• ই-পেপার

আমার শিক্ষক

  • বিশ্বজিৎ ঘোষ

ড. তুহিন ওয়াদুদ

মায়াবী পর্দায় দুলে ওঠা কবি

আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি, কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়

মায়াবী পর্দায় দুলে ওঠা কবি
প্রতিকৃতি : মাহবুবুল হক

জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ এই মূল্যায়ন জীবনানন্দ দাশের, সবার নয়। এই মূল্যায়নের সঙ্গে অনেকে একমত পোষণ করেছেন, সবাই নয়। এই মতের বিপরীত মতের কাব্যদর্শন হাজির করেছেন আল মাহমুদ। তাঁর ভাষ্যে বোঝা যায়, মানুষমাত্রই কবি। তাঁর এই লেখার বিশ্লেষণ হয়তো জীবনানন্দ দাশের মতকে বাতিল করা কিংবা সেই মতের যুক্তি বিচার করার জন্য লিখিত নয়। আল মাহমদু যে সূত্রে সব মানুষকে কবি বলতে চেয়েছেন, তার একটি নাতিদীর্ঘ বয়ান পাওয়া যায় তাঁর ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে কাব্য তথা কবি আলোচনায় কবিতা সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ কবি আল মাহমুদ রেখে গেছেন তা পাঠকমাত্রকে ভাবনার নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে।

আল মাহমুদ ‘কবিতা এমন’ কবিতা লিখেছেন—‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা অক্তার।’ এক চরণে তিনি কবিতার যে সংজ্ঞায়ন করেছেন তা কাব্যিক ভাষারই স্বরূপ। আল মাহমুদ কবিতার বিশ্লেষণে-সংজ্ঞায়নে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে কবিতার নিজস্ব কোনো কাঠামো নেই। তিনি ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থের শুরুতে কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আদম-হাওয়ার সৃষ্টিবিষয়ক কাহিনি তুলে ধরেছেন। আল মাহমুদের ভাষায়, ‘আদম ও ঈভ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের শ্রম, ঘাম ও দুর্ভাগ্যের উপার্জনের শস্য আহরণ করে পৃথিবীতে বাস করতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ফেলে আসা স্বর্গের স্বপ্ন সুপ্ত হয়ে থাকল। এই স্বপ্ন তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যেও সঞ্চারিত থাকল। মানুষমাত্রই স্বপ্ন দেখে, সে আবার স্বর্গোদ্যানে ফিরে যাবে। এই স্বপ্নের নামই হলো কবিতা।’

আল মাহমুদ যেকোনো কবিতার বিশ্লেষণকে শুধু নিরুৎসাহই করেননি, বরং অর্থহীন বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি, কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়।’ কবির এই অভিমত অনুসারী হলে কবিতার বিশ্লেষণ থাকে না। তবু কবিতার বিশ্লেষণ হয়। পাঠ্যপুস্তকে কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা, কবিতা পড়ানো—এগুলোকেও কবি বিশেষ ইতিবাচকার্থে গ্রহণ করেননি। তার পরও কবির এই অভিমতবিরোধী অবস্থান নিয়ে অপরাপর কবির মতো তাঁরও কবিতার বিশ্লেষণ আছে, থাকবে।

আল মাহমুদের সত্তার দ্বিবিধ রূপ রয়েছে। একাংশ শাস্ত্রীয় বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। জীবনের প্রথমাংশে তাঁর কাব্যে শাস্ত্রের প্রভাব ছিল না। এটি তাঁর জীবনের প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে তিনি শাস্ত্রীয় বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর এই রূপান্তরবিষয়ক একটি কবিতা ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’।

‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা। এই কবিতাটিকে একটি বিশেষ কবিতা বলেই মনে হয়। বিশেষত আল মাহমুদ কারাবাসে থাকাকালে তাঁর চিন্তার রূপান্তর ঘটে। এই কবিতার বিষয়ভূমিতে এমন কিছু অনুষঙ্গ কবি রেখে গেছেন, যার মাধ্যমে কবির রূপান্তরের সূত্র সন্ধান করা যায়।

