গাছদের কান্না শুনে
বৃষ্টি চেয়েছি
শিশুর জন্য দুধ চেয়েছি
ঈশ্বরের বরাদ্দ থেকে
পাখির জন্য গান
আমার জন্য চেয়েছি
কেবল
এক চোখ ভালোবাসা...

গাছদের কান্না শুনে
বৃষ্টি চেয়েছি
শিশুর জন্য দুধ চেয়েছি
ঈশ্বরের বরাদ্দ থেকে
পাখির জন্য গান
আমার জন্য চেয়েছি
কেবল
এক চোখ ভালোবাসা...

আড্রিয়াটিক সাগরের নোনা হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল
আমার পোড়-খাওয়া মুখ, ভাঁজ-পড়া মুখাবয়ব যেন
ইতালিয়ান উপদ্বীপ আর বলকান উপদ্বীপের পৃথককরণ।
যেহেতু আমি জানালার বাইরে পাখিদের দেখছিলাম
উল্টো ঝাঁপ দিতে, যখন তাদের ডানা ঘুরল প্রবালের দিকে,
তখন আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো
ঘুমঘোর চকচকে আভায়—ঠিক যেন তোমার কেকের ওপরের আস্তরণ।
কখনো যেন না বলা হয় যে আমি বরং
হৃদয়-আকৃতির তীরন্দাজের বোর্ডে তীর ছুড়তে চাই
বা কোনো গুহায় বহুভাষিক শ্লেষ রচনা করতে চাই।
আমি চাই, আমি আকুল হয়ে চাই রূপান্তরকারী ভালোবাসা।
যত নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায় জল, মুখ চায় রুটি।
কিন্তু আমি ভয় পাই আরো শীতল রূপান্তরগুলোকে
যারা অপেক্ষায় পড়ে থাকে এবং হুমকি দেয়
মধুর চাঁদকে গুড়ের পুকুরে পরিণত করার।
প্রশস্ত সম্মুখের বারান্দাকে সংকীর্ণ পেছনের বাগানে
আর বন্ধুত্বের শক্ত বলয়গুলোকে ভঙ্গুর জিনিসে পরিণত করার—
যা ভেঙে পড়ে সোনার আংটি যখন উজ্জ্বল ইঙ্গিত দেয় :
‘তাড়াতাড়ি চলে যাও, বাড়ি যাও, এক হয়ে যাও সেই একজনের সঙ্গে’
তখন আড্রিয়াটিক সাগর আর সাগর থাকে না
ইতালিয়ান উপদ্বীপ আর বলকান উপদ্বীপ এক হয়ে যায়।

কালো জামের মতো অন্ধকার ঘর। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলেন ইশতিয়াক আহমেদ। শরীরটা ভিজে যাচ্ছে ঘামে। সেদিকে খেয়াল নেই। হূিপণ্ডটা ধুপধুপ করছে।
পাশের বেডসুইচে চাপ দিলেন। দেয়ালঘড়িটায় তাকালেন, রাত আড়াইটা। অন্যদিন ঘুম ভাঙলে এই ঘড়িটার টিকটিক আওয়াজ শুনতে পান। আজ পাচ্ছেন না। ঘড়িটা কি নষ্ট! পরখ করতে আরেকবার তাকালেন।
না, ঘড়িটা সচল।
খাট থেকে নেমে হাতঘড়িটার সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিলেন। সময় ঠিক আছে।
তিনি টয়লেটে গেলেন। ফিরে এসে ফ্রিজ খুলে এক বোতল পানি ঢকঢক করে গিললেন।
আবার শুয়ে পড়বেন, নাকি কিছুক্ষণ বসে থাকবেন—ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখ গেল ঘরের অ্যাকোয়ারিয়ামটার দিকে। কয়েকটা গোল্ডফিশ, ভেসে আছে। ইশতিয়াক আহমেদের মনে হলো, রাতের নীরবতা এই মাছগুলোও বোঝে, তারাও হয়তো টের পায় রাত-দিন। তিনি মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন একদৃষ্টে।
প্রায় রাতেই ইশতিয়াক আহমেদ ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে ওঠেন, ধড়ফড় করে জেগে উঠে কাঁপতে থাকেন। কাঁপুনি বন্ধ হলে বাথরুমে যান, ফিরে এসে পানি পান করেন, অ্যাকোয়ারিয়ামটার দিকে চোখ রেখে বসে থাকেন। আজও একই।
কিন্তু কারো সঙ্গে তিনি স্বপ্নটার কথা বলেন না। দ্বিতীয়বার ঘুমানোর আগে রিডিং টেবিলে গাঢ় নীল রঙের একটা ডায়েরিতে শুধু কিছু লেখেন।
২.
