• ই-পেপার

ইমদাদুল হক মিলন

হিজল ফুলের দিন

  • প্রতিটি বাড়িই তখন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আকাশ ছেয়ে আছে মেঘে। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। একটানা আট দিন দশ দিন শুধুই বৃষ্টি। রোদের মুখ দেখা যায় না। দিনভর ছায়াময়তা। আষাঢ় মাস এসে গেল। হিজল ফুলের দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন ফুটবে কদম

আমার শিক্ষক

বিশ্বজিৎ ঘোষ

আমার শিক্ষক
প্রতিকৃতি তানভীর মালেক

আবুল কাসেম ফজলুল হক

জন্ম : ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪০। মৃত্যু : ৫ জুলাই ২০২৬

১৯৭৮ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে বিএ সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমি। ২০১ নম্বর কোর্সের ক্লাস শুরু হবে। আমরা বসে আছি কলা ভবনের ২০১৭ নম্বর কক্ষে। কোর্স শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। নামটা শুনেই আমার শুধু মনে পড়ছিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কথা। সময়মতো স্যার ক্লাসে এলেন। রোল কল করে আমাদের অভিনন্দন জানিয়ে একনাগাড়ে বলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে চলেছি স্যারের বক্তৃতা। কোনো নোট নেই সামনে। স্যার বলে চলেছেন বিরামহীনভাবে। প্রথম ক্লাসেই লক্ষ করলাম, আমাদের কাসেম স্যার সাহিত্য সমালোচনায় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গটা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। সেই যে স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুরু হলো, তারপর প্রায় পাঁচ দশক কেটে গেছে, ক্রমে সেই সম্পর্ক হয়েছে গভীর থেকে গভীরতর।

সাহিত্যের ক্লাসে আমাদের কাসেম স্যার শিক্ষার্থীদের চেতনায় সর্বদা শুভবোধ জাগরণের চেষ্টা করতেন। সে কারণে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকত না তাঁর ক্লাস। সামাজিক নানা অনুষঙ্গকে তিনি অনায়াসে নিয়ে আসতেন সাহিত্যপাঠের মধ্যে। যেহেতু তিনি আমাদের পড়িয়েছেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ, তাই তাঁর সমাজমুখী ভাবনা উপস্থাপন এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। লক্ষ করেছি, আধুনিক গদ্যসাহিত্য আলোচনায় তাঁর সমধিক উৎসাহ রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতি, আর উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম দিকে রাজা রামমোহন রায় ও বার্ট্রান্ড রাসেলের চিন্তা দ্বারা আবুল কাসেম ফজলুল হক গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। ক্লাসে এই দুজনের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। বক্তৃতায় তিনি সাহিত্যের নান্দনিক মূল্যের চেয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বদা বড় করে দেখেছেন। সে জন্য কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, সাহিত্যের অধ্যাপক না হয়ে স্যার যদি দর্শন বা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হতেন, তাহলে তাঁর অবদান আরো ব্যাপক হতে পারত।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সদালাপী সজ্জন মানুষ। শিক্ষকদের মধ্যে ইদানীং দৃষ্ট নানামুখী বিরোধী আচরণ থেকে তিনি ছিলেন সর্বাংশে মুক্ত। কারো উন্নতি বা পদোন্নতির পথে স্যার কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি। গোপনে কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কোনো কাজে তিনি জড়িত, এমন কথা কখনো আমি শুনিনি। সবার মঙ্গলপ্রত্যাশী ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। অন্যের কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তবে নিজের মত প্রকাশে তিনি সব সময় থাকতেন সুদৃঢ় অথচ সুমিত। আড্ডায় বসলে অন্যের কথা শুনতে তিনি উৎসাহী থাকতেন। স্যারের খুব মজার একটা কৌশল ছিল, অন্যের কথা বা মনোভাব শোনার জন্য তিনি জ্ঞাতব্য বিষয়ে একটা প্রশ্ন উত্থাপন করে চুপ করে থাকতেন। অন্যরা কথা বলার পর তুলে ধরতেন তাঁর নিজের কথা।

আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের সঙ্গে আমার নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শিক্ষক-ছাত্র হিসেবে, সহকর্মী হিসেবে সেসব স্মৃতি, তাঁর এই বিদায়-সময়ে খুব মনে পড়ছে। বরিশালে আয়োজিত এক সাহিত্য সম্মেলনে স্যারের সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম আমি। আসা-যাওয়ার পথে স্যারের অনেক কথা শোনার সুযোগ ঘটেছে সে যাত্রায়। এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারির রাতে মোহনা টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গে একত্রে কথা বলেছি আমি। ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ বিষয়ক সেই অনুষ্ঠান শেষে মিরপুর থেকে স্যারের সঙ্গে এক গাড়িতেই এসেছি। স্যারকে পরিবাগে নামিয়ে দিয়ে আমি যাব ধানমণ্ডি। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা। গাড়ি থেকে নামতে নামতে স্যার বললেন—ভালো থেকো, আবার দেখা হবে। না, স্যারের সঙ্গে আর দেখা হলো না। ওটাই স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা, শেষ কথা বলা।

নিজের অভিমত প্রচার এবং অন্যকে উদ্দীপ্ত করার মানসে কাসেম স্যার দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি প্রকাশ করেছেন সুন্দরম নামের ক্ষণজীবী এক সাহিত্যপত্র। তখন তিনি স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। এরপর ১৯৮২ সাল থেকে প্রকাশ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্র লোকায়ত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লোকায়ত পত্রিকা তিনি সচল রেখেছিলেন। লোকায়ত পত্রিকা বলতে গেলে তিনি একক হাতেই পরিচালনা করতেন। লোকায়ত পত্রিকায় প্রধানত চিন্তামূলক লেখা প্রকাশিত হতো, প্রকাশিত হতো সমাজবাদী লেখা। ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের ওপর আমার একটা লেখা মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। সেই লেখা পাঠ করে কাসেম স্যার লোকায়ত পত্রিকার জন্য পূর্ব বাংলায় প্রগতি লেখক আন্দোলন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রবন্ধ লিখতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে স্যারকে সেই লেখা আমি দিতে পারিনি।

 

২.

সাহিত্যের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সবার কাছে একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। নানা বিষয়ে তিনি চিন্তা উদ্রেককারী বক্তব্য দিয়েছেন, লিখেছেন বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ। চিন্তামূলক প্রবন্ধ লিখতেই তিনি ছিলেন সমধিক আগ্রহী। শ্রেয়োবোধ ও কল্যাণচিন্তা, মানুষের মাঝে শুভবোধের উদয়, সামাজিক সমতা—এসবই ছিল আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তার প্রধান অনুষঙ্গ। ষাটের দশকে তিনি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রে সংশ্লিষ্ট হন এবং তখন থেকেই মার্ক্সবাদী দর্শনে তাঁর দীক্ষার শুরু। মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তিনি, আর সেই মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল তাঁর সব কর্ম ও সৃষ্টির কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য। সেই ষাটের দশক থেকেই নিরলস লিখে গেছেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, আর তাঁর সেসব লেখার মধ্য দিয়ে তাঁকে সহজেই চিনে নেওয়া যায় সামাজিক কল্যাণাকাঙ্ক্ষী একজন মানবতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ হিসেবে।

