আবুল কাসেম ফজলুল হক
জন্ম : ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০। মৃত্যু : ৫ জুলাই ২০২৬
১৯৭৮ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে বিএ সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমি। ২০১ নম্বর কোর্সের ক্লাস শুরু হবে। আমরা বসে আছি কলা ভবনের ২০১৭ নম্বর কক্ষে। কোর্স শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। নামটা শুনেই আমার শুধু মনে পড়ছিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কথা। সময়মতো স্যার ক্লাসে এলেন। রোল কল করে আমাদের অভিনন্দন জানিয়ে একনাগাড়ে বলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে চলেছি স্যারের বক্তৃতা। কোনো নোট নেই সামনে। স্যার বলে চলেছেন বিরামহীনভাবে। প্রথম ক্লাসেই লক্ষ করলাম, আমাদের কাসেম স্যার সাহিত্য সমালোচনায় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গটা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। সেই যে স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুরু হলো, তারপর প্রায় পাঁচ দশক কেটে গেছে, ক্রমে সেই সম্পর্ক হয়েছে গভীর থেকে গভীরতর।
সাহিত্যের ক্লাসে আমাদের কাসেম স্যার শিক্ষার্থীদের চেতনায় সর্বদা শুভবোধ জাগরণের চেষ্টা করতেন। সে কারণে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকত না তাঁর ক্লাস। সামাজিক নানা অনুষঙ্গকে তিনি অনায়াসে নিয়ে আসতেন সাহিত্যপাঠের মধ্যে। যেহেতু তিনি আমাদের পড়িয়েছেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ, তাই তাঁর সমাজমুখী ভাবনা উপস্থাপন এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। লক্ষ করেছি, আধুনিক গদ্যসাহিত্য আলোচনায় তাঁর সমধিক উৎসাহ রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতি, আর উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম দিকে রাজা রামমোহন রায় ও বার্ট্রান্ড রাসেলের চিন্তা দ্বারা আবুল কাসেম ফজলুল হক গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। ক্লাসে এই দুজনের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। বক্তৃতায় তিনি সাহিত্যের নান্দনিক মূল্যের চেয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বদা বড় করে দেখেছেন। সে জন্য কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, সাহিত্যের অধ্যাপক না হয়ে স্যার যদি দর্শন বা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হতেন, তাহলে তাঁর অবদান আরো ব্যাপক হতে পারত।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সদালাপী সজ্জন মানুষ। শিক্ষকদের মধ্যে ইদানীং দৃষ্ট নানামুখী বিরোধী আচরণ থেকে তিনি ছিলেন সর্বাংশে মুক্ত। কারো উন্নতি বা পদোন্নতির পথে স্যার কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি। গোপনে কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কোনো কাজে তিনি জড়িত, এমন কথা কখনো আমি শুনিনি। সবার মঙ্গলপ্রত্যাশী ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। অন্যের কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তবে নিজের মত প্রকাশে তিনি সব সময় থাকতেন সুদৃঢ় অথচ সুমিত। আড্ডায় বসলে অন্যের কথা শুনতে তিনি উৎসাহী থাকতেন। স্যারের খুব মজার একটা কৌশল ছিল, অন্যের কথা বা মনোভাব শোনার জন্য তিনি জ্ঞাতব্য বিষয়ে একটা প্রশ্ন উত্থাপন করে চুপ করে থাকতেন। অন্যরা কথা বলার পর তুলে ধরতেন তাঁর নিজের কথা।
আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের সঙ্গে আমার নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শিক্ষক-ছাত্র হিসেবে, সহকর্মী হিসেবে সেসব স্মৃতি, তাঁর এই বিদায়-সময়ে খুব মনে পড়ছে। বরিশালে আয়োজিত এক সাহিত্য সম্মেলনে স্যারের সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম আমি। আসা-যাওয়ার পথে স্যারের অনেক কথা শোনার সুযোগ ঘটেছে সে যাত্রায়। এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারির রাতে মোহনা টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গে একত্রে কথা বলেছি আমি। ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ বিষয়ক সেই অনুষ্ঠান শেষে মিরপুর থেকে স্যারের সঙ্গে এক গাড়িতেই এসেছি। স্যারকে পরিবাগে নামিয়ে দিয়ে আমি যাব ধানমণ্ডি। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা। গাড়ি থেকে নামতে নামতে স্যার বললেন—ভালো থেকো, আবার দেখা হবে। না, স্যারের সঙ্গে আর দেখা হলো না। ওটাই স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা, শেষ কথা বলা।
নিজের অভিমত প্রচার এবং অন্যকে উদ্দীপ্ত করার মানসে কাসেম স্যার দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি প্রকাশ করেছেন সুন্দরম নামের ক্ষণজীবী এক সাহিত্যপত্র। তখন তিনি স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। এরপর ১৯৮২ সাল থেকে প্রকাশ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্র লোকায়ত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লোকায়ত পত্রিকা তিনি সচল রেখেছিলেন। লোকায়ত পত্রিকা বলতে গেলে তিনি একক হাতেই পরিচালনা করতেন। লোকায়ত পত্রিকায় প্রধানত চিন্তামূলক লেখা প্রকাশিত হতো, প্রকাশিত হতো সমাজবাদী লেখা। ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের ওপর আমার একটা লেখা মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। সেই লেখা পাঠ করে কাসেম স্যার লোকায়ত পত্রিকার জন্য পূর্ব বাংলায় প্রগতি লেখক আন্দোলন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রবন্ধ লিখতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে স্যারকে সেই লেখা আমি দিতে পারিনি।
২.
