অবহেলাবশত জুমা ত্যাগ করে, তারা যেন অবশ্যই বিরত হয়; অন্যথায় আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেবেন। অতঃপর তারা গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৮৬৫)
এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক কঠোর সতর্কবার্তা। ধারাবাহিকভাবে জুমা পরিত্যাগ করলে মানুষের হৃদয় কঠিন হয়ে যায় এবং ঈমান দুর্বল হতে থাকে।

জুমার দিন শুধু একটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়; বরং এটি ঈমানকে নবায়ন, গুনাহ থেকে তাওবা এবং আখিরাতের প্রস্তুতির এক অনন্য সুযোগ। মহানবী (সা.) জুমার দিনকে কেন্দ্র করে যে ভবিষ্যদ্বাণীগুলো করেছেন, সেগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একদিন কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, আর সেই দিনের জন্য প্রস্তুতিই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তাই আসুন, প্রতিটি জুমাকে জীবনের শেষ জুমা মনে করে আন্তরিক তাওবা করি, সালাতের প্রতি যত্নবান হই, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি, দোয়ায় মগ্ন থাকি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সফল আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার মর্যাদা যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তার হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যে ১০ গুণ মানুষকে প্রশংসনীয় করে তোলে

হাদি উল ইসলাম
যে ১০ গুণ মানুষকে প্রশংসনীয় করে তোলে
সংগৃহীত ছবি

সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও উদারতা মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। কিন্তু আজকের যুগে এই গুণটি বিরল হয়ে পড়ছে। সহনশীলতা কখনোই নিজের অধিকার নষ্ট করা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা নয়। বরং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়াই প্রকৃত সহনশীলতা। এ কারণেই মিসরের শাসক হওয়ার পরও নবী ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের ক্ষমা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের প্রতি কোনো ভর্ত্সনা নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনিই সর্বাধিক দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৯২)

সহনশীলতা মানে বাড়াবাড়ি নয়, আবার অবহেলাও নয়। মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিতে হবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতে হবে, তবে তা হতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।
আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় আলোচনা করো।’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ১২৫)

কিভাবে সত্যিকার সহনশীল মানুষ হওয়া যায়, এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসের আলোকে নিম্নে আলোচনা করা হলো—

১. ধৈর্য ধারণ করা : সহনশীল হতে হলে সর্বপ্রথম ধৈর্যশীল হতে হবে। ধৈর্যেরও বিভিন্ন স্তর আছে, আর তার মধ্যে সর্বোচ্চ হলো সুন্দর ধৈর্য (সবরুন জামিল) যে ধৈর্যে অভিযোগ বা অসন্তোষ থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করো।’ (সুরা : আল-মুদ্দাসসির, আয়াত : ৭)

২. উত্তম পদ্ধতিতে আলোচনা করো : সহনশীল মানুষ অকারণ তর্ক-বিতর্কে জড়ায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি জান্নাতের প্রান্তে একটি ঘরের দায়িত্ব নিচ্ছি সেই ব্যক্তির জন্য, যে সত্যের ওপর থেকেও তর্কবিতর্ক পরিত্যাগ করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৪৬৪)

৩. মানুষের সঙ্গে মেশা এবং তাদের কষ্ট সহ্য করা : সহনশীল ব্যক্তি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন না; বরং মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্ট ও আচরণ ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। তিনি কোমলতা ভালোবাসেন। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সব কাজে কোমলতা পছন্দ করেন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৮১)

৪. সহযোগিতা সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ : অনেক সময় এমন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, যাদের চিন্তা, ধর্ম বা সংস্কৃতি আমাদের থেকে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু যদি সেই সহযোগিতা মানবকল্যাণে হয়, তবে তা প্রশংসনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৮৯)

৫. জ্ঞানের ক্ষেত্রে অহংকার ত্যাগ করা : সহনশীল ব্যক্তি কখনো মনে করেন না যে তিনি সব জানেন। তিনি ছোট-বড় সবার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—কাক আমাদের শিখিয়েছে মৃতদেহ দাফনের পদ্ধতি। হুদহুদ পাখি শিখিয়েছে, কোনো সংবাদ গ্রহণের আগে তা যাচাই করা কতটা জরুরি। সে বলেছিল, ‘আমি এমন বিষয় জেনেছি, যা তুমি জানো না। আমি তোমার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ২২)

৬. মানুষের প্রতি সুধারণা পোষণ করা : এটিও সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পিঁপড়াটি তার সঙ্গীদের বলেছিল, ‘তোমরা নিজেদের বাসায় প্রবেশ করো, যাতে সুলায়মান ও তার বাহিনী অজান্তে তোমাদের পিষে না ফেলে।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ১৮)

লক্ষ করুন, সে বলেনি যে সুলায়মান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ক্ষতি করবেন; বরং বলেছে, ‘তারা বুঝতে পারবে না।’ অর্থাৎ সে তাদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করেছে।

৭. সত্যবাদী ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি সত্যবাদী, নির্মল হৃদয়ের এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় পবিত্র এবং যার জিহ্বা সত্যবাদী।’  সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘পবিত্র হৃদয় কী?’ তিনি বললেন, ‘যে হৃদয়ে কোনো পাপ, সীমা লঙ্ঘন বা হিংসা নেই।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৯১)

৮. আশাবাদী হওয়া এবং অন্যদেরও আশাবাদী করা : সহনশীল ব্যক্তি কখনো নিরাশাবাদী হন না। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতেও আশার আলো দেখান। ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহর রহমত থেকে শুধু কাফিররাই নিরাশ হয়।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)

৯. অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও ন্যায় ও দয়া প্রদর্শন করা : সহনশীল ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম চুক্তিবদ্ধ নাগরিককে হত্যা করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৬৪৫৭)

তিনি আরো উৎসাহ দিয়েছেন অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও দান-সদকা করতে। (সিলসিলাহ সহিহাহ : ২৭৬৬)

১০. কেনাবেচায় উদার হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্যেও উদার ও সহজ-সরল হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রয়ের সময়, ক্রয়ের সময়, পাওনা আদায়ের সময় এবং দেনা পরিশোধের সময় উদারতা প্রদর্শন করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৪৯৫)

এই দশটি গুণ ছাড়াও আরো একটি উল্লেখযোগ্য গুণ হলো- সবার প্রতি দয়াশীল হওয়া : সহনশীল ব্যক্তি ছোট-বড় সবার প্রতি স্নেহশীল এবং অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করো, আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৫২২)

পরিশেষে তুমি যদি ধৈর্যশীল হও, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারো, জীবনের সব ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, সত্যের ওপর থেকেও অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়িয়ে চলো, মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের কষ্ট সহ্য করো, কোমলতা ও সহযোগিতাকে ভালোবাসো, জ্ঞানের ক্ষেত্রে অহংকার না করে সবার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, কোনো সংবাদ যাচাই না করে বিশ্বাস করো না, মানুষের জন্য অজুহাত খুঁজে নাও এবং তাদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করো, কথাবার্তা ও কাজে সত্যবাদী হও, নির্মল হৃদয় নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকো, নিজে আশাবাদী হও এবং অন্যদেরও আশাবাদী করো, ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সদাচরণ করো, কেনাবেচা ও লেনদেনে উদার হও, ছোট-বড় সবার প্রতি দয়া করো, তাহলে তুমি সহনশীলতার পথে অগ্রসর হচ্ছ।