কবিতাটির বিষয় নিয়ে শুরুতে কথা বলা যাক। এই কবিতার বিষয়ভূমি স্বপ্নজনিত ঘটনার পরম্পরা। মানুষ সাধারণত আক্ষরিকভাবে বাস্তবসম্মত ঘটনা স্বপ্নে দেখে না। কবি নিজেও এখানে স্বপ্নকে পুরোপুরি বাস্তবসম্মত কাহিনিরূপে উপস্থাপন করেননি।

কবিতার বিষয় এ রকম—তিনি কারাবাসে আছেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখতে পান, সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ বুকের ওপর নিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। স্বপ্নে দেখতে পান, তিনি এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে আছেন। সেখানে আশপাশে আর কাউকে তিনি দেখতে পেলেন না। কবিতার শুরুর অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি—‘পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে/আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিল সত্যিকার ঘুম/কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখুনি/সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো, যার ফাঁক দিয়ে/যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বলো, স্বপ্ন।’

স্বপ্নলোকে তিনি যা দেখেছেন, সেই আবহ একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প পরবর্তী অবস্থা। একটি কামান দাঁড়িয়ে আছে। আদালতের অবস্থাও শোচনীয়। কারাগার ভূমির সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি তাঁর বাড়িরও খবর নিয়ে দেখেন, কেউ বেঁচে নেই। আবহটা যেন কিয়ামতের মতো।

আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘ইটের নিচে চাপাপড়া আমার কক্ষের দিকে চোখ পড়তেই/দেখলাম, সুটকেস, পোশাক-আশাক বইপত্র/সবকিছু ঢাকা পড়ে আছে। কোনো কিছুই উদ্ধারের আশা নেই।/আমি শুধু বিছানার ওপর পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি দেখলাম—/কোরান, খোলা, বাতাসে পবিত্র পৃষ্ঠাগুলো নড়ছে।/আমি জনমানবহীন বিরান নগরীর পরিত্যক্ত পাথরে/আল্লাহর আদেশ পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি/ধ্বসংস্তূপের ওপর থেকে সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম।’

‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতাটি সুগঠিত কাহিনির ওপর দণ্ডায়মান নয়। আবার এই কবিতায় কোনো কাহিনি নেই এমনও নয়। ভাব-বস্তু-কাহিনির অনন্য রসায়ন হয়ে উঠেছে কবিতাটি। কবিতাটির নির্মিতি কিছুটা স্বতন্ত্র। বাস্তব-স্বপ্ন-কবির চিন্তাজগতের পরিবর্তনসূত্র—সবকিছু এক হয়ে যাওয়া বিষয়ের উপস্থাপনকৌশলও বিষয়ানুগ হয়েছে। কোনো বক্তব্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে উপস্থাপন না করে সেই বক্তব্য কবিতাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। কবিতাকে কেউ যদি শুধু একটি স্বপ্ন হিসেবে দেখতে চান, তাতেও ভুল হতো না যদি তাঁর জীবনদর্শনে পরিবর্তন না আসত। এই কবিতার নির্মিতি অর্থাৎ শিল্পমান পাঠকভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কবিতার ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কবির ভাবকাঠামো যে শব্দগত রূপ পেয়েছে, তার আঙ্গিকগঠন কবিতাশিল্পের অনন্যতাস্পর্শী।

কবি আল মাহমুদ মনে করেন, কবিতার প্রাসঙ্গিকতা সব সময় এক না-ও হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য তাঁর কবিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থে তিনি এই বিষয়ের ওপরও আলোকপাত করেছেন। সেখানে সংস্কৃত সাহিত্যের আলোচনাও আছে। কাব্যের প্রাসঙ্গিকতা সব সময় বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা দূরবিস্তৃত হবে। কবিতাটির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ বিযুক্ত; তাই কবিতার শিল্পবিচার ছাড়াও এক শ্রেণির পাঠকের কাছে এর মর্যাদা অটুট থাকতে পারে। তবে আল মাহমুদের কবিতায় বিষয়গত কবিদর্শন বদলে যে শাস্ত্রীয় আবহ লাভ করেছে, এই উদ্ভাসন কারো কাছে ইতিবাচক, কারো কাছে নেতিবাচক। সময়ান্তরে কবির বদলে যাওয়ার মূল্যায়ন বদলাতে থাকবে।

কবি আল মাহমুদের ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতার উপজীব্য, নির্মাণশৈলী, প্রসঙ্গিকতা তাঁর কাব্যদর্শনের বাইরেও মূল্যায়িত হচ্ছে, হবে। কবিতাটি তাঁর বাঁক পরিবর্তনের দলিল হিসেবে বিবেচ্য। একক কবিতা হিসেবে এটি গভীরতা ও বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ।

কবির জন্মস্মরণে এই ভাষিক নিবেদন।

আল মাহমুদ। জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬। মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ইমদাদুল হক মিলন

হিজল ফুলের দিন

প্রতিটি বাড়িই তখন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আকাশ ছেয়ে আছে মেঘে। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। একটানা আট দিন দশ দিন শুধুই বৃষ্টি। রোদের মুখ দেখা যায় না। দিনভর ছায়াময়তা। আষাঢ় মাস এসে গেল। হিজল ফুলের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন ফুটবে কদম

হিজল ফুলের দিন
অঙ্কন : তানভীর মালেক

মিয়াদের ছাড়াবাড়ির নামায় জোড়া হিজলগাছ। দুই গাছে দুই রকমের ফুল ফোটে। একটা হালকা গোলাপি, আরেকটা সাদা। দুটি গাছে কি একসঙ্গে ফুল ফুটেছে? গাছের পাতা হুটোপুটি করছে সজল হাওয়ায়। সেই হাওয়ায় ভাসছে হিজল ফুলের মিষ্টি গন্ধ। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিক। আকাশে দাঁড়কাকের মতো উড়ছে টুকরো টুকরো মেঘ। পদ্মার জল ফুলে উঠেছে। গ্রামের এদিক-ওদিক অনেক খাল। বড় খাল থেকে ছোট ছোট খাল ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। নদী উপচানো জল কলকল করে ঢুকছে খালে। রাতারাতি ভরে যাচ্ছে খাল। খাল উপচানো জল ঢুকে যাচ্ছে গ্রামের ডোবা-নালা-পুকুরে। আকাশ ভেঙে নামছে বৃষ্টি। একদিকে নদী খালের জল, অন্যদিকে বৃষ্টির জল। রাতারাতি চক-মাঠের ধান-পাটের জমিতেও উঠে যাচ্ছে জল। বর্ষা এসে গেল।

