নিহত সাবেক ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা জনসমক্ষে উপস্থিত হন। দাফন অনুষ্ঠানে শোকের পাশাপাশি প্রতিশোধের আহ্বানও জোরালোভাবে উঠে আসে।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় টানানো পোস্টার, গ্রাফিতি এবং জনতার স্লোগানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কিছু বক্তা ও অংশগ্রহণকারী খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ শ্লোগান দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে চার মাসের বেশি সময় বিলম্বের পর ইরান খামেনি এবং তার পরিবারের আরো চার সদস্যের জন্য এক সপ্তাহব্যাপী দাফন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তারা ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাতের প্রথম দিন নিহত হন।
জানাজার নামাজে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। অনেকে সারারাত মসজিদে অবস্থান করেন, আবার অনেকেই ভোরের আগে এসে উপস্থিত হন যাতে সকাল ৮টার নামাজে অংশ নিতে পারেন। ইরানের জাতীয় পতাকা ও প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত লাল পতাকা হাতে অনেক মানুষ খামেনির ছবি বহন করেন। এ সময় ভিড়ের মধ্যে ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের ধ্বংস হোক’ স্লোগানও শোনা যায়।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে কিছু পোস্টার, গ্রাফিতি ও জনতার স্লোগানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে কবি মোহাম্মদ রসৌলি লাউডস্পিকারে বক্তব্য দেন। তিনি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানালে উপস্থিত জনতার একটি অংশ উল্লাস প্রকাশ করে।
২৯ বছর বয়সী মুদি দোকানের কর্মী গোলামরেজা সাবুনি বলেন, ‘আমি এখানে প্রতিবাদ জানাতে এবং প্রতিশোধের দাবি তুলতে এসেছি। তারা আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘ওরা আমাদের ইমামকে হত্যা করেছে। আমাদেরও ওদের নেতা ট্রাম্পকে হত্যা করা উচিত।’
পরে আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় লেখেন, ‘মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না। আপনারা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছেন, কিন্তু তার চিন্তা ও আদর্শ আরো ছড়িয়ে পড়েছে।’
তিনি দাবি করেন, খামেনির মৃত্যু তার অনুসারীদের বিশ্বাস ও আদর্শকে দুর্বল করতে পারেনি। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর বলেন, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া মানুষ দুটি মূল বার্তা দিচ্ছেন—শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ইরানের নিহত নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া।
আলি খামেনির জানাজাকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ইসরায়েলি হুমকির মধ্যেই রবিবার ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা জনসমক্ষে উপস্থিত হন। এ সময় নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ভাই মাসুদ, মেইসাম ও মোস্তফাকে দেখা যায়। এ ছাড়া বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল আহমদ ভাহিদির ছবিও প্রকাশিত হয়। যুদ্ধের পর এই প্রথম তাদের জনসমক্ষে দেখা গেল।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এবং কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি। পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ ও চলমান উত্তেজনার মধ্যে তাদের এই উপস্থিতি দেশের ঐক্য, প্রতিরোধের মনোভাব এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর আস্থার বার্তা দিয়েছে। তবে অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি মোজতবা খামেনিকে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবাকে লক্ষ্য করে চালানো বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। সে সময় মোজতবা খামেনিকেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
৯৭ বছর বয়সী শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আলী খামেনি, তার পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানিসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যের জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর একটি ছিল ছোট্ট নাতনির কফিন, যা অন্য কফিনগুলোর তুলনায় অনেক ছোট ছিল।
খামেনির মরদেহ ইরান ও প্রতিবেশী ইরাকের বিভিন্ন শহরে নেওয়া হবে। সোমবার তেহরানের রাস্তায় তার কফিনসহ অন্যান্য কফিন নিয়ে শোকযাত্রা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উপলক্ষে অনেক সড়ক ও জনসাধারণের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে তাকে দাফনের মাধ্যমে শোকযাত্রা শেষ হবে।
শনিবার ও রবিবারের অনুষ্ঠানে কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে ইরানের বিভিন্ন শহরেও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দাফন অনুষ্ঠান ছিল জাতীয় ঐক্যের একটি প্রদর্শন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরান আংশিক নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন-সংক্রান্ত আঞ্চলিক ইস্যুতেও দুই পক্ষের মতপার্থক্য রয়েছে।
রবিবার মার্কিন নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানায়, গত ৭২ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৭০টি জাহাজ চলাচলে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে শনিবারেই ১৮টি জাহাজ চলাচল করেছে।
সংস্থাটি আরো জানায়, ওমান ও ইরানের কাছাকাছি নৌপথে চলাচল স্থিতিশীল থাকলেও তা এখনও যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় কম। পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে এবং মাইন অপসারণ ও জরিপ কার্যক্রম অব্যাহত আছে।





