• ই-পেপার

ড. তুহিন ওয়াদুদ

মায়াবী পর্দায় দুলে ওঠা কবি

  • আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি, কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়

আমার শিক্ষক

বিশ্বজিৎ ঘোষ

আমার শিক্ষক
প্রতিকৃতি তানভীর মালেক

আবুল কাসেম ফজলুল হক

জন্ম : ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০। মৃত্যু : ৫ জুলাই ২০২৬

১৯৭৮ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে বিএ সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমি। ২০১ নম্বর কোর্সের ক্লাস শুরু হবে। আমরা বসে আছি কলা ভবনের ২০১৭ নম্বর কক্ষে। কোর্স শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। নামটা শুনেই আমার শুধু মনে পড়ছিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কথা। সময়মতো স্যার ক্লাসে এলেন। রোল কল করে আমাদের অভিনন্দন জানিয়ে একনাগাড়ে বলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে চলেছি স্যারের বক্তৃতা। কোনো নোট নেই সামনে। স্যার বলে চলেছেন বিরামহীনভাবে। প্রথম ক্লাসেই লক্ষ করলাম, আমাদের কাসেম স্যার সাহিত্য সমালোচনায় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গটা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। সেই যে স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুরু হলো, তারপর প্রায় পাঁচ দশক কেটে গেছে, ক্রমে সেই সম্পর্ক হয়েছে গভীর থেকে গভীরতর।

সাহিত্যের ক্লাসে আমাদের কাসেম স্যার শিক্ষার্থীদের চেতনায় সর্বদা শুভবোধ জাগরণের চেষ্টা করতেন। সে কারণে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকত না তাঁর ক্লাস। সামাজিক নানা অনুষঙ্গকে তিনি অনায়াসে নিয়ে আসতেন সাহিত্যপাঠের মধ্যে। যেহেতু তিনি আমাদের পড়িয়েছেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ, তাই তাঁর সমাজমুখী ভাবনা উপস্থাপন এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। লক্ষ করেছি, আধুনিক গদ্যসাহিত্য আলোচনায় তাঁর সমধিক উৎসাহ রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতি, আর উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম দিকে রাজা রামমোহন রায় ও বার্ট্রান্ড রাসেলের চিন্তা দ্বারা আবুল কাসেম ফজলুল হক গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। ক্লাসে এই দুজনের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। বক্তৃতায় তিনি সাহিত্যের নান্দনিক মূল্যের চেয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বদা বড় করে দেখেছেন। সে জন্য কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, সাহিত্যের অধ্যাপক না হয়ে স্যার যদি দর্শন বা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হতেন, তাহলে তাঁর অবদান আরো ব্যাপক হতে পারত।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সদালাপী সজ্জন মানুষ। শিক্ষকদের মধ্যে ইদানীং দৃষ্ট নানামুখী বিরোধী আচরণ থেকে তিনি ছিলেন সর্বাংশে মুক্ত। কারো উন্নতি বা পদোন্নতির পথে স্যার কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি। গোপনে কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কোনো কাজে তিনি জড়িত, এমন কথা কখনো আমি শুনিনি। সবার মঙ্গলপ্রত্যাশী ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। অন্যের কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তবে নিজের মত প্রকাশে তিনি সব সময় থাকতেন সুদৃঢ় অথচ সুমিত। আড্ডায় বসলে অন্যের কথা শুনতে তিনি উৎসাহী থাকতেন। স্যারের খুব মজার একটা কৌশল ছিল, অন্যের কথা বা মনোভাব শোনার জন্য তিনি জ্ঞাতব্য বিষয়ে একটা প্রশ্ন উত্থাপন করে চুপ করে থাকতেন। অন্যরা কথা বলার পর তুলে ধরতেন তাঁর নিজের কথা।

আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের সঙ্গে আমার নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শিক্ষক-ছাত্র হিসেবে, সহকর্মী হিসেবে সেসব স্মৃতি, তাঁর এই বিদায়-সময়ে খুব মনে পড়ছে। বরিশালে আয়োজিত এক সাহিত্য সম্মেলনে স্যারের সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম আমি। আসা-যাওয়ার পথে স্যারের অনেক কথা শোনার সুযোগ ঘটেছে সে যাত্রায়। এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারির রাতে মোহনা টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গে একত্রে কথা বলেছি আমি। ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ বিষয়ক সেই অনুষ্ঠান শেষে মিরপুর থেকে স্যারের সঙ্গে এক গাড়িতেই এসেছি। স্যারকে পরিবাগে নামিয়ে দিয়ে আমি যাব ধানমণ্ডি। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা। গাড়ি থেকে নামতে নামতে স্যার বললেন—ভালো থেকো, আবার দেখা হবে। না, স্যারের সঙ্গে আর দেখা হলো না। ওটাই স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা, শেষ কথা বলা।

নিজের অভিমত প্রচার এবং অন্যকে উদ্দীপ্ত করার মানসে কাসেম স্যার দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি প্রকাশ করেছেন সুন্দরম নামের ক্ষণজীবী এক সাহিত্যপত্র। তখন তিনি স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। এরপর ১৯৮২ সাল থেকে প্রকাশ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্র লোকায়ত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লোকায়ত পত্রিকা তিনি সচল রেখেছিলেন। লোকায়ত পত্রিকা বলতে গেলে তিনি একক হাতেই পরিচালনা করতেন। লোকায়ত পত্রিকায় প্রধানত চিন্তামূলক লেখা প্রকাশিত হতো, প্রকাশিত হতো সমাজবাদী লেখা। ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের ওপর আমার একটা লেখা মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। সেই লেখা পাঠ করে কাসেম স্যার লোকায়ত পত্রিকার জন্য পূর্ব বাংলায় প্রগতি লেখক আন্দোলন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রবন্ধ লিখতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে স্যারকে সেই লেখা আমি দিতে পারিনি।

 

২.

সাহিত্যের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সবার কাছে একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। নানা বিষয়ে তিনি চিন্তা উদ্রেককারী বক্তব্য দিয়েছেন, লিখেছেন বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ। চিন্তামূলক প্রবন্ধ লিখতেই তিনি ছিলেন সমধিক আগ্রহী। শ্রেয়োবোধ ও কল্যাণচিন্তা, মানুষের মাঝে শুভবোধের উদয়, সামাজিক সমতা—এসবই ছিল আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার প্রধান অনুষঙ্গ। ষাটের দশকে তিনি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রে সংশ্লিষ্ট হন এবং তখন থেকেই মার্ক্সবাদী দর্শনে তাঁর দীক্ষার শুরু। মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তিনি, আর সেই মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল তাঁর সব কর্ম ও সৃষ্টির কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য। সেই ষাটের দশক থেকেই নিরলস লিখে গেছেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, আর তাঁর সেসব লেখার মধ্য দিয়ে তাঁকে সহজেই চিনে নেওয়া যায় সামাজিক কল্যাণাকাঙ্ক্ষী একজন মানবতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ হিসেবে।

১৯৬০-এর দশকের প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্রই আছে আবুল কাসেম ফজলুল হকের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি গোপনে অর্থ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন, আশ্রয় দিতেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে আবুল কাসেম ফজলুল হক শেষ জীবনে সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির তিনি ছিলেন সভাপতি। এই কমিটির সঙ্গে আমিও সংশ্লিষ্ট আছি। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষার জন্য আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে, করেছে সন্দীপিত। সব সময় লক্ষ করতাম, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় স্যার ছিলেন সদা উৎসাহী একজন মানুষ।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, ছিলেন মুক্তমনের উদার এক মানবতাবাদী লেখক। অনেক বই লিখেছেন তিনি, লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ, উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন সেমিনারে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নিবন্ধ। তাঁর প্রথম বই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। এরপর একে একে তিনি প্রকাশ করেছেন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’ (১৯৭৬), ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য’ (১৯৭৯), ‘নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’ (১৯৮১), ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ (১৯৭৩), ‘রাজনীতি ও দর্শন’ (১৯৮৯), ‘বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্য’ (১৯৮৯), ‘সাহিত্যচিন্তা’ (১৯৯৪), ‘স্বদেশচিন্তা’ (১৯৯৮), ‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা’ (২০০২), ‘সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ’ (২০০৩), ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ (১৯৯৭), ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’ (২০০৪), ‘মানুষের স্বরূপ’ (২০০৭), ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’ (২০০৮), ‘শ্রেষ্ঠপ্রবন্ধ’ (২০১১) ইত্যাদি বই। দার্শনিক বান্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হকের অধ্যয়নের অন্যতম বিষয়। রাসেলের দুটি বই তিনি অনুবাদ করেছেন—‘রাজনৈতিক আদর্শ’ (১৯৭২) ও ‘নবযুগের প্রত্যাশায়’ (১৯৮৯)। আবুল কাসেম ফজলুল হক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। এর মধ্যে আছে ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : সাম্য’ (২০০০), ‘এস ওয়াজেদ আলী : ভবিষ্যতের বাঙালী’ (২০০০), ‘আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ (২০০২), ‘স্বদেশচিন্তা’ (১৯৮৪), ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ (১৯৭৮) ইত্যাদি।