হিজল ফুলের দিনওই সময়টাকে আমরা বলতাম ‘জোয়ারের দিন’। বর্ষা শুরুর কাল। এখন আর রোদের মুখ দেখা যাবে না। মেঘের ছায়ায় ভরে থাকবে দিনগুলো। মাছদের প্রজননকাল। কত মাছ তখন! খাল-বিল ভরা মাছ। পুকুর-ডোবা ভরা মাছ। জোয়ারের জলের সঙ্গে শুরু হয়েছে মাছদের উচ্ছ্বাস-আনন্দ। পুঁটি মাছের শরীরের দুই পাশে লাল রেখা পড়েছে। আমরা বলতাম, পুঁটি মাছ শাড়ি পরেছে। পেট ভর্তি ডিম একেকটা মাছের। গ্রামের মানুষ মাছ ধরায় মেতে উঠেছে। ধান-পাটের ক্ষেতে গোড়ালি ডুবে যাওয়া জল। আনন্দে মাতোয়ারা মাছ। খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ছেড়ে ধান-পাটের ক্ষেতে উঠে যাচ্ছে কেলি করতে। টেঁটা দিয়ে সেই মাছ মারছে গ্রামের মানুষ। পুকুর উপচানো জল নালা বেয়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। হাজামবাড়ির ছেলে রব আর হাফিজুদ্দি আমার বন্ধু। ওদের সঙ্গে গিয়ে ভেসালের মতো করে ছোট জাল পেতেছি মিয়াদের জোড়া হিজলগাছের তলায়। সেখানে হাত দুয়েক চওড়া একটা নালা। আমিনুল মামাদের পুকুর থেকে এই নালা বেয়ে জলস্রোত নেমে যাচ্ছে মাঠের দিকে। পাঁচ-সাত মিনিট পর পর রব-হাফিজুদ্দির সঙ্গে জাল তুলছি। ছোট ছোট কত মাছ! পুঁটি ট্যাংরা, বেলে পাবদা, খলিশা টাকি, কই শিং, টাটকিনি আর ভেদা মাছ। বাইন মাছের বাচ্চা, রুই, মৃগেল আর কাতল মাছের বাচ্চা আছে। শোল গজার আর বোয়াল মাছের বাচ্চা আছে, ফলি মাছ আছে। মাছের অন্ত নেই। মাছ রাখার বেতের তৈরি পাত্রটিকে বলি ‘ডুলা’। ঘণ্টা কাবার হতে পারে না, ডুলা ভরে যায় মাছে। এক ডুলা নিয়ে যায় রব, এক ডুলা আমি, আরেক ডুলা হাফিজুদ্দি। বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অবস্থা হয়েছে ঝোড়ো কাকের মতো। কে ওসব খেয়াল করে! মাছের নেশায় মাতাল হয়ে আছি।

সন্ধ্যার পর বাড়ির বড়রা আসে এখানটায় মাছ ধরতে। ভয়ে আমরা ছোটরা সন্ধ্যাবেলা ওদিকটায় যাই না। মিয়াদের ছাড়াবাড়ির গাব আর তেঁতুলগাছে, আর জোড়া হিজলগাছ দুটিতে তেনারা বসবাস করেন। মাছের প্রতি বেজায় লোভ তেনাদের। ডুলা উজাড় করে মাছ নিয়ে যান। যারা রাতের বেলা ওখানটায় বসে মাছ ধরে, তাদের ভয় দেখিয়ে বিদায় করেন।

ও রকম এক রাতে নিবিড় হয়ে বৃষ্টি নেমেছিল। বৃষ্টির সঙ্গে ঝরছিল অন্ধকার। আমার বড় ভাই দুই মামার সঙ্গে ওখানটায় জাল পেতে বসেছে। অন্ধকার যতটা গাঢ় হতে পারে হয়েছে। ওদের সঙ্গে হারিকেন আছে। বৃষ্টি আর হাওয়ায় যাতে নিভে না যায় সে জন্য হারিকেনের ওপর কচুপাতার আবরণ দিয়ে রেখেছে। তবু বৃষ্টিভেজা হাওয়ায় পুঁটি মাছের মতো লাফালাফি করে হারিকেনের আলো। একসময় প্রচুর মাছ পড়তে লাগল জালে। ওরা জাল তুলে কুলাতে পারছে না। মাছে ভরে যাচ্ছে ডুলা। দু-তিনটা ডুলা ভরে গেছে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। এ সময় ছাড়াবাড়ির ভেতর থেকে হা হা শব্দে প্রবল ঝড়ের মতো ছুটে এলো কোনো এক শক্তি। হিজলগাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। মামাদের একজন বুঝে গেল কে বা কারা উপস্থিত হয়েছে। ওরা সবকিছু ফেলে চিৎকার করতে করতে বাড়িমুখো দৌড় দিয়েছিল। সকালবেলা গিয়ে দেখা গেল, ডুলা তিনটি শূন্য পড়ে আছে। হারিকেনটির কাচ ভাঙা। জিনিসটা উল্টে পড়ে আছে।