সাহিত্যের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সবার কাছে একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। নানা বিষয়ে তিনি চিন্তা উদ্রেককারী বক্তব্য দিয়েছেন, লিখেছেন বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ। চিন্তামূলক প্রবন্ধ লিখতেই তিনি ছিলেন সমধিক আগ্রহী। শ্রেয়োবোধ ও কল্যাণচিন্তা, মানুষের মাঝে শুভবোধের উদয়, সামাজিক সমতা—এসবই ছিল আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার প্রধান অনুষঙ্গ। ষাটের দশকে তিনি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রে সংশ্লিষ্ট হন এবং তখন থেকেই মার্ক্সবাদী দর্শনে তাঁর দীক্ষার শুরু। মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তিনি, আর সেই মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল তাঁর সব কর্ম ও সৃষ্টির কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য। সেই ষাটের দশক থেকেই নিরলস লিখে গেছেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, আর তাঁর সেসব লেখার মধ্য দিয়ে তাঁকে সহজেই চিনে নেওয়া যায় সামাজিক কল্যাণাকাঙ্ক্ষী একজন মানবতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ হিসেবে।
১৯৬০-এর দশকের প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্রই আছে আবুল কাসেম ফজলুল হকের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি গোপনে অর্থ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন, আশ্রয় দিতেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে আবুল কাসেম ফজলুল হক শেষ জীবনে সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির তিনি ছিলেন সভাপতি। এই কমিটির সঙ্গে আমিও সংশ্লিষ্ট আছি। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষার জন্য আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে, করেছে সন্দীপিত। সব সময় লক্ষ করতাম, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় স্যার ছিলেন সদা উৎসাহী একজন মানুষ।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, ছিলেন মুক্তমনের উদার এক মানবতাবাদী লেখক। অনেক বই লিখেছেন তিনি, লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ, উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন সেমিনারে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নিবন্ধ। তাঁর প্রথম বই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। এরপর একে একে তিনি প্রকাশ করেছেন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’ (১৯৭৬), ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য’ (১৯৭৯), ‘নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’ (১৯৮১), ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ (১৯৭৩), ‘রাজনীতি ও দর্শন’ (১৯৮৯), ‘বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্য’ (১৯৮৯), ‘সাহিত্যচিন্তা’ (১৯৯৪), ‘স্বদেশচিন্তা’ (১৯৯৮), ‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা’ (২০০২), ‘সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ’ (২০০৩), ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ (১৯৯৭), ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’ (২০০৪), ‘মানুষের স্বরূপ’ (২০০৭), ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’ (২০০৮), ‘শ্রেষ্ঠপ্রবন্ধ’ (২০১১) ইত্যাদি বই। দার্শনিক বান্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হকের অধ্যয়নের অন্যতম বিষয়। রাসেলের দুটি বই তিনি অনুবাদ করেছেন—‘রাজনৈতিক আদর্শ’ (১৯৭২) ও ‘নবযুগের প্রত্যাশায়’ (১৯৮৯)। আবুল কাসেম ফজলুল হক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। এর মধ্যে আছে ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : সাম্য’ (২০০০), ‘এস ওয়াজেদ আলী : ভবিষ্যতের বাঙালী’ (২০০০), ‘আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ (২০০২), ‘স্বদেশচিন্তা’ (১৯৮৪), ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ (১৯৭৮) ইত্যাদি।
৩.
আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর তাঁর কোনো বিশ্বাস ছিল না; তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের শুভবোধের ওপর। এ কারণে পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপন উগ্রগোষ্ঠীর হাতে শহীদ হওয়ার পর পিতা হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তিনি কোনো বিচার প্রত্যাশা করেননি; বরং বিচার প্রার্থনা করেছেন মানুষের শুভবোধের কাছে। সন্তানহারা একজন পিতার এই প্রার্থনার মধ্যে তাঁর মানসদৃষ্টির প্রাতিস্বিকতা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এ দেশের তরুণসমাজের ওপর তাঁর ছিল গভীর বিশ্বাস। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, তরুণরাই পারবে ঘুণে ধরা এই সমাজব্যবস্থা পাল্টাতে। তাই তিনি শুভবোধ ও কল্যাণচিন্তায় জাগ্রত হতে তরুণসমাজকে পৌনঃপুনিক আহ্বান জানিয়েছেন।