 

৩.

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর তাঁর কোনো বিশ্বাস ছিল না; তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের শুভবোধের ওপর। এ কারণে পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপন উগ্রগোষ্ঠীর হাতে শহীদ হওয়ার পর পিতা হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তিনি কোনো বিচার প্রত্যাশা করেননি; বরং বিচার প্রার্থনা করেছেন মানুষের শুভবোধের কাছে। সন্তানহারা একজন পিতার এই প্রার্থনার মধ্যে তাঁর মানসদৃষ্টির প্রাতিস্বিকতা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এ দেশের তরুণসমাজের ওপর তাঁর ছিল গভীর বিশ্বাস। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, তরুণরাই পারবে ঘুণে ধরা এই সমাজব্যবস্থা পাল্টাতে। তাই তিনি শুভবোধ ও কল্যাণচিন্তায় জাগ্রত হতে তরুণসমাজকে পৌনঃপুনিক আহ্বান জানিয়েছেন।

 

 

 

ইমদাদুল হক মিলন

হিজল ফুলের দিন

প্রতিটি বাড়িই তখন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আকাশ ছেয়ে আছে মেঘে। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। একটানা আট দিন দশ দিন শুধুই বৃষ্টি। রোদের মুখ দেখা যায় না। দিনভর ছায়াময়তা। আষাঢ় মাস এসে গেল। হিজল ফুলের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন ফুটবে কদম

হিজল ফুলের দিন
অঙ্কন : তানভীর মালেক

মিয়াদের ছাড়াবাড়ির নামায় জোড়া হিজলগাছ। দুই গাছে দুই রকমের ফুল ফোটে। একটা হালকা গোলাপি, আরেকটা সাদা। দুটি গাছে কি একসঙ্গে ফুল ফুটেছে? গাছের পাতা হুটোপুটি করছে সজল হাওয়ায়। সেই হাওয়ায় ভাসছে হিজল ফুলের মিষ্টি গন্ধ। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিক। আকাশে দাঁড়কাকের মতো উড়ছে টুকরো টুকরো মেঘ। পদ্মার জল ফুলে উঠেছে। গ্রামের এদিক-ওদিক অনেক খাল। বড় খাল থেকে ছোট ছোট খাল ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। নদী উপচানো জল কলকল করে ঢুকছে খালে। রাতারাতি ভরে যাচ্ছে খাল। খাল উপচানো জল ঢুকে যাচ্ছে গ্রামের ডোবা-নালা-পুকুরে। আকাশ ভেঙে নামছে বৃষ্টি। একদিকে নদী খালের জল, অন্যদিকে বৃষ্টির জল। রাতারাতি চক-মাঠের ধান-পাটের জমিতেও উঠে যাচ্ছে জল। বর্ষা এসে গেল।