জোয়ারে মাছের সঙ্গে ভূত-প্রেতের আসর থাকে—এ রকম কুসংস্কার ছিল। বড় মাছের মধ্যে ওই সময়টায় বোয়াল মাছগুলো প্রায় পাগল হয়ে যেত। তাদের শারীরিক মিলনের সময়টাকে বিক্রমপুর অঞ্চলে বলা হয় ‘পির ধরা’। এই পির ধরার জন্য বড় বড় বোয়াল মাছ খাল-বিল-পুকুর ছেড়ে ধান-পাটের মাঠে চলে আসত। চক-মাঠের অল্প জলে দু-তিনটা বা চার-পাঁচটা বোয়াল একত্র হয়ে পির ধরত। পিরের বোয়াল জুতি-টেঁটা দিয়ে মারলে মাছ শিকারিদের তেমন লাভ হতো না। জুতি-টেঁটায় একটার বেশি বোয়াল গাঁথা যায় না। সে জন্য পিরের বোয়াল ধরতে হয় পলো দিয়ে চেপে। তাতে দু-তিনটা বোয়াল মাছ আটকানো যায়। পির ধরার সময় মাছগুলো মানুষের পায়ের পাতা ডোবে না এমন খোলা মাঠে চলে আসে। তিন-চারটা-পাঁচটা একত্র হয়ে এক ধরনের ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করে। আর উন্মাদের মতো একটা আরেকটাকে কামড়াতে থাকে। তারপর শরীরে শরীর লাগিয়ে পড়ে থাকে। সঙ্গম শেষের ক্লান্তি। আমি আর আলমগীর মামা সমবয়সী। তখন আমাদের দশ-এগারো বছর বয়স। ও রকম জোয়ার আর বৃষ্টির দিনে ভিজতে ভিজতে দুজন গেছি বাড়ির তিন-চারটা জমির পর যে ছোট্ট একটুখানি মাঠ, সেই মাঠে। মাঠের দূর্বাঘাসগুলো তখনো পুরোপুরি ডুবে যায়নি। একটু একটু মাথা তুলে আছে। আমাদের গোড়ালি ডুবে যাওয়ার মতো জল। দুপুরবেলাই মনে হচ্ছে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চারদিকে আবছায়া। হঠাৎ খুব কাছেই শুনি ঘোৎ ঘোৎ শব্দ হচ্ছে। কয়েক পা এগিয়ে দেখি চারটা অতিকায় বোয়াল ওইটুকু জলের মাঠ তোলপাড় করে ফেলছে। যেন একসঙ্গে জড়াজড়ি করে অদ্ভুত এক খেলায় মেতে আছে। আমাদের হাতের তিন-চার হাত হবে লম্বা। হলুদ রঙের চওড়া পেট আবছায়া আলোর ভেতরও চকচক করছে। দেখে আমরা গেলাম ভয় পেয়ে। ছুটে এসে বাড়িতে বললাম। হাফিজ মামা আর ননী মামা দুটি পলো নিয়ে ছুটে গেল। কিছুক্ষণ পর একেকজনের হাতে দেখা গেল দুটি করে বিশাল আকৃতির বোয়াল মাছ। মাছের ভারে জোয়ানমর্দ মানুষ দুটি একদিকে কাত হয়ে গেছে।

