ভোর ৫টা। অ্যালার্মে নয়, কলের শব্দে ঘুম ভাঙে ঢাকার অনেক পরিবারে। কারণ কখন পানি আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই পানি এলেই বালতি, ড্রাম, বোতল, যা আছে সব ভরে রাখতে হয়। কোনো কোনো বাসায় রাত ২টায় মোটর চালু করা হয়। কারণ ওই সময়ই নাকি একটু বেশি চাপ পাওয়া যায়। যে শহরে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে, সেই শহরের হাজারো মানুষ আজও পানির অপেক্ষায় দিন শুরু করে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া আর মৌলিক নাগরিক অধিকার নয়, বরং ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শহর আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা উঁচু ভবনের গর্ব করে, সেই শহরের বহু মানুষ প্রতিদিন পানির জন্য সংগ্রাম করে। উন্নয়নের এই বৈপরীত্য আমাদের নগর পরিকল্পনার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।
ঢাকার পানিসংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শিতার ফল। রাজধানীর জনসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সেভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। একদিকে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে, অন্যদিকে একই পুরনো পাইপলাইন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে লাখো মানুষকে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের পরিস্থিতি এই সংকটকে আরো স্পষ্ট করেছে। মেট্রো রেল চালুর পর এলাকাটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। নতুন বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা। কিন্তু পানির উৎপাদন ও সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে উন্নত যোগাযোগের সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে মানুষ পড়েছে আরেক মৌলিক সংকটে।
এই ঘটনাটি শুধু মিরপুরের নয়, এটি পুরো ঢাকার উন্নয়ন দর্শনের এক প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রায়ই অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়নের সমার্থক মনে করি। কিন্তু একটি শহর শুধু রাস্তা, সেতু বা রেলপথ দিয়ে টিকে থাকে না। একটি শহর টিকে থাকে পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর। এই মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে চকচকে উন্নয়নও খুব দ্রুত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বেশির ভাগ মহানগর এখন পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট হবে নিরাপদ পানির সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের কারণে এই চাপ আরো বাড়বে।
ঢাকার ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ আরো গভীর। রাজধানীর পানির বড় অংশ এখনো ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। যে পানি হাজার বছর ধরে মাটির নিচে জমা হয়েছে, তা আমরা কয়েক দশকেই শেষ করে ফেলছি। প্রকৃতি যে গতিতে সেই ভাণ্ডার পূরণ করতে পারে, আমরা তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুত তা খালি করছি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলাধার ধ্বংসের প্রবণতা। একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল, বিল ও জলাভূমি ছিল। এগুলো শুধু বৃষ্টির পানি ধারণ করত না, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। আজ সেই জলাধারের বড় অংশই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাছে, মাটির নিচে পৌঁছতে পারছে না।
পানিসংকটের আরেকটি দিক খুব কম আলোচিত হয়। সেটি হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা গভীর নলকূপ বসায়, জারজাত পানি কেনে কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করে। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সামনে সেই সুযোগ থাকে না। ফলে একই শহরে কেউ দিনে ২৪ ঘণ্টা পানি পায়, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এক বালতি পানি সংগ্রহ করতে পারে না। এটি শুধু সেবার বৈষম্য নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
বিশ্বের অনেক শহর এই সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর চারটি উেসর ওপর নির্ভর করে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে—বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহৃত পানি, আমদানি করা পানি এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহার। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে নতুন ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কার্যত বাধ্যতামূলক। জাপানের টোকিওতে পাইপলাইনের পানির অপচয় পৃথিবীর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সংকটের সমাধান প্রযুক্তিতে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সুশাসনেও।
বাংলাদেশের জন্যও এখন নতুন চিন্তার সময় এসেছে। শুধু নতুন পানি শোধনাগার নির্মাণ করলেই হবে না। সমন্বিত নগর জলনীতি প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি নতুন আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের আগে পানি সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বড় ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা আইনগতভাবে নিশ্চিত করা দরকার। পাইপলাইনের লিকেজ কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদীর পানি শোধনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে নগর উন্নয়নের দর্শনেও পরিবর্তন জরুরি। ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানো ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প নগর, পরিকল্পিত উপশহর এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দেশের সব সুযোগ-সুবিধা যদি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে পানি থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিক সেবার সংকট আরো তীব্র হবে।
নাগরিকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা প্রায়ই পানি অপচয় করি, কল খোলা রেখে দিই, লিকেজ মেরামত করি না, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা ভাবি না। অথচ পানি সাশ্রয় এখন শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ঢাকার পানিসংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। উন্নয়ন মানে শুধু দৃশ্যমান স্থাপনা নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা। একটি শহরের সাফল্য মাপা উচিত তার উঁচু ভবনের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষ কত সহজে নিরাপদ পানি, নির্মল বাতাস এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন পাচ্ছে, তা দিয়ে।
আমরা যদি আজও এই সংকটকে সাময়িক সমস্যা ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই, তাহলে ভবিষ্যতের ঢাকা আরো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। তখন হয়তো পানির জন্য সামাজিক সংঘাতও সৃষ্টি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানি হবে সবচেয়ে কৌশলগত সম্পদ। সেই বাস্তবতায় এখনই পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
একটি সভ্য শহর তার নাগরিককে আকাশছোঁয়া ভবনের প্রতিশ্রুতি দেয় না, দেয় নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। সেই নিশ্চয়তার প্রথম শর্তই হলো বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত পানি। ঢাকার উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণ হবে, যখন কোনো নাগরিককে ভোররাতে কলের সামনে দাঁড়িয়ে পানির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় সেখানেই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট




