দেশজুড়ে বিভিন্ন থানা ও আদালতের মালখানাগুলোয় পহাড়সম জব্দকৃত আলামত ও সম্পত্তি পড়ে আছে। এর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখেরও বেশি। বিচার শেষ না হওয়া, রায়ের অনুলিপি সময়মতো না পৌঁছানো, জায়গার তীব্র সংকট, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় বছরের পর বছর ধরে জমে আছে লাখ লাখ আলামত।
এরমধ্যে জায়গা না থাকায় হাজার হাজার জব্দকৃত গাড়ি, মোটরসাইকেল, ট্রাক, বাস, নৌযানসহ বড় আকারের সম্পত্তি রাখা হচ্ছে থানা ভবনের সামনে, গেটের পাশে অথবা চলাচলের রাস্তায় কিংবা খোলা আকাশের নিচে। ফলে দীর্ঘদিন রোদ-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে এসব সম্পত্তির বড় অংশই ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যাচ্ছে। বুধবার (৮ জুলাই) এক রিটের প্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব বিষয় উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। পরে আদালত এ বিষয়ে নতুন করে আদেশ দিয়েছেন।
এদিন বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের বেঞ্চ বিভিন্ন থানা ও আদালতের মালখানার ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। সেই সঙ্গে কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমানে দেশের থানা ও আদালতের মালখানায় ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি জব্দকৃত আলামত ও সম্পত্তি সংরক্ষিত রয়েছে। এরমধ্যে ৩৫ হাজার ৫৮৮টি যানবাহন ও জলযান এবং ১৪ লাখের মতো অন্যান্য আলামত ও সম্পত্তি রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, থানায় ১ হাজার ৯৬৪টি এবং আদালতে ১ হাজার ৭৬৪টি যানবাহন ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জব্দ অবস্থায় রয়েছে। যানবাহনের বাইরে অন্যান্য আলামতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। থানায় ৬ হাজার ৮২০টি এবং আদালতে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৭০টি আলামত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মালখানায় সংরক্ষিত রয়েছে।
অর্ধেকের বেশি মালখানা সংকটে রয়েছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, সারাদেশে থানার ৭৪০টি এবং আদালতের ২২৭টি মালখানার মধ্যে মাত্র ৩৭২টি মালখানা ব্যবহার উপযোগী ও পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন। বাকি অধিকাংশ মালখানায় হয় জায়গার সংকট নয়তো ভবন অনুপযোগী। আবার অনেক মালখানা পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। থানার মালখানার বর্তমান জায়গা ২ লাখ ৬৬ হাজার বর্গফুট, অথচ প্রয়োজন প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট। আদালতের মালখানার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সারাদেশের কোর্ট মালাখানায় জায়গা আছে ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ ফুট, অথচ প্রয়োজন ৫ লাখ ১৯ হাজার ৩৩২ ফুট।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বড় আকারের জব্দকৃত সম্পত্তি রাখার জন্য সরকারিভাবে কোনো ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই। মোখিক অনুমোদনের ভিত্তিতে অনেক থানা ও আদালত খোলা জায়গা ব্যবহার করছে। এরমধ্যে মাত্র ৬টি থানায় শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা রয়েছে। আর যেসব থানার আশপাশে সরকারি বা কোনো সংস্থার উন্মুক্ত জায়গা নেই, সেসব থানা ভবনের সামনে-পিছনে, গেটে অথবা চলাচলের রাস্তায় কিংবা ফাঁকা জায়গায় নিরুপায় হয়ে বড় বড় আলামত বা সম্পত্তি রাখা হচ্ছে।
জব্দকৃত আলামতের পরিমাণ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশে জব্দকৃত মুলতবি যানবাহন ও জলযানের সংখ্যা ৩৫ হাজার ৫৮৮টি। যার মধ্যে মামলার আলামত ৩০ হাজার ৬২০টি, ক্রোকি সম্পত্তি ৩৬৩টি এবং জিডিমূলে জব্দকৃত সম্পত্তির মধ্যে দাবিদার আছে ১ হাজার ৩৭৪টির ও দাবিদারহীন সম্পত্তি আছে ৩ হাজার ২৩১টি। এছাড়া যানবাহন ও জলযান ব্যতীত সারাদেশে জব্দকৃত অন্যান্য মুলতবি সম্পত্তি ও আলামতের সংখ্যা ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি। যার মধ্যে মামলার আলামত ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৮০৪টি, ক্রোকি সম্পত্তি ৯৭৬টি এবং জিডিমূলে জব্দকৃত সম্পত্তির মধ্যে দাবিদার আছে ১ হাজার ৩৮৪টির ও দাবিদারহীন সম্পত্তি আছে ৩ হাজার ৯১৩টি।