এই বোয়াল মাছের সঙ্গেও আছে কুসংস্কার। রাতের বেলা পিরের বোয়াল ধরতে বিলে গেছে মাছ শিকারি। হাতে পলো আর টর্চলাইট বা হারিকেন। চিকন শক্ত রশি আছে সঙ্গে। বোয়াল ধরে কানকোতে রশি ঢুকিয়ে বাড়ি বয়ে আনবে। বিশাল আকৃতির বোয়ালের দেখা সে পেল। বোয়ালের কপালে সিঁদুরের টিপ। অন্ধকারেও সেই টিপ জ্বলজ্বল করে জ্বলে। এই বোয়াল আসলে বোয়াল না। মাছ শিকারিকে সে বিভ্রান্ত করে ধীরে ধীরে গভীর জলের দিকে নিয়ে যাবে। জলে ডুবিয়ে মারবে। এই ভয়ে অনেক মা একা তাঁর ছেলেকে জোয়ারের দিনে রাতের বেলা মাছ মারতে বেরোতে দিতেন না। স্ত্রী দিতেন না তাঁর স্বামীকে। তার পরও মাছ শিকারিদের ঠেকিয়ে রাখা যেত না। মাছের নেশা বড় নেশা। কেউ ও রকম বোয়ালের পাল্লায় পড়ে বিলের অতলে ডুবে মরেছে বলে শুনিনি। বরং দেখেছি, সারা রাত মাছ ধরে, ছোট-বড় প্রচুর মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়েরা, তাঁদের সদ্য যুবক হয়ে ওঠা ছেলেরা।

এ রকম ছিল আমার ছেলেবেলার বর্ষা শুরুর দিনগুলো। মেঘ-বৃষ্টি আর জলের দিন। মাছ আর মাছের দিন। সাদা আর গোলাপি হিজল ফুলের দিন। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিনগুলো যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে যেত। জোয়ার আর মাছের দিন পাঁচ-সাত দিন দশ দিনের মধ্যেই শেষ। তত দিনে খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় উঁচু হয়ে গেছে জল। চকে-মাঠে হাঁটু ডুবে যায়, কোমর ডুবে যায়। গৃহস্থ লোক গত বর্ষার শেষে পুকুর কিংবা খালে ডুবিয়ে রেখেছে তাদের চলাফেরা আর গৃহস্থালি কাজের নৌকাখানি। সেই নৌকা তুলে গাব আর আলকাতরা মেখে রোদে দিয়েছে। আচমকা একপশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল নৌকা, তার পরই চকচকে তাজা রোদ, নৌকার গাব-আলকাতরা শুকাতে লাগল। তখনকার বিক্রমপুরে বর্ষাদিনে চলাচলের একমাত্র বাহন এই নৌকা। হাটে-মাঠে-ঘাটে যেখানেই যাও, ডিঙ্গি বা কোষা নৌকা লাগবেই! এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতেও নৌকা। প্রতিটি বাড়িই তখন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আকাশ ছেয়ে আছে মেঘে। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। দিন নেই রাত নেই পড়েই যাচ্ছে। একটানা আট দিন দশ দিন শুধুই বৃষ্টি। রোদের মুখ দেখা যায় না। দিনভর ছায়াময়তা। আষাঢ় মাস এসে গেল। হিজল ফুলের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন ফুটবে কদম। কদমের মাদকতাময় গন্ধে ভরে থাকবে দেশগ্রাম।

এইতো ছিল আমার শৈশব-কৈশোরের বর্ষা শুরুর দিনগুলো। বৃষ্টি আর জোয়ারের জলের মনোময় দিনগুলো। সুবাসিত হিজল ফুলের দিনগুলো।

 

 

খোঁপায় নজর

নিলয় রফিক

খোঁপায় নজর

আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির

তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর

ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর

পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর

 

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই

ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

রবিশস্যের দিনে

মুজিব ইরম

রবিশস্যের দিনে

মানুষ গোলাপ গ্রামে যাবে

চা-বাগানে যাবে

যাবে শাপলা বিলে

লালপদ্ম ঝিলে

শিমুল বাগানে

লালা খালে

সাদা পাথরের জলে

রাতারগুলে

জলে-স্থলে

পাহাড়ে পাহাড়ে

 

কোথাও যাব না আর

আলুক্ষেতে বসে বসে বিকাল দেখিব

সূর্য নামিবে ধীরে

কাঁধে তুমি রাখিবে তোমার কাঁধ

মরমিয়া খোঁপা যেন ভেঙে ভেঙে পড়ে

 

পৃথিবীতে ঘুরেফিরে আসে যেন এই শীতকাল

তুমি আমি দোঁহে মিলে

দেখিব আনাজ ফুলে নামিছে বিকাল।