ঐতিহ্য পরম্পরায় জামদানি বা মসলিন যেমন বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য, বাটিক যেমন ইন্দোনেশিয়ার কিংবা শাল কাশ্মীরের—তেমনি পৃথিবীর সব দেশেরই নিজস্ব ঐতিহ্যসংবলিত এমন কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো ওই দেশ বা অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু মুনাফার একচেটিয়াত্বের লোভে পুঁজির মালিকরা যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন, তখন আর তাঁদের ওইসব ঐতিহ্যের দিকে তাকাবার ফুরসত থাকে না। মুনাফার লোভে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সব ন্যায্যতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তাঁরা তখন সম্মুখবর্তী সব কিছুকেই নিজেদের মালিকানায় নিয়ে নিতে চান। আর তেমন অবস্থায়ই সম বা কাছাকাছি ঐতিহ্যের দেশগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝেই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিপেনডেন্স—জিআই) এসব পণ্যের মালিকানা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যায়, যেমনটি জামদানি নিয়ে ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হওয়া সত্ত্বেও ভারত তখন এটিকে নিজেদের পণ্য বলে দাবি করে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে এর আইনি মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউআইপিও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র, তথ্য ও বিষয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত এটিকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবেই স্বীকৃতি প্রদান করে।
এ ধরনের বিরোধ ও বিবাদের মোকাবেলা বাংলাদেশকে পরবর্তীতে আরো একাধিকবার করতে হয়েছে। তবে এর জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীদের লোভ যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অজ্ঞতা, অনুদ্যোগ ও অদক্ষতা। দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব পণ্যের জিআই স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে বিরোধ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিষয়টি ঘটেছে আগে থেকে এসব পণ্যকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা না করার কারণে। লক্ষ করা গেছে যে ভারত যখনই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো পণ্যকে তাদের জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখনই বাংলাদেশের হুঁশ হয়েছে যে এ কাজটি আরো আগেই করা উচিত ছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধারার অদক্ষতার সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আরো একবার ডব্লিউআইপিও পর্যন্ত যাওয়া। ২০১৫ সালে জামদানির জিআই স্বত্বের মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে যে পরিমাণ দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছিল, সেটি মনে রেখে বাংলাদেশ যদি পরবর্তী সময়ের কাজগুলো যথাসময়ে করে ফেলত, তাহলে আর ২০২৪ সালে এসে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে পুনরায় বিবাদে লিপ্ত হতে হতো না।
২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগটিও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারত যে সে সময় তাদের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে বসল, সেটি বাংলাদেশের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিআইটি) জানতই না। এ তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা যখন বিষয়টির প্রতি ডিপিআইটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখনই প্রথম বোঝা যায় যে এ বিষয়ে কোনো খোঁজখবরই তারা রাখেন না। যাহোক, এরপর মাত্র এক বছরের মধ্যে ডিপিআইটি আরো ৩৩টি পণ্যকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যেগুলোর মধ্যকার অন্তত ১০টিই উক্ত দপ্তরে এক থেকে সাত বছর যাবৎ অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু জনমতের চাপজনিত উত্তেজনা থিতিয়ে যেতেই আবার সেই পুরনো স্থবিরতা ভর করে বসেছে। ২০২৪ সালে আবেদনকৃত মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে ৬৪তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের পর আর এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি আছে বলে জানা যায়নি। এ বিষয়ে ডিপিআইটি হয়তো বলবে যে তাদের কাছে এসংক্রান্ত আর কোনো আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে নেই; অতএব তারা অভিযোগমুক্ত।
তথ্যগতভাবে ডিপিআইটির উপরোক্ত সম্ভাব্য বক্তব্যের মধ্যে হয়তো কোনোই ভুল নেই, যেমন ভুল থাকে না পুলিশের বক্তব্যের মধ্যেও। কোনো অপরাধ বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় এ ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন, তখন তাদের অকপট জবাব হচ্ছে, ‘এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি’। জিআই পণ্যের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ডিপিআইটিও কি সেই একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে যে তাদের কাছে কেউ আবেদন না করা পর্যন্ত এ ব্যাপারে তাদের কোনো দায় নেই? তারা কি এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জিআই সনদ সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের আরো উৎসাহিত করতে পারেন না? কেউ তাদের কাছে সাহায্য না চাওয়ায় এ বিষয়ে তাদের কোনো দায় নেই বা তারা স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে উদ্যোক্তার কাছে এগিয়ে যাবেন না—এটি তো অগ্রসর চিন্তাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রসেবকের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না।
দেশে এখন স্বীকৃত জিআই পণ্যের সংখ্যা ৬৪টি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্প ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পশ্চাৎ সারির দেশ হলেও এর দীর্ঘ ও বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী পটভূমি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ডিপিআইটি ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিদান বা স্বীকৃতির জন্য সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে নতুন কোনো ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও সৃজনশীল সেবামূলক কর্মকাণ্ড খুঁজে পাচ্ছেন না কেন? এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বহুধাবিস্তৃত ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে আরো বহুসংখ্যক নতুন জিআই পণ্য খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে নিম্নে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো।