ভোর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তার পানি সেকেন্ডেই ইঞ্চি অতিক্রম করছে, যেন ডুবিয়ে দেবে বাসিন্দাদের। চারদিকে স্থবির অবস্থা তৈরি করে বৃষ্টি ঝরছেই। কোনো কোনো বাড়ির ছাদে নবীন-প্রবীণরা বৃষ্টি উপভোগ করতে নেমে পড়েছে এই সকালেই।
বৃষ্টির সৌন্দর্যের সঙ্গে নগরে এও এক সৌন্দর্য। এক ছাদ থেকে আরেক ছাদ, আরেক ছাদ থেকে আরেক ছাদে, পিচের রাস্তায় কেউ কেউ ভিজে যাচ্ছে নিবিড় মনে, কেউ যেন বছরের ক্লান্তি ধুয়ে নিচ্ছে বারিফোঁটায়; যেন বুকের ভেতর জমা ময়লা ঝেড়ে ফেলছে একেবারে, যেন শুষে নিচ্ছে আরেকটু সতেজ থাকার প্রাণশক্তি। একই সঙ্গে গাছগাছালির পাতারাও ধুয়ে চকচক করে ওঠে। ফুটে ওঠে মৌলিক সুন্দর।
ইশতিয়াক আহমেদ জানালা দিয়ে দেখছেন এসব দৃশ্য। তিনি কি বৃষ্টিতে ভিজতে চান? একটা সংশয় তাঁর চোখে-মুখে ঝুলছে। গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দেন শূন্যে। মুহূর্তে ভিজে যায় বৃষ্টির ফোঁটায়। টেনে এনে দেখেন ভেজা হাতটা। হাতের জল মুখমণ্ডলে মাখেন।
একটা অতীত এসে ভিড় করে তাঁর নির্জন ফ্ল্যাটে। সেই মক্তব, সেই স্কুল, কলেজ...
এমন দিনে ছুটির ঘণ্টা পড়তেই হৈহৈ করে ছুট। কত খেলা—ফুটবল, ডাংগুলি, পুকুরে সাঁতার—কী রঙিন ছিল দিনগুলি; নির্ভার, নির্মেদ, ভাবনাহীন। ইশতিয়াক আহমেদ মৃদুস্বরে পাঠ করেন তাঁর প্রিয় বর্ষার একটি কবিতা—
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায়—
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।...’
বৃষ্টি থামার নামগন্ধ নেই। ছাতা একটা ছিল, আগের সপ্তাহে বাসায় ফেরার পথে খোয়া গেছে। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন ‘পরের সপ্তাহে কিনে নেব’ বলে। কেনা হয়নি।
ছাদে গেলে কেমন হয়?
মন্দ হয় না, কিন্তু এ বেলায় বৃষ্টিতে ভিজে সর্দি লাগবে না তো!
লাগলেই বা কি, না-ও লাগতে পারে।
লাগতেও পারে।
এত ভেবে কি বৃষ্টিতে ভেজা যায়?
যায় না, বয়স বলে কথা আছে যে।
ভীতুরা সব সময়ই বিকল্প খোঁজে। যদি, বা, কিন্তু ইত্যাদি। সাহসীরা নেমে পড়ে।
ভিজেই বা কী হবে।
না ভিজেই বা কী হবে শুনি?
তাতেও কিছু হবে না।
নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বলতে ইশতিয়াক আহমেদ ঘরের দরজাটা খুলে বেরিয়ে পড়েন। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান অ্যাপার্টমেন্টের টপ ছাদে। দুই হাত উড়ন্ত পাখির ডানার মতো প্রসারিত করেন, মুখ আকাশের দিকে তুলে চরকি ঘোরার মতো ঘুরে ঘুরে চারপাশ ঝাপসা করে বইতে থাকা বৃষ্টিতে আবারও পাঠ করতে থাকেন—
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।...’
এক হাতে শার্টের বোতামগুলো খোলেন, শার্টটা ছুড়ে দেন হাওয়ায়, তারপর গেঞ্জিটা খুলে উড়িয়ে দেন।
বৃষ্টির নিচে ইশতিয়াক আহমেদ নিজেকে আবিষ্কার করতে থাকেন আরেক ইশতিয়াক রূপে; সেখানে নিজেকে মানুষ মনে হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনে হয় না, কারো পিতা, কারো প্রিয়তম, কারো স্বজন মনে হয় না; নিজেকে নিজও মনে হয় না। একটা হামিংবার্ড মনে হয়। আহ! কত দিন পর এমন বৃষ্টিতে ভেজা, এমন আকাশ দেখা, এমন করে নিজেকে দেখা! তিনি ঝরঝর করে কাঁদেন। তিনি ঘোরেন। ঘুরতে থাকেন দুই হাত ছড়িয়ে।
এখানে একটা দালানের সঙ্গে আরেকটা দালান দূরত্বহীন। পা বাড়ালেই এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে যাওয়া যায়। পাশের ছাদ থেকে একজন চিৎকার করে ডাকেন, ‘এই যে অধ্যাপক সাহেব, এত ওপরে উঠেছেন কেন! বৃষ্টির দিনে টপ ছাদে প্রচুর শেওলা জমে থাকে, জানেন না? নেমে আসুন এক্ষুনি। পা পিছলে গেলেই...।
৩.
‘আপনার নাম ঐশিকা?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী জানেন আপনি?’
‘তেমন কিছুই না, যতটুকু জানি, তা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত না।’
‘যা জানেন বলুন, বিষয়টি সুরাহার জন্য দরকার। প্রিয় ছাত্রী হিসেবে আপনার নাম জেনেছি। আপনাকে তিনি স্নেহ করতেন, অথবা...।’
‘স্নেহই করতেন।’
‘আর?’
‘আর যতটুকু তা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সুসম্পর্কের অধিক নয়।’
‘সেটুকুই প্লিজ।’
‘স্যার নিঃসঙ্গ জীবনের এক ফেরিওয়ালা ছিলেন। দীর্ঘদিন কারো সঙ্গে মিশতেন না। সভা-সেমিনারে যেতেন না। মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতেন। গ্রন্থ লিখতেন, কোনো সময় নিরুদ্দেশ।
ক্লাসে যখন পড়াতেন, কোমল কণ্ঠে—বুঝিয়ে বুঝিয়ে পড়াতেন। প্রচুর হাসতেন তখন সবার সঙ্গে। বোঝাই যেত না—উনারই মধ্যে আরেকটা উনি আছেন। আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন—ঐশিকা, গণিতের হিসাবটা যদি তুমি বোঝো, এবং বোঝো যে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই, তখন যদি অঙ্কগুলোর কোনো একটি তোমার সঙ্গে বিট্রে করে বসে, তখন বেঁচে থাকার বাতিঘরটা প্রচ্ছন্ন ফাঁদ ছাড়া কিছুই মনে হয় না; জীবনকে মনে হয় কাঁটাতার; লাগামহীন যন্ত্রণা ছাড়া কিছু থাকে না সেখানে।
স্যারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায় ধীরে ধীরে। বন্ধুত্বটা সম-অসমর ঊর্ধ্বে, বন্ধুত্বই। আমি কোনো কোনো ছুটির দিন স্যারের বাসায় আসতাম।’
‘বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে?’
‘না, স্যারের ফ্ল্যাটে। আমি এলে তিনি খুশি হতেন। একটানা ৮-৯ ঘণ্টা কথা বলতেন। আমি শুনতাম। চা করে দিতাম, রান্না করতাম, বাইরে ঘুরতে যেতাম। স্যারের একটা অন্য জীবন ছিল।’
‘যেমন?’
‘এটি তাঁর একান্ত জীবন।’
‘আমরা এমন কিছুই জানতে চাই, যা অন্যরা জানে না, যা উনার এই পরিণতির জন্য দায়ীও হতে পারে।’
‘অসম্ভব সুখের সংসার ছিল স্যারের। নিজের শিক্ষকতার চাকরি, শিক্ষক স্ত্রী, ফুটফুটে দুই সন্তান; যে দেখত সেই মুগ্ধ হতো। স্যার যেন দেব, স্ত্রী যেন দেবী, সন্তান যেন অলৌকিক দূত।’
‘এরপর?’
‘স্যারের স্ত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। সঙ্গে নিয়ে যান দুই সন্তান। বছর কয়েকে উচ্চশিক্ষা শেষ হয়; স্ত্রী ফেরেন না। স্যার অপেক্ষা করেন। স্ত্রী আজ আসব, কাল আসব বলে সময় পার করেন। তারপর আর ফিরবেন না জানিয়ে যোগাযোগ অনিয়মিত করে দেন। ভাঙতে থাকে বিশ্বাস, বাড়তে থাকে দুজনের দূরত্ব, দূরত্ব দীর্ঘ হলে বিচ্ছেদের ঘণ্টা বাজে। একদিন স্যার জানতে পারেন—যেখানে স্ত্রী পড়তে যান, সেখানে পিএইচডিরত স্যারেরই জুনিয়র সহকর্মীর সঙ্গে লিভ টুগেদারে উনার স্ত্রী। তিনি দিক হারান। স্ত্রী-সন্তান করে করে মুষড়ে যান। এরপর তিনি হয়ে যান একার ভেতরে একটা মমি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন, ক্লাস নিতেন, বেরিয়ে যেতেন। অ্যালকোহলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।’
‘আপনাকে তিনি পছন্দ করতেন?’