হিজল ফুলের দিনওই সময়টাকে আমরা বলতাম ‘জোয়ারের দিন’। বর্ষা শুরুর কাল। এখন আর রোদের মুখ দেখা যাবে না। মেঘের ছায়ায় ভরে থাকবে দিনগুলো। মাছদের প্রজননকাল। কত মাছ তখন! খাল-বিল ভরা মাছ। পুকুর-ডোবা ভরা মাছ। জোয়ারের জলের সঙ্গে শুরু হয়েছে মাছদের উচ্ছ্বাস-আনন্দ। পুঁটি মাছের শরীরের দুই পাশে লাল রেখা পড়েছে। আমরা বলতাম, পুঁটি মাছ শাড়ি পরেছে। পেট ভর্তি ডিম একেকটা মাছের। গ্রামের মানুষ মাছ ধরায় মেতে উঠেছে। ধান-পাটের ক্ষেতে গোড়ালি ডুবে যাওয়া জল। আনন্দে মাতোয়ারা মাছ। খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ছেড়ে ধান-পাটের ক্ষেতে উঠে যাচ্ছে কেলি করতে। টেঁটা দিয়ে সেই মাছ মারছে গ্রামের মানুষ। পুকুর উপচানো জল নালা বেয়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। হাজামবাড়ির ছেলে রব আর হাফিজুদ্দি আমার বন্ধু। ওদের সঙ্গে গিয়ে ভেসালের মতো করে ছোট জাল পেতেছি মিয়াদের জোড়া হিজলগাছের তলায়। সেখানে হাত দুয়েক চওড়া একটা নালা। আমিনুল মামাদের পুকুর থেকে এই নালা বেয়ে জলস্রোত নেমে যাচ্ছে মাঠের দিকে। পাঁচ-সাত মিনিট পর পর রব-হাফিজুদ্দির সঙ্গে জাল তুলছি। ছোট ছোট কত মাছ! পুঁটি ট্যাংরা, বেলে পাবদা, খলিশা টাকি, কই শিং, টাটকিনি আর ভেদা মাছ। বাইন মাছের বাচ্চা, রুই, মৃগেল আর কাতল মাছের বাচ্চা আছে। শোল গজার আর বোয়াল মাছের বাচ্চা আছে, ফলি মাছ আছে। মাছের অন্ত নেই। মাছ রাখার বেতের তৈরি পাত্রটিকে বলি ‘ডুলা’। ঘণ্টা কাবার হতে পারে না, ডুলা ভরে যায় মাছে। এক ডুলা নিয়ে যায় রব, এক ডুলা আমি, আরেক ডুলা হাফিজুদ্দি। বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অবস্থা হয়েছে ঝোড়ো কাকের মতো। কে ওসব খেয়াল করে! মাছের নেশায় মাতাল হয়ে আছি।

সন্ধ্যার পর বাড়ির বড়রা আসে এখানটায় মাছ ধরতে। ভয়ে আমরা ছোটরা সন্ধ্যাবেলা ওদিকটায় যাই না। মিয়াদের ছাড়াবাড়ির গাব আর তেঁতুলগাছে, আর জোড়া হিজলগাছ দুটিতে তেনারা বসবাস করেন। মাছের প্রতি বেজায় লোভ তেনাদের। ডুলা উজাড় করে মাছ নিয়ে যান। যারা রাতের বেলা ওখানটায় বসে মাছ ধরে, তাদের ভয় দেখিয়ে বিদায় করেন।

ও রকম এক রাতে নিবিড় হয়ে বৃষ্টি নেমেছিল। বৃষ্টির সঙ্গে ঝরছিল অন্ধকার। আমার বড় ভাই দুই মামার সঙ্গে ওখানটায় জাল পেতে বসেছে। অন্ধকার যতটা গাঢ় হতে পারে হয়েছে। ওদের সঙ্গে হারিকেন আছে। বৃষ্টি আর হাওয়ায় যাতে নিভে না যায় সে জন্য হারিকেনের ওপর কচুপাতার আবরণ দিয়ে রেখেছে। তবু বৃষ্টিভেজা হাওয়ায় পুঁটি মাছের মতো লাফালাফি করে হারিকেনের আলো। একসময় প্রচুর মাছ পড়তে লাগল জালে। ওরা জাল তুলে কুলাতে পারছে না। মাছে ভরে যাচ্ছে ডুলা। দু-তিনটা ডুলা ভরে গেছে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। এ সময় ছাড়াবাড়ির ভেতর থেকে হা হা শব্দে প্রবল ঝড়ের মতো ছুটে এলো কোনো এক শক্তি। হিজলগাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। মামাদের একজন বুঝে গেল কে বা কারা উপস্থিত হয়েছে। ওরা সবকিছু ফেলে চিৎকার করতে করতে বাড়িমুখো দৌড় দিয়েছিল। সকালবেলা গিয়ে দেখা গেল, ডুলা তিনটি শূন্য পড়ে আছে। হারিকেনটির কাচ ভাঙা। জিনিসটা উল্টে পড়ে আছে।