রায়ের কপি না পৌঁছানোয় জট বাড়ছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আদালত থেকে মামলা নিষ্পত্তির পর যেসব মামলায় আলামত রয়েছে, সেসব মামলার আলামত সংক্রান্ত নির্দেশনার আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট মালখানা অফিসারের নিকট না পৌঁছার কারণে আলামতগুলো দীর্ঘদিন মালখানায় সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে দিন দিন আলামত মালখানায় জমে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার কোর্ট মালখানায় সংরক্ষিত আলামত নিয়মিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে দিন দিন আলামতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে থানা থেকে তদন্ত নিষ্পত্তি মামলার আলামত আদালতে প্রেরণের বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে উল্লিখিত মামলার আলামত থানায় সংরক্ষণ করতে হয়।
আলামত রক্ষণাবেক্ষণে অসুবিধার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, থানা ও কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মালখানাগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনায় তৈরি না হওয়ায় এবং অধিকাংশ মালখানাই পুরাতন ও জরাজীর্ণ অথবা পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে হওয়ায় দীর্ঘ বিলম্বে বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়া মামলার বহু আলামতগুলো পর্যাপ্ত ভৌত কাঠামোর অভাবে একত্রে রাখা হচ্ছে। এতে মূল্যবান আলামতগুলো বিচার চলাকালীন সময়ে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। কিছু কিছু থানা ও কোর্ট প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও নতুন মালখানা তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দ না থাকায় যুগোপযোগী মালখানা স্থাপন সম্ভব হয় না। আলামতগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিকের অভাবও রয়েছে। ফলে মূল্যবান আলামতগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি উত্তরণে প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ব্যবহার অনুপযোগী ও স্থান সংকুলান হয় না এমন ১২২টি (থানা- ৭৩টি এবং কোর্ট- ৪৯টি) মালখানাকে ব্যবহার উপযোগী ও পর্যাপ্ত স্থান সংকুলানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ব্যবহার উপযোগী কিন্তু স্থান সংকুলান হয় না এমন ৩৯৯টি (থানা- ৪১৪টি এবং কোর্ট- ৮৫টি) মালখানাতে পর্যাপ্ত স্থান সংকুলানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, স্থান সংকুলান হয় কিন্তু ব্যবহার ও উপযোগী নয় এমন ৭৪টি (থানা- ৫২টি এবং কোর্ট- ২২টি) মালখানাকে ব্যবহারের উপযোগী করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জব্দকৃত ৩৫ হাজার ৫৮৮টি (থানায়- ২৫ হাজার ৭২০টি এবং কোর্টে- ৯ হাজার ৮৬৮টি) যানবাহন ও জলযান এবং ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি (থানায়- ৪৫ হাজার ৭৯৯টি এবং কোর্টে ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৮টি) যানবাহন ও জলযান ব্যতীত অন্যান্য মালামাল বা সম্পত্তি সংরক্ষণের জন্য থানা ও কোর্ট মালখানায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক কক্ষ বা পার্কিং জোন না থাকায় পুলিশ নিরুপায় হয়ে কোর্ট এরিয়া, থানা এরিয়ার নিকটবর্তী স্থান এবং থানার আশপাশে সরকারি বা কোনো সংস্থার উন্মুক্ত জায়গায়, থানা ভবনের সামনে-পেছনে, গেটে কিংবা চলাচলের রাস্তায় অথবা ফাঁকা জায়গায় বড় বড় আলামত বা সম্পত্তি রাখছে। ফলে দীর্ঘদিন আলামত ও সম্পত্তি খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় তা অকেজো বা অচল হয়ে যাচ্ছে। জব্দকৃত যানবাহন ও জলযান সংরক্ষণের জন্য আলাদা জায়গা শেড, ছাউনি তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।