এক. শিল্পনীতিতে উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) শিল্পের পাশাপাশি সেবা কার্যক্রমকেও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে (যদিও এটি একটি অনেক বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত)। অন্যদিকে রুগ্ণ শিল্প চালুকরণ ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, সেখানেও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমকে সহায়তাদানের কথা বলা হয়েছে। আর সরকারের এরূপ নীতি ও সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে এখন অতি সহজেই জিআই পণ্য/সেবা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা যেতে পারে।
দুই. জিআই পণ্যের বর্তমান তালিকায় ইলিশ বা চিংড়ির মতো মাছের নাম থাকলেও এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যোগ করা প্রয়োজন রূপচাঁদা, লইট্টা, কোরাল, টুনা ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছের নাম, যেগুলোর জিআই স্বত্ব নিয়ে যেকোনো সময় মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া চলনবিলের শিং, কই, শোল, টাকি; বেলাই বিলের আইড়, মাগুর, বাইন, গুতুম, পাবদা, টেংরা; সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের সরপুঁটি, মহাশোল, পাঙ্গাশ, কাচকি, রিটা, ঘাউরা, বাচা ইত্যাদি মিঠাপানির মাছের নাম যুক্ত করা যেতে পারে। অধিকন্তু কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি ও কক্সবাজারের শুঁটকির নামও এ ক্ষেত্রে অনায়াসে আসতে পারে।
তিন. বাংলাদেশে রান্নাবান্না ও খাদ্যের কিছু নিজস্ব ধরন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের পিঠা-পায়েসের সুনাম উপমহাদেশজুড়েই বিস্তৃত। এর বাইরে এ দেশের কাচ্চি বিরিয়ানির নামদাম এখন ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের পাপর কিংবা যশোরের নলেন গুড়ের সন্দেশসহ আরো অনেক খাদ্যপণ্যের নামই এখন পর্যন্ত জিআই পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ওইসব পিঠা-পায়েস, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, হালিম, পাপর, সন্দেশ ইত্যাদি খাদ্যপণ্যকে জিআই সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
চার. ডিপিআইটির ৬৪টি জিআই পণ্যের তালিকায় কোনো কোনো আম বিশেষত আশ্বিনার মতো কম স্বাদের আম থাকলেও আম্রপালি, গোপালভোগ ইত্যাদির নাম নেই। ফলে এ আমগুলোর নাম উক্ত তালিকায় অবশ্যই যোগ করা প্রয়োজন। তদুপরি শেরপুরের বেগুন, শ্রীমঙ্গলের চা ও আনারস, নরসিংদীর সাগর কলা, ভোলা ও পটুয়াখালীর তরমুজ, কাপাসিয়ার বেল ইত্যাদি কৃষিপণ্যকেও সেখানে যুক্ত করা যেতে পারে।
পাঁচ. বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকায় ধামরাইয়ের তামা-কাঁসার তৈজসপত্র, সিলেটের বেতের আসবাব, কক্সবাজারের ঝিনুকজাত হস্তশিল্প, জলিরপারের কৃত্রিম গহনা, ভৈরবের পাদুকা, রায়েরবাজারের তৈজসপত্র ইত্যাদি যুক্ত করাটা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়—জরুরিও বটে। কারণ এসব পণ্যের বেশির ভাগই এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং জিআই পণ্যের তালিকায় এসব নাম যুক্ত হলে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনা আরো বহুলাংশে বেড়ে যাবে।
ছয়. বাংলাদেশের জিআই পণ্য তালিকার একেবারে প্রথমেই জামদানির নাম থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর মারমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক থামি ইত্যাদির নাম এখনো যুক্ত হয়নি। জিআই পণ্যের তালিকায় এসবের সংযুক্তি এগুলোর গুরুত্বই শুধু বাড়াবে না, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকার একটি ইতিবাচক বার্তাও দেশে-বিদেশে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে তাই বলব, বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকা আরো ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারিত করার যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ ও তৎপরতায় এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অথচ সে সম্ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এসবের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক ঐতিহ্যই শুধু রক্ষা পাবে না, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাও আরো বেগবান হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে এসব পণ্য ও সেবা জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনাও বহুলাংশে বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে নিবেদিতপ্রাণ সেবার মানসিকতা নিয়ে ও পেশাদারিপূর্ণ দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে সহসাই এ ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যযোগ্য বড় অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়; অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি



পুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই স্মরণে রাখতে হবে, মানুষের জীবনে সমস্যা আসে এবং সমস্যা আসবেই। আর এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে জীবনে সমস্যা এলে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে কোনো ধরনের সমস্যা এলে পুলিশ সদস্যসহ সবাইকে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোনো কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেওয়া হয়, তেমনি একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। শুধু পুলিশ সদস্যই নয়, বরং যেকোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ সাধারণভাবে নিহিত থাকে, তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনঃকষ্ট, বাইপোলার ডিস-অর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিস-অর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিস-অর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহার জনিত ডিস-অর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। ডব্লিউএইচওর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১.৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আট লাখ। হিসাব মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের ঘাটতি বা বিচ্ছেদ ঘটা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তি সংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার সংবাদ, কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা ইত্যাদি। এসব চিন্তা-ভাবনার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। তখন থেকেই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতা কিংবা কোনো কিছু কারো কাছ থেকে চেয়ে না পাওয়ার বিষয়টিও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। 
এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করা দরকার। শিশুরা এমন ভাষা শিখল কোথা থেকে? শিশু জন্মের সময় কোনো রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। সে জানে না কাকে অপমান করতে হয়, কাকে বিদ্রুপ করতে হয় কিংবা কিভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করতে হয়। এসব সে শেখে পরিবার থেকে, আশপাশের সমাজ থেকে, টেলিভিশনের পর্দা থেকে, ফেসবুকের ভিডিও থেকে, ইউটিউবের শর্টস থেকে এবং সর্বোপরি বড়দের কাছ থেকে। অর্থাৎ শিশুর মুখে যে ভাষা আমরা শুনি, সেটি আসলে আমাদেরই ভাষা। 