জোয়ারে মাছের সঙ্গে ভূত-প্রেতের আসর থাকে—এ রকম কুসংস্কার ছিল। বড় মাছের মধ্যে ওই সময়টায় বোয়াল মাছগুলো প্রায় পাগল হয়ে যেত। তাদের শারীরিক মিলনের সময়টাকে বিক্রমপুর অঞ্চলে বলা হয় ‘পির ধরা’। এই পির ধরার জন্য বড় বড় বোয়াল মাছ খাল-বিল-পুকুর ছেড়ে ধান-পাটের মাঠে চলে আসত। চক-মাঠের অল্প জলে দু-তিনটা বা চার-পাঁচটা বোয়াল একত্র হয়ে পির ধরত। পিরের বোয়াল জুতি-টেঁটা দিয়ে মারলে মাছ শিকারিদের তেমন লাভ হতো না। জুতি-টেঁটায় একটার বেশি বোয়াল গাঁথা যায় না। সে জন্য পিরের বোয়াল ধরতে হয় পলো দিয়ে চেপে। তাতে দু-তিনটা বোয়াল মাছ আটকানো যায়। পির ধরার সময় মাছগুলো মানুষের পায়ের পাতা ডোবে না এমন খোলা মাঠে চলে আসে। তিন-চারটা-পাঁচটা একত্র হয়ে এক ধরনের ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করে। আর উন্মাদের মতো একটা আরেকটাকে কামড়াতে থাকে। তারপর শরীরে শরীর লাগিয়ে পড়ে থাকে। সঙ্গম শেষের ক্লান্তি। আমি আর আলমগীর মামা সমবয়সী। তখন আমাদের দশ-এগারো বছর বয়স। ও রকম জোয়ার আর বৃষ্টির দিনে ভিজতে ভিজতে দুজন গেছি বাড়ির তিন-চারটা জমির পর যে ছোট্ট একটুখানি মাঠ, সেই মাঠে। মাঠের দূর্বাঘাসগুলো তখনো পুরোপুরি ডুবে যায়নি। একটু একটু মাথা তুলে আছে। আমাদের গোড়ালি ডুবে যাওয়ার মতো জল। দুপুরবেলাই মনে হচ্ছে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চারদিকে আবছায়া। হঠাৎ খুব কাছেই শুনি ঘোৎ ঘোৎ শব্দ হচ্ছে। কয়েক পা এগিয়ে দেখি চারটা অতিকায় বোয়াল ওইটুকু জলের মাঠ তোলপাড় করে ফেলছে। যেন একসঙ্গে জড়াজড়ি করে অদ্ভুত এক খেলায় মেতে আছে। আমাদের হাতের তিন-চার হাত হবে লম্বা। হলুদ রঙের চওড়া পেট আবছায়া আলোর ভেতরও চকচক করছে। দেখে আমরা গেলাম ভয় পেয়ে। ছুটে এসে বাড়িতে বললাম। হাফিজ মামা আর ননী মামা দুটি পলো নিয়ে ছুটে গেল। কিছুক্ষণ পর একেকজনের হাতে দেখা গেল দুটি করে বিশাল আকৃতির বোয়াল মাছ। মাছের ভারে জোয়ানমর্দ মানুষ দুটি একদিকে কাত হয়ে গেছে।

এই বোয়াল মাছের সঙ্গেও আছে কুসংস্কার। রাতের বেলা পিরের বোয়াল ধরতে বিলে গেছে মাছ শিকারি। হাতে পলো আর টর্চলাইট বা হারিকেন। চিকন শক্ত রশি আছে সঙ্গে। বোয়াল ধরে কানকোতে রশি ঢুকিয়ে বাড়ি বয়ে আনবে। বিশাল আকৃতির বোয়ালের দেখা সে পেল। বোয়ালের কপালে সিঁদুরের টিপ। অন্ধকারেও সেই টিপ জ্বলজ্বল করে জ্বলে। এই বোয়াল আসলে বোয়াল না। মাছ শিকারিকে সে বিভ্রান্ত করে ধীরে ধীরে গভীর জলের দিকে নিয়ে যাবে। জলে ডুবিয়ে মারবে। এই ভয়ে অনেক মা একা তাঁর ছেলেকে জোয়ারের দিনে রাতের বেলা মাছ মারতে বেরোতে দিতেন না। স্ত্রী দিতেন না তাঁর স্বামীকে। তার পরও মাছ শিকারিদের ঠেকিয়ে রাখা যেত না। মাছের নেশা বড় নেশা। কেউ ও রকম বোয়ালের পাল্লায় পড়ে বিলের অতলে ডুবে মরেছে বলে শুনিনি। বরং দেখেছি, সারা রাত মাছ ধরে, ছোট-বড় প্রচুর মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়েরা, তাঁদের সদ্য যুবক হয়ে ওঠা ছেলেরা।

এ রকম ছিল আমার ছেলেবেলার বর্ষা শুরুর দিনগুলো। মেঘ-বৃষ্টি আর জলের দিন। মাছ আর মাছের দিন। সাদা আর গোলাপি হিজল ফুলের দিন। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিনগুলো যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে যেত। জোয়ার আর মাছের দিন পাঁচ-সাত দিন দশ দিনের মধ্যেই শেষ। তত দিনে খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় উঁচু হয়ে গেছে জল। চকে-মাঠে হাঁটু ডুবে যায়, কোমর ডুবে যায়। গৃহস্থ লোক গত বর্ষার শেষে পুকুর কিংবা খালে ডুবিয়ে রেখেছে তাদের চলাফেরা আর গৃহস্থালি কাজের নৌকাখানি। সেই নৌকা তুলে গাব আর আলকাতরা মেখে রোদে দিয়েছে। আচমকা একপশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল নৌকা, তার পরই চকচকে তাজা রোদ, নৌকার গাব-আলকাতরা শুকাতে লাগল। তখনকার বিক্রমপুরে বর্ষাদিনে চলাচলের একমাত্র বাহন এই নৌকা। হাটে-মাঠে-ঘাটে যেখানেই যাও, ডিঙ্গি বা কোষা নৌকা লাগবেই! এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতেও নৌকা। প্রতিটি বাড়িই তখন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আকাশ ছেয়ে আছে মেঘে। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। দিন নেই রাত নেই পড়েই যাচ্ছে। একটানা আট দিন দশ দিন শুধুই বৃষ্টি। রোদের মুখ দেখা যায় না। দিনভর ছায়াময়তা। আষাঢ় মাস এসে গেল। হিজল ফুলের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন ফুটবে কদম। কদমের মাদকতাময় গন্ধে ভরে থাকবে দেশগ্রাম।

এইতো ছিল আমার শৈশব-কৈশোরের বর্ষা শুরুর দিনগুলো। বৃষ্টি আর জোয়ারের জলের মনোময় দিনগুলো। সুবাসিত হিজল ফুলের দিনগুলো।

 

 

খোঁপায় নজর

নিলয় রফিক

খোঁপায় নজর

আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির

তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর

ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর

পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর

 

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই

ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

রবিশস্যের দিনে

মুজিব ইরম

রবিশস্যের দিনে

মানুষ গোলাপ গ্রামে যাবে

চা-বাগানে যাবে

যাবে শাপলা বিলে

লালপদ্ম ঝিলে

শিমুল বাগানে

লালা খালে

সাদা পাথরের জলে

রাতারগুলে

জলে-স্থলে

পাহাড়ে পাহাড়ে

 

কোথাও যাব না আর

আলুক্ষেতে বসে বসে বিকাল দেখিব

সূর্য নামিবে ধীরে

কাঁধে তুমি রাখিবে তোমার কাঁধ

মরমিয়া খোঁপা যেন ভেঙে ভেঙে পড়ে

 

পৃথিবীতে ঘুরেফিরে আসে যেন এই শীতকাল

তুমি আমি দোঁহে মিলে

দেখিব আনাজ ফুলে নামিছে বিকাল।