১৯৬০-এর দশকের প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্রই আছে আবুল কাসেম ফজলুল হকের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি গোপনে অর্থ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন, আশ্রয় দিতেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে আবুল কাসেম ফজলুল হক শেষ জীবনে সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির তিনি ছিলেন সভাপতি। এই কমিটির সঙ্গে আমিও সংশ্লিষ্ট আছি। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষার জন্য আবুল কাসেম ফজলুল হকের চিন্তা আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে, করেছে সন্দীপিত। সব সময় লক্ষ করতাম, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় স্যার ছিলেন সদা উৎসাহী একজন মানুষ।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, ছিলেন মুক্তমনের উদার এক মানবতাবাদী লেখক। অনেক বই লিখেছেন তিনি, লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ, উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন সেমিনারে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নিবন্ধ। তাঁর প্রথম বই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। এরপর একে একে তিনি প্রকাশ করেছেন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’ (১৯৭৬), ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য’ (১৯৭৯), ‘নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’ (১৯৮১), ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ (১৯৭৩), ‘রাজনীতি ও দর্শন’ (১৯৮৯), ‘বাংলাদেশের প্রবন্ধসাহিত্য’ (১৯৮৯), ‘সাহিত্যচিন্তা’ (১৯৯৪), ‘স্বদেশচিন্তা’ (১৯৯৮), ‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা’ (২০০২), ‘সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ’ (২০০৩), ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ (১৯৯৭), ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’ (২০০৪), ‘মানুষের স্বরূপ’ (২০০৭), ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’ (২০০৮), ‘শ্রেষ্ঠপ্রবন্ধ’ (২০১১) ইত্যাদি বই। দার্শনিক বান্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হকের অধ্যয়নের অন্যতম বিষয়। রাসেলের দুটি বই তিনি অনুবাদ করেছেন—‘রাজনৈতিক আদর্শ’ (১৯৭২) ও ‘নবযুগের প্রত্যাশায়’ (১৯৮৯)। আবুল কাসেম ফজলুল হক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। এর মধ্যে আছে ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : সাম্য’ (২০০০), ‘এস ওয়াজেদ আলী : ভবিষ্যতের বাঙালী’ (২০০০), ‘আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ (২০০২), ‘স্বদেশচিন্তা’ (১৯৮৪), ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ (১৯৭৮) ইত্যাদি।

 

৩.

আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর তাঁর কোনো বিশ্বাস ছিল না; তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের শুভবোধের ওপর। এ কারণে পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপন উগ্রগোষ্ঠীর হাতে শহীদ হওয়ার পর পিতা হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তিনি কোনো বিচার প্রত্যাশা করেননি; বরং বিচার প্রার্থনা করেছেন মানুষের শুভবোধের কাছে। সন্তানহারা একজন পিতার এই প্রার্থনার মধ্যে তাঁর মানসদৃষ্টির প্রাতিস্বিকতা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এ দেশের তরুণসমাজের ওপর তাঁর ছিল গভীর বিশ্বাস। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, তরুণরাই পারবে ঘুণে ধরা এই সমাজব্যবস্থা পাল্টাতে। তাই তিনি শুভবোধ ও কল্যাণচিন্তায় জাগ্রত হতে তরুণসমাজকে পৌনঃপুনিক আহ্বান জানিয়েছেন।

 

 

 

ড. তুহিন ওয়াদুদ

মায়াবী পর্দায় দুলে ওঠা কবি

আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি, কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়

মায়াবী পর্দায় দুলে ওঠা কবি
প্রতিকৃতি : মাহবুবুল হক

জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ এই মূল্যায়ন জীবনানন্দ দাশের, সবার নয়। এই মূল্যায়নের সঙ্গে অনেকে একমত পোষণ করেছেন, সবাই নয়। এই মতের বিপরীত মতের কাব্যদর্শন হাজির করেছেন আল মাহমুদ। তাঁর ভাষ্যে বোঝা যায়, মানুষমাত্রই কবি। তাঁর এই লেখার বিশ্লেষণ হয়তো জীবনানন্দ দাশের মতকে বাতিল করা কিংবা সেই মতের যুক্তি বিচার করার জন্য লিখিত নয়। আল মাহমদু যে সূত্রে সব মানুষকে কবি বলতে চেয়েছেন, তার একটি নাতিদীর্ঘ বয়ান পাওয়া যায় তাঁর ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে কাব্য তথা কবি আলোচনায় কবিতা সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ কবি আল মাহমুদ রেখে গেছেন তা পাঠকমাত্রকে ভাবনার নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে।

