বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিশ্বকে বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। এত দিন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম ছিল ভবনের ছাদে স্থাপিত প্রচলিত সোলার প্যানেল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কম্পানি স্বচ্ছ সোলার গ্লাস বা ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো প্রযুক্তি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই প্রযুক্তিতে ভবন, অফিস, শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর, এমনকি ব্যক্তিগত বাড়ির কাচের জানালাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস পরিণত হতে পারে। বিশেষ ধরনের স্বচ্ছ ফটোভোল্টাইক আবরণ কাচের ওপর প্রয়োগ করা হয়, যা সূর্যের অতিবেগুনি (ইউভি) ও অবলোহিত (ইনফ্রারেড) রশ্মি শোষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং বরাবরের মতো দৃশ্যমান সূর্যের আলোকে ওই কাচের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে দেয়। ফলে ঘরের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশে কোনো উল্লেখযোগ্য বাধা সৃষ্টি হয় না। প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় এই প্রযুক্তি স্থাপনে আলাদা জায়গার প্রয়োজন হয় না, নান্দনিকতাও বজায় থাকে। ফলে ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি নির্মাণে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উল্লেখ্য, সূর্যালোক মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত—দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি রশ্মি এবং অবলোহিত রশ্মি। আমাদের চোখ শুধু দৃশ্যমান আলো দেখতে পায়। কিন্তু সোলার উইন্ডো অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মিকে শোষণ করতে পারে। ফলে কাচটি দেখতে পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়। প্রচলিত সোলার প্যানেলের মতো এটি ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, বরং সৌন্দর্য বাড়ায়।
স্বচ্ছ সোলার গ্লাসের কার্যপদ্ধতি প্রচলিত সৌর প্যানেলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হলেও মূলনীতি একই। সাধারণ সোলার প্যানেলে দৃশ্যমান সূর্যালোক সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোতে এমন বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের চোখে দৃশ্যমান আলোর বেশির ভাগ অংশ কাচের মধ্য দিয়ে যেতে দেয় এবং একই সঙ্গে অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জানালার চারপাশে স্থাপিত সূক্ষ্ম পরিবাহী স্তরের মাধ্যমে ভবনের বিদ্যুত্ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা বা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও সরবরাহ করা সম্ভব। ভবনের বাইরের দেয়াল বা কাচের সম্মুখভাগ যদি পুরোপুরি এই প্রযুক্তিতে তৈরি হয়, তাহলে একটি বহুতল ভবন প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। একই সঙ্গে এই কাচ সূর্যের অতিরিক্ত তাপ প্রবেশ কমিয়ে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। ফলে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। বর্তমানে গবেষকরা এই প্রযুক্তির দক্ষতা বা রূপান্তর হার আরো বাড়ানোর জন্য নতুন উপাদান, বিশেষ করে পেরোভস্কাইট এবং উন্নত স্বচ্ছ ফটোভোল্টাইক উপকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, অর্থনৈতিক এবং ব্যবহারবান্ধব। প্রচলিত সোলার প্যানেল বসানোর জন্য আলাদা ছাদ বা খোলা জায়গা দরকার হয়, কিন্তু স্বচ্ছ সোলার গ্লাসে সেই সমস্যা নেই। উপরন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা শব্দদূষণ সৃষ্টি হয় না। ফলে পরিবেশ রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং শহরাঞ্চলে বহুতল কাচের ভবনের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো প্রযুক্তিতে শহরের আধুনিক ভবন, শিল্প-কারখানা, শপিং মল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি ভবন নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবে। একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গাড়ি, বাস, ট্রেন, জাহাজ এবং বিমানেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে যানবাহনের জানালা থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে ব্যাটারি চার্জ করা, আলো, এয়ারকন্ডিশনিং, সেন্সর ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র পরিচালনা করা যাবে। একইভাবে ট্রেন বা মেট্রো রেলের জানালায়, এমনকি বর্তমানে সারা বাংলাদেশে সয়লাব ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের ওপর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ আলো, তথ্য প্রদর্শন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরিচালনার জন্য সহায়ক বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। কৃষি খাতেও গ্রিনহাউসের কাচে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই সঙ্গে ফসল উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। ফলে জমির দ্বৈত ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রযুক্তি বিশেষ সম্ভাবনাময়। কারণ প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশে বছরে দীর্ঘ সময় সূর্যালোক পাওয়া যায়, যা এই প্রযুক্তির জন্য একটি বড় সুবিধা। বাস্তবায়ন করতে পারলে এটি শুধু একটি জানালা নয়, বরং একটি ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমবে।
প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন এবং এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পথে রয়েছে। তবু জ্বালানিব্যবস্থায় এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বাংলাদেশ যদি সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অসংখ্য ভবন ও যানবাহন নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারবে। তবে এসব সাফল্য পেতে হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। যেমন—বর্তমানে প্রযুক্তিটির উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং দক্ষতা প্রচলিত উচ্চ ক্ষমতার সোলার প্যানেলের তুলনায় এখনো কম। এ ছাড়া দেশে এই প্রযুক্তি উৎপাদনের শিল্প, দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষণাগার এবং মানসম্মত স্থাপনা ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে গবেষণা ও বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে দেশেই স্বচ্ছ সোলার গ্লাস উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। নতুন নির্মিত সরকারি ও বেসরকারি ভবনে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে করছাড়, সহজ ঋণ ও প্রণোদনা দিলে এর প্রসার আরো দ্রুত ঘটবে। পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিষয়ে গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
অবশ্য প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোর খরচ প্রায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। এতে ‘অর্গানিক সেমিকন্ডাক্টর’ বা ‘পেরোভস্কাইট’ প্রযুক্তির মতো উন্নত উপাদান ব্যবহার করায় খরচ বেশি হয়। এ ছাড়া স্বচ্ছ হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও প্রচলিত প্যানেলের তুলনায় বেশ কম। আবার প্রচলিত প্যানেলের কর্মদক্ষতা যেখানে ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, সেখানে ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোর কর্মদক্ষতা মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হয়। তবু ভবনের কাচ বা জানালাগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করার জন্য প্রযুক্তিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এর উৎপাদন খরচ ও দাম কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুরক্ষায় বৈষম্য অঞ্চলটির জনতাকে ক্রমেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসিয়ে তুলেছে। এই অঞ্চলটির সবচেয়ে কৌশলগত ‘খাইবার গিরিপথ’ ভারতীয় উপমহাদেশ এবং মধ্য এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ ও সরু একটি পথ, যা অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দেশটির জন্য অনেক সম্ভাবনাময় হতে পারত, অথচ এটি এখন আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান অবনতিশীল সম্পর্কের কারণে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) জন্য বরাবরের একটি সহজ যাতায়াতের পথ হিসেবে খাইবারপাখতুনখোয়াসহ বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে বাড়তি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রসদ হিসেবে নিজেদের ব্যবহার করতে দিচ্ছে। 