বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতীয় ইসলামী স্কলার আল্লামা ড. খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানি।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হলো নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং সর্বস্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও কোরআনের শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজের আগে প্রদত্ত বয়ানে তিনি এসব কথা বলেন। পরে জুমার নামাজ শেষে জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালিকের অনুরোধে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন তিনি।
বয়ানের শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করেন সাজ্জাদ নোমানি। এরপর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বায়তুল মোকাররমের খতিব এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
আদর্শ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে সাজ্জাদ নোমানি পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নাহলের ১১২ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন, আল্লাহ তাআলা একটি নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জনপদের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে চারদিক থেকে পর্যাপ্ত জীবিকা পৌঁছে আসে। এ আয়াতের আলোকে একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব মানুষের খাদ্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না এবং কেউ অভুক্ত থাকবে না।
রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, এ প্রসঙ্গে তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক দোয়ার কথা উল্লেখ করেন, যা সুরা ইবরাহিমের ৩৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রাসুলরাও আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। নিরাপত্তা একটি বড় নেয়ারমত, যা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ পেয়েছেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত। সুরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষ যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে, তবে আল্লাহ সেই নেয়ামত আরও বৃদ্ধি করে দেন।
সাজ্জাদ নোমানি দেশের আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যা বিশ্বের সামনে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার, বিরোধী দল, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মুসলিম নারী-পুরুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রত্যেকে যেন প্রতিদিন কুরআনের কিছু অংশ অর্থসহ পড়েন এবং কোরআনের শিক্ষা বোঝার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করেন।
তিনি বলেন, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং এমনভাবে দেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, শয়তান যেন বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। উলামায়ে কেরামের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবেশ। মানুষ তখনই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, যখন তার জান-মাল, ইজ্জত-আবরু ও মৌলিক অধিকার নিরাপদ থাকে এবং জীবিকার পথ উন্মুক্ত থাকে।
তিনি বলেন, এই শান্তি কেবল শক্তি, ক্ষমতা কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং এর প্রকৃত ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, সমতা ও ইনসাফ। সমাজে যখন বৈষম্য, জুলুম, বেইনসাফি ও অধিকার হরণের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে, তখন শান্তি নষ্ট হয়, মানুষের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি ফের সুরা আন-নাহলের ১১২ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রাচুর্য একটি আদর্শ সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
এরপর সুরা কুরাইশের আয়াত তিলাওয়াত করেন তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ক্ষুধা থেকে মুক্তি এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি প্রয়োজন। তাই মানুষের কর্তব্য হলো আল্লাহর বিধান অনুসরণ করা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন সব ক্ষেত্রেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, ভয় দূর হবে এবং স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে।
এ সময় তিনি কোরআনের দুটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, প্রত্যেক মানুষের উচিত আত্মসমালোচনা করা নিজের প্রতি, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না। অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও সমাজের প্রতিটি স্তরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তিনি বলেন, সমাজ পরিবর্তনের সূচনা রাষ্ট্র থেকে নয়; বরং ব্যক্তি ও পরিবার থেকেই শুরু হয়। প্রত্যেকের সংকল্প হওয়া উচিত নিজের কারণে যেন কোনো মানুষ কষ্ট না পায়।
প্রতিবেশীর হক আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য যে কোনো ধর্মাবলম্বী হোক না কেন, তার পাশে দাঁড়াতে হবে, খোঁজ নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি প্রত্যেককে প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বলার আহ্বান জানান, আপনার কোনো বিপদ, অসুবিধা বা প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।
তিনি বলেন, এমন মানবিক আচরণ বহু বছরের দূরত্ব ও অবিশ্বাস দূর করতে পারে। মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো।