আল মাহমুদ ‘কবিতা এমন’ কবিতা লিখেছেন—‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা অক্তার।’ এক চরণে তিনি কবিতার যে সংজ্ঞায়ন করেছেন তা কাব্যিক ভাষারই স্বরূপ। আল মাহমুদ কবিতার বিশ্লেষণে-সংজ্ঞায়নে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে কবিতার নিজস্ব কোনো কাঠামো নেই। তিনি ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থের শুরুতে কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আদম-হাওয়ার সৃষ্টিবিষয়ক কাহিনি তুলে ধরেছেন। আল মাহমুদের ভাষায়, ‘আদম ও ঈভ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের শ্রম, ঘাম ও দুর্ভাগ্যের উপার্জনের শস্য আহরণ করে পৃথিবীতে বাস করতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ফেলে আসা স্বর্গের স্বপ্ন সুপ্ত হয়ে থাকল। এই স্বপ্ন তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যেও সঞ্চারিত থাকল। মানুষমাত্রই স্বপ্ন দেখে, সে আবার স্বর্গোদ্যানে ফিরে যাবে। এই স্বপ্নের নামই হলো কবিতা।’

আল মাহমুদ যেকোনো কবিতার বিশ্লেষণকে শুধু নিরুৎসাহই করেননি, বরং অর্থহীন বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি, কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়।’ কবির এই অভিমত অনুসারী হলে কবিতার বিশ্লেষণ থাকে না। তবু কবিতার বিশ্লেষণ হয়। পাঠ্যপুস্তকে কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা, কবিতা পড়ানো—এগুলোকেও কবি বিশেষ ইতিবাচকার্থে গ্রহণ করেননি। তার পরও কবির এই অভিমতবিরোধী অবস্থান নিয়ে অপরাপর কবির মতো তাঁরও কবিতার বিশ্লেষণ আছে, থাকবে।

আল মাহমুদের সত্তার দ্বিবিধ রূপ রয়েছে। একাংশ শাস্ত্রীয় বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। জীবনের প্রথমাংশে তাঁর কাব্যে শাস্ত্রের প্রভাব ছিল না। এটি তাঁর জীবনের প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে তিনি শাস্ত্রীয় বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর এই রূপান্তরবিষয়ক একটি কবিতা ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’।

‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা। এই কবিতাটিকে একটি বিশেষ কবিতা বলেই মনে হয়। বিশেষত আল মাহমুদ কারাবাসে থাকাকালে তাঁর চিন্তার রূপান্তর ঘটে। এই কবিতার বিষয়ভূমিতে এমন কিছু অনুষঙ্গ কবি রেখে গেছেন, যার মাধ্যমে কবির রূপান্তরের সূত্র সন্ধান করা যায়।

কবিতাটির বিষয় নিয়ে শুরুতে কথা বলা যাক। এই কবিতার বিষয়ভূমি স্বপ্নজনিত ঘটনার পরম্পরা। মানুষ সাধারণত আক্ষরিকভাবে বাস্তবসম্মত ঘটনা স্বপ্নে দেখে না। কবি নিজেও এখানে স্বপ্নকে পুরোপুরি বাস্তবসম্মত কাহিনিরূপে উপস্থাপন করেননি।

কবিতার বিষয় এ রকম—তিনি কারাবাসে আছেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখতে পান, সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ বুকের ওপর নিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। স্বপ্নে দেখতে পান, তিনি এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে আছেন। সেখানে আশপাশে আর কাউকে তিনি দেখতে পেলেন না। কবিতার শুরুর অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি—‘পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে/আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিল সত্যিকার ঘুম/কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখুনি/সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো, যার ফাঁক দিয়ে/যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বলো, স্বপ্ন।’

স্বপ্নলোকে তিনি যা দেখেছেন, সেই আবহ একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প পরবর্তী অবস্থা। একটি কামান দাঁড়িয়ে আছে। আদালতের অবস্থাও শোচনীয়। কারাগার ভূমির সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি তাঁর বাড়িরও খবর নিয়ে দেখেন, কেউ বেঁচে নেই। আবহটা যেন কিয়ামতের মতো।

আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘ইটের নিচে চাপাপড়া আমার কক্ষের দিকে চোখ পড়তেই/দেখলাম, সুটকেস, পোশাক-আশাক বইপত্র/সবকিছু ঢাকা পড়ে আছে। কোনো কিছুই উদ্ধারের আশা নেই।/আমি শুধু বিছানার ওপর পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি দেখলাম—/কোরান, খোলা, বাতাসে পবিত্র পৃষ্ঠাগুলো নড়ছে।/আমি জনমানবহীন বিরান নগরীর পরিত্যক্ত পাথরে/আল্লাহর আদেশ পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি/ধ্বসংস্তূপের ওপর থেকে সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম।’

‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতাটি সুগঠিত কাহিনির ওপর দণ্ডায়মান নয়। আবার এই কবিতায় কোনো কাহিনি নেই এমনও নয়। ভাব-বস্তু-কাহিনির অনন্য রসায়ন হয়ে উঠেছে কবিতাটি। কবিতাটির নির্মিতি কিছুটা স্বতন্ত্র। বাস্তব-স্বপ্ন-কবির চিন্তাজগতের পরিবর্তনসূত্র—সবকিছু এক হয়ে যাওয়া বিষয়ের উপস্থাপনকৌশলও বিষয়ানুগ হয়েছে। কোনো বক্তব্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে উপস্থাপন না করে সেই বক্তব্য কবিতাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। কবিতাকে কেউ যদি শুধু একটি স্বপ্ন হিসেবে দেখতে চান, তাতেও ভুল হতো না যদি তাঁর জীবনদর্শনে পরিবর্তন না আসত। এই কবিতার নির্মিতি অর্থাৎ শিল্পমান পাঠকভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কবিতার ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কবির ভাবকাঠামো যে শব্দগত রূপ পেয়েছে, তার আঙ্গিকগঠন কবিতাশিল্পের অনন্যতাস্পর্শী।

কবি আল মাহমুদ মনে করেন, কবিতার প্রাসঙ্গিকতা সব সময় এক না-ও হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য তাঁর কবিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থে তিনি এই বিষয়ের ওপরও আলোকপাত করেছেন। সেখানে সংস্কৃত সাহিত্যের আলোচনাও আছে। কাব্যের প্রাসঙ্গিকতা সব সময় বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা দূরবিস্তৃত হবে। কবিতাটির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ বিযুক্ত; তাই কবিতার শিল্পবিচার ছাড়াও এক শ্রেণির পাঠকের কাছে এর মর্যাদা অটুট থাকতে পারে। তবে আল মাহমুদের কবিতায় বিষয়গত কবিদর্শন বদলে যে শাস্ত্রীয় আবহ লাভ করেছে, এই উদ্ভাসন কারো কাছে ইতিবাচক, কারো কাছে নেতিবাচক। সময়ান্তরে কবির বদলে যাওয়ার মূল্যায়ন বদলাতে থাকবে।

কবি আল মাহমুদের ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতার উপজীব্য, নির্মাণশৈলী, প্রসঙ্গিকতা তাঁর কাব্যদর্শনের বাইরেও মূল্যায়িত হচ্ছে, হবে। কবিতাটি তাঁর বাঁক পরিবর্তনের দলিল হিসেবে বিবেচ্য। একক কবিতা হিসেবে এটি গভীরতা ও বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ।

কবির জন্মস্মরণে এই ভাষিক নিবেদন।

আল মাহমুদ। জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬। মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

খোঁপায় নজর

নিলয় রফিক

খোঁপায় নজর

আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির

তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর

ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর

পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর

 

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই

ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

রবিশস্যের দিনে

মুজিব ইরম

রবিশস্যের দিনে

মানুষ গোলাপ গ্রামে যাবে

চা-বাগানে যাবে

যাবে শাপলা বিলে

লালপদ্ম ঝিলে

শিমুল বাগানে

লালা খালে

সাদা পাথরের জলে

রাতারগুলে

জলে-স্থলে

পাহাড়ে পাহাড়ে

 

কোথাও যাব না আর

আলুক্ষেতে বসে বসে বিকাল দেখিব

সূর্য নামিবে ধীরে

কাঁধে তুমি রাখিবে তোমার কাঁধ

মরমিয়া খোঁপা যেন ভেঙে ভেঙে পড়ে

 

পৃথিবীতে ঘুরেফিরে আসে যেন এই শীতকাল

তুমি আমি দোঁহে মিলে

দেখিব আনাজ ফুলে নামিছে বিকাল।