
আমেনা আক্তার, পঞ্চম শ্রেণি, ফরিদাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা


আমেনা আক্তার, পঞ্চম শ্রেণি, ফরিদাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা
![[ মাথা খাটাও ]](https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/2026/07/06/1783276631-693128e7d60181d5ce2e97e04e872e85.jpg)
ফুটবল খেলতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে খোকা। গোলপোস্ট খুঁজে পাচ্ছে না। তুমি কি পারবে খোকাকে গোলপোস্টের সন্ধান দিতে?

বাবা আমার সেরা বন্ধু। কত, আদর, স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে যত্ন করে আমাকে বড় করে তুলেছেন! তাঁর অবদান অনেক। তিনি একজন সহজ-সরল ও কোমল হৃদয়ের মানুষ। বাবাকে নিয়ে অনেক মজার স্মৃতি আছে। দুষ্টুমি করলে ক্ষমা করে দেন। মাকে না জানিয়ে আইসক্রিম, ফুচকা, ঝালমুড়ি কিনে দিয়ে বলেন, ‘খবরদার, মা যেন না জানে।’ এবার বিশ্বকাপে আমাকে জার্সি আর পতাকা উপহার দিয়েছেন। বাবার সঙ্গে মিলে আমার প্রিয় দলের পতাকা বাঁশ দিয়ে টানিয়েছি। মাঠে বাবার কাছ থেকে ফুটবল খেলার কৌশল শিখেছি। শুধু কি তাই! আমার জন্মদিনে সবুজ পৃথিবী গড়তে নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে বাবা শত শত মানুষকে গাছের চারা উপহার দিয়েছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, আমি বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হব। আমার মতামতকেও গুরুত্ব দেন। তিনি আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকও। কারণ পড়াশোনায় সাহায্য করেন। তিনি বটগাছের মতো ছায়া দেন। বাবা, তোমাকে নিয়ে গর্বিত। তোমাকে খুব ভালোবাসি।

বাগানের দিকটা খুব নির্জন। দুপুরের পর যেন আরো বেশি নির্জন হয়ে যায়। বাঁশঝাড়গুলো হাওয়ায় শনশন করে। ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝি ডাকতে থাকে। ঝোপঝাড় এতই ঘন, ভেতরে ঢোকাই সম্ভব না। সেই ঝোপের ভেতর থেকেই বেরিয়ে এলো মেয়েটি। মুমুর মতোই বয়স। নয়-দশ বছর। মুমু তাকে দেখে অবাক।
‘কোন বাড়ির মেয়েগো তুমি? ঝোপের ভেতর কী করছিলে?’
মেয়েটি মিষ্টি করে হাসল। ‘আমাদের বাড়ি ওই ওদিকটাতে।’
‘ঝোপের ভেতর কারো বাড়ি হয় নাকি?’
‘না না, ঝোপের ভেতর না, ঝোপের ওই পারে।’
‘ঝোপ তো শেষ হয়েছে খালপারে গিয়ে!’
‘আমাদের বাড়ি ওই খালের ধারেই।’
‘শুনেছি খালের ধারে শুধুই হিজলগাছের বন। ওখানে কারো বাড়ি আছে এমন তো শুনিনি!’
মেয়েটি আবার আগের মতো হাসল। ‘আছে, আছে। তুমি জানো না। এই বাড়িতে নতুন এসেছ তো, কয়েক দিন থাকলেই সব জেনে যাবে।’
মেয়েটি ঠিকই বলেছে। মুমুরা এই বাড়িতে নতুন এসেছে। গ্রামের নাম রঘুরামপুর। এখানে নতুন একটা ইস্কুল হয়েছে। মুমুর বাবা সেই ইস্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এসেছেন। মাত্র পাঁচ দিন হলো ওরা এই গ্রামে এসেছে। এখনো গ্রামের অনেক কিছুই দেখা হয়নি। জানাও হয়নি অনেক কিছু।
গ্রাম কেন, এই বাড়ির কথাই তো পুরোপুরি জানা হয়নি। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা খাল। খালের ধারে ঝোপঝাড় আর হিজলগাছের বন। সেদিকটায় বিশাল বাগানবাড়ি। বাড়ির যিনি মালিক, তিনিই ইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিজে পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকায়। বড় ব্যবসায়ী। মুমুর বাবাকে ইস্কুলের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। এই বাড়িতে করেছেন তাঁর থাকার ব্যবস্থা। বাড়িতে কাজের লোক আছে নয়ন, নয়নের বউ আর মা। তারা তিনজনেই সব সামলায়। মাকে কোনো কাজই করতে হয় না। আর মুমুকে তো করতে হয় না কিছুই। সে পড়ে ক্লাস ফোরে। বাবা যে ইস্কুলের হেডমাস্টার, সেখানেই ভর্তি হয়েছে। এখনো ক্লাস শুরু হয়নি। দুপুরে খেয়েদেয়ে মা ঘুমিয়ে পড়েন। বাবা বাড়িতে থাকলে তিনি থাকেন লেখাপড়া নিয়ে। বাবা বই পড়তে ভালোবাসেন। সব সময়ই তাঁর হাতে একটা না একটা বই থাকবেই। বাবা এখন বাড়িতে নেই। ইস্কুলের পরিচালকদের সঙ্গে মিটিং করতে গেছেন। ইস্কুলটা বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে।
মুমুও আজ মায়ের সঙ্গে শুয়েছিল। তার ঘুম আসেনি। উঠে বাগানের দিকে এসেছে। সেদিকটায় কী একটা পাখি টিউটিউ করে ডাকছিল। মেয়েটি বেরিয়ে এলো, পাখির ডাকটাও বন্ধ হয়ে গেল।
মুমু জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কী গো?’
‘আমার নাম, আমার নাম? ইয়ে, নাম হচ্ছে গিয়ে কুসুমকুমারী দেবি।’
‘বাপ রে! কঠিন নাম দেখছি। কুসুমকুমারী দেবি! এত বড় নামে সবাই তোমাকে ডাকে?’
‘না না, ডাকে তো অন্য নামে!’
‘আরো নাম আছে তোমার?
‘আছে তো! কুসমি! কুসমি বলেই সবাই ডাকে।’
‘এই নামটা ভালো না। কুসমি কোনো নাম হলো? কুসুম কত সুন্দর নাম। কুসুম অর্থ ফুল। কুসমির তো কোনো অর্থই নেই।’
‘তুমি ঠিক বলেছ। কোথায় কুসুম আর কোথায় কুসমি? তুমি আমাকে কুসুম বলেই ডেকো।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এই রকম ঝোপ ভেঙে তুমি কেমন করে এলে? মানুষ কি এমন ঝোপের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করতে পারে?’
‘আমরা পারি। কোনো অসুবিধা হয় না। গায়ে আঁচড়টিও লাগে না।’
‘কী করে সম্ভব?’
‘সম্ভব তো! চাইলেই সম্ভব। আমাদের পক্ষে অনেক কিছুই সম্ভব। মানে বলছিলাম কি, বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করতে করতে আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। হি হি হি। রাতদুপুরেও আমি এই পথেই চলাফেরা করি।
মুমু অবাক। ‘রাতদুপুরে তুমি বাড়ি থেকে বেরোও? মা-বাবা তোমাকে একা একা বেরোতে দেন?’
‘ওই দ্যাখো মুমু কী বলে? আমার তো মা-বাবা নেই। আমি তো একা। নিজে একা একা থাকি। সন্ধ্যার পরই বাড়ি থেকে বেরোই। সারা রাত ঘুরে বেড়াই।’
‘কী বলছ তুমি? হিজলবনের ধারে একা বাড়িতে থাকো? সারা রাত একা একা ঘুরে বেড়াও? তোমার ভয় করে না?’
কুসুম আগের মতো হাসল। ‘ওই দ্যাখো মুমু কী বলে? ভয় করবে কেন? আমাদের তো ডরভয় বলে কিছু নেই।’
‘তোমাদের মানে? মানুষের কি ডরভয় থাকবে না? তা-ও তুমি আমার বয়সী একটা মেয়ে।’
‘আমরা তো মানুষ...। এই যা, কী বলতে কী বলে ফেলছি!’
মুমু অবাক হয়ে কুসুমের দিকে তাকিয়ে আছে। খুবই এলোমেলো কথা বলছে মেয়েটি। কথার আগামাথা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে মেয়েটিকে খারাপ লাগছে না মুমুর। গায়ের রং ঝিম কালো। রোগা শরীর। চোখ দুটো ডাগর। চেহারা খুব মিষ্টি। দাঁতগুলো এত সুন্দর, হাসলে দেখতে আরো সুন্দর লাগে।
মুমু বলল, ‘কিছুক্ষণ আগেই তো তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো। তুমি তোমার নাম বলেছ। আমি তো আমার নাম বলিনি! তুমি তাহলে আমার নাম জানলে কী করে?’
‘আমি তো রোজ রাতেই এই বাড়িতে ঘুরতে আসি। বাড়ির লোকজনের কথা শুনতে পাই। কাল রাতে তোমার মা তোমাকে মুমু মুমু বলে ডাকছিলেন। ও মুমু, মুমু, খেতে আয় মা। আমি শুনেছি তো। তোমার বাবাও একবার ডেকেছেন।’
‘রাতের বেলা এই বাড়ির কেউ তোমাকে দেখতে পায় না?’
‘নয়নের মা মাঝে মাঝে দেখতে পায়। তবে সে ভয় পায় না। দু-এক দিন দুর হ, দুর হ বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। সে কাল রাতে ইলিশ মাছ ভাজছিল। এই জন্য এসেছিলাম। ইলিশ মাছ ভাজা আমাদের খুব পছন্দ। কোন বাড়িতে সন্ধ্যার পর ভাজা হচ্ছে, বহুদূর থেকে সেই গন্ধটা আমরা পাই। পেলেই ভাজা মাছ খেতে ছুটে যাই। তবে নয়নের মা বড় চালাক। তার কাছ থেকে কিছুতেই ইলিশ ভাজা চুরি করা যায় না। অন্য অনেক বাড়ি থেকে চুরি করে খেয়েছি।’
তার বয়সী একটি মেয়ে চুরি করে ভাজা ইলিশ মাছ খায়, শুনে খুব মজা লাগল মুমুর। বলল, ‘কেমন করে চুরি করো?’
কুসুম হি হি করে হাসল। ‘খুব সহজ কায়দা আছে। গ্রামের রান্নাঘরগুলোর বেশির ভাগেরই বেড়া থাকে না। শুধু মাথার ওপর একটা চালা। বাড়ির বউরা এক-দুই টুকরা করে ইলিশ মাছ ভাজে। ভেজে থালা-বাসনে রাখে। আমরা তো অন্ধকারে গা মিশিয়ে থাকি। সেখান থেকে হাতটা পরিমাণমতো লম্বা করে ভাজা মাছ এনে কচরমচর করে খাই।’
মুমু অবাক। ‘হাত কিভাবে লম্বা করো?’
‘আমরা পারি। দেখবে?’
‘দেখাও তো?’
সঙ্গে সঙ্গে কুসুম তার ডান হাতটা বাঁশের কঞ্চির মতো সরু ও লম্বা করে ফেলল। চোখের পলকেই অমন করল, তার পরই আগের মতো। মুমু অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখল ঠিকই, বুঝতে পারল না কাণ্ডটা কী হলো! ফ্যালফ্যাল করে কুসুমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কুসুম বলল, ‘ইলিশ মাছ চুরি করতে গিয়ে আমার ঠাকুরমার ঠাকুরমা, তার ঠাকুরমার ঠাকুরমা, তার ঠাকুরমার ঠাকুরমা মারা পড়েছিল। এক গৃহস্থবাড়িতে ইলিশ মাছ ভাজা চুরি করতে গেছে, বউটা দেখে সে মাছের টুকরা ভেজে রাখছে আর তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। বউটা বুঝে গেল কাণ্ডটা কে করছে। মাছ ভাজার খুন্তিটা সে আগুনে পুড়িয়ে লাল করে ফেলল। তক্কে তক্কে রইল লিকলিকে হাতটা কখন এসে মাছের টুকরা নিয়ে যায়। যখন হাতটা আবার এলো, তখন সে খুন্তির ছেঁকা দিয়ে দিল। ছেঁকা খেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল সেই ঠাকুরমা। পরদিন সকালে দেখা গেল, রান্নাঘরের পেছনে একটা দাঁড়কাক মরে পড়ে আছে। আমাদের বড় শত্রু হচ্ছে আগুন। আগুনের ছেঁকায় আমরা মরে দাঁড়কাক হয়ে যাই।’
মুমু কিছু বলতে যাবে, তার আগেই মুমুকে ডাকতে ডাকতে এদিকটায় হেঁটে এলো নয়নের মা। তাকে দেখেই ব্যস্ত হয়ে গেল কুসুম। ‘ওই যে নয়নের মা আসছে। আমি পালাই।’
চোখের পলকে ঝোপঝাড়ের ভেতর উধাও হয়ে গেল কুসুম। মুমু অবাক হয়ে সেদিকটায় তাকিয়ে রইল। নয়নের মা এসে তার হাত ধরল। ‘তুমি একা একা এখানে কী করছ?’
মুমু বলল, ‘আমি তো একা ছিলাম না। কুসুমও ছিল! ওর সঙ্গে গল্প করছিলাম।’
‘কুসুম মানে? কোন কুসুম?’
‘ওই যে খালপারের হিজলবনের ধারে যাদের বাড়ি।’
‘বুঝেছি। কুসমি তাহলে আজ দিনের বেলাই এই বাড়িতে এসেছিল? ও মাঝে মাঝে রাতের বেলা আসে। দেখা হলেই আমি তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিই। পেতনি হলেও কুসমি খুব ভালো মেয়ে। কাউকে ভয় দেখায় না।’
নয়নের মায়ের কথা শুনে মুমু অবাক। যাহ! এতক্ষণ তাহলে সে একটা পেতনির সঙ্গে গল্প করল? কুসমি তো কথায় কথায় তাকে বুঝিয়েছিল, সে পেতনি। মুমু বুঝতে পারেনি কেন? না বুঝে অবশ্য ভালোই হয়েছে। বুঝলে ভয় লাগত। কুসমির সঙ্গে গল্প করা হতো না।