খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যুক্তরাজ্য থেকে ৪০০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তেহরানে এসেছেন মাজিয়া নামে এক ইরানি নারী। তিনি জানান, শুধুমাত্র এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্যই তিনি দেশে ফিরেছেন।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় যাওয়ার পথে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বকে জানাতে এসেছি যে ৪ হাজার বছরের পুরোনো একটি সভ্যতাকে কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। যে এটি ধ্বংস করতে চায়, সে আসলে নিজের দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ তার এই মন্তব্যকে অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’। তবে মাজিয়ার মতে, যুদ্ধের প্রভাব হয়েছে ঠিক উল্টো। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ ইরানকে আরো শক্তিশালী করেছে। এটি দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।’ মাজিয়া আরো দাবি করেন, বিদেশি চাপ ইরানিদের জাতীয় ঐক্য ও সংকল্পকে দৃঢ় করেছে। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপমূলক নীতিরও সমালোচনা করেন।
তার ভাষায়, ‘যারা অন্য দেশের সম্পদ কেড়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।’ এ সময় তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ করেন। গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রবেশের আগে তিনি পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘সিরিয়া, ইরাক বা আফগানিস্তানে যে ধরনের গণতন্ত্র দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।’
মাজিয়া বলেন, মিনাবের ট্র্যাজেডির স্মৃতি এখনও তাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এই শোকাবহ ঘটনা ভুলে যাইনি। একদিনের জন্যও না।’ তিনি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে তাদের সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানান। তার দাবি, নিরীহ শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এসব যুদ্ধ মূলত মার্কিন করদাতাদের অর্থ দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে ইরানের পতাকা হাতে শোকাহত মানুষের ঢল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে অব্যাহত রয়েছে, যেখানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মরদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছে।প্রয়াত নেতার শাহাদাত স্মরণে শিয়া সম্প্রদায়ের শোকগীতি রাজধানীজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ ধৈর্য ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
তেহরানের প্রধান সড়কগুলো জাতীয় পতাকা, কালো শোকের ব্যানার ও ধর্মীয় প্রতীকে সজ্জিত। শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ে অবস্থান নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকেরা ক্রমেই বাড়তে থাকা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও পথনির্দেশনায় কাজ করছেন। আয়োজকদের ধারণা, শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁকে বিদায় জানাতে তেহরানজুড়ে শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীজুড়ে শোক, ধর্মীয় আবেগ ও রাজনৈতিক প্রতীকের ছাপ স্পষ্ট। তবে এরই মধ্যে আরেকটি দৃশ্যও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিনাবের একটি মেয়েদের স্কুলে কথিত মার্কিন হামলায় নিহত ১৫০ জনেরও বেশি শিশুর ছবি সংবলিত পোস্টার টাঙানো হয়েছে। শোকবার্তার পাশে রাখা এসব ছবি মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সাম্প্রতিক যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা।
ইরান যখন সাম্প্রতিক দশকগুলোর সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতার দাফন সম্পন্ন করছে, তখনও যুদ্ধের ক্ষত দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। নিহত শিশুদের ছবি সেই বেদনাদায়ক স্মৃতিকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। তেহরান থেকে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্যের শোভাযাত্রা সোমবার কুম শহরে যাবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায়। সবশেষে ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে তাকে দাফন করা হবে।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সারাদিন ধরে খামেনির জানাজা ও শোকানুষ্ঠান চলছে। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর একটি হলো খামেনির কনিষ্ঠ নাতি-নাতনির ছবি, যা তার কফিনের পাশে রাখা হয়েছে। ছবিটি দেখে অনেক শোকাহত মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
এদিকে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় মানুষের ঢল অব্যাহত রয়েছে। পুরো তেহরানজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষত এখনও মানুষের মনে তাজা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির নেতৃত্ব অন্তত সাময়িকভাবে জনগণের বড় একটি অংশকে নিজেদের পাশে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।