‘জানি না।’
‘আপনি করতেন?’
‘হয়তো করতাম, হয়তো না। হয়তো তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’
‘আর কিছু জানা আছে?’
‘একটি দুঃস্বপ্নের কথা বলতেন, আবার বলতেনও না। তাঁর টেবিলে একটা নীল ডায়েরিতে আমি কিছু লেখা দেখেছি। কিছু পাতা লুকিয়ে পড়েছিও।’
‘তিনি বেঁচে থাকলে আপনাকে বিয়ে করতেন?’
‘মনে হয় না, আবার চাইতেও পারতেন।’
‘আপনি করতেন?’
‘সময় বয়ে যায়নি কি?’
‘তবু?’
‘নীল ডায়েরিটা পাওয়ার পর আমি তাঁর সঙ্গেই থাকতাম, শুধু এর আগের দিন এক দিনের জন্য ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম, ফিরে আসতে চেয়েও পারিনি।’
৪.
চার দিন পার হলো। কেউ আসেনি। কয়েকজন ছাত্র ফ্রিজিং ভ্যানে স্যারকে নিয়ে চলল স্থায়ী ঠিকানার দিকে। তখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। আমার পাশে বিধিতা, অরুণিমা, বৃষ্টি আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমার সামনে অবারিত এক প্রান্তর, ছাইরঙা; তার মধ্যে ভেসে আছে স্যারের মুখটা—ভাঙা, মলিন কিন্তু ঈষৎ হাসির চিত্রে ভাস্বর, যেমনটি দেখেছিলাম শেষবার মিলনের পূর্বমুহূর্তে।

‘চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর জন্য বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—/ নবজাতকের কাছে এ আমার অঙ্গীকার।’—এই প্রত্যয় মনে আর মননে নিয়ে কবি সুকন্ত ভট্টাচার্য চলতে শুরু করেছিলেন জীবনের অলিগলিতে। প্রকৃতি তাঁকে সেই পথচলায় বিস্তর সময় দেয়নি। তিনি যেটুকু সময় পেয়েছেন তার কোনো অপচয় করেননি। শিশুর কাছে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথই ছিল তাঁর অভীষ্ট।
১৯২৬ সালে জন্মেছেন, প্রয়াত হয়েছেন ১৯৪৭ সালে। ২১ বছর বয়স কার্যত অমর কাব্য লেখার বয়স নয়। এই বয়স পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে পরিণত হওয়ার বয়স, নিজেকে প্রস্তুত করার বয়স। এই প্রস্তুতির কালে তিনি এমন এক শিল্পীজীবন সৃষ্টি করেছেন যে তাঁকে আর বয়সের ফ্রেমে না বেঁধে সৃষ্টির গভীরতায় বিচার করতে হয়। সেই বিচারে সুকান্ত ভট্টাচার্য বিস্ময়কর সৃষ্টি বলেই বিবেচিত হন।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখেছেন ব্রিটিশ উপনিবেশ কিভাবে নির্মমভাবে জেঁকে বসেছিল। চোখের সামনে ঘটে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মার্ক্সবাদী চিন্তায় যখন অনেকে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন, ঠিক একই সময়ে দেখেছেন বিশ্বের চরমতম নির্মমতা—পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ। বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবক্ষয় চরমে পৌঁছেছিল। মন্বন্তরের ঘোরতর ছোবলে বিপর্যস্ত জনজীবন। পরমতম সংবেদনশীলতার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য মার্ক্সবাদী দর্শন মননে ধারণ করে দেখেছেন সমাজের অবনমন। হতাশার মোড়কে নিজেকে বন্দি না করে দুচোখে সাহস বুনেছেন। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় সমাজের বীভৎস চেহারার কথা তুলে এনে পরিণতিতে লিখেছেন—“তাই আজ আমারো বিশ্বাস,/‘শান্তির বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।’/তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,/দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।”
সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যে স্বল্পকালে নিজের অস্তিত্ব সুগভীর পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি স্বল্পায়তনের। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি কালিক পরিসর ডিঙিয়ে ঔজ্জ্বল্য বিস্তার করে চলছে। তাঁর কবিতার রূপক-ইঙ্গিত-প্রতীকের ব্যবহার কবিতার অর্থব্যঞ্জনাকে দান করেছে বহুমাত্রিকতা। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য, উপজীব্য সম্পর্কে ধারণা লাভের পথ তিনি নিজেই সহজীকরণ করে গেছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্য পাঠকের কাছে পৌঁছেছেন তাঁর সৃষ্টির পথ ধরে। আঙ্গিকের পরিবর্তে তিনি কবিতার বিষয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শব্দের বুননে কবিতালয় নির্মাণ করেছেন। সময়সচেতন ছিলেন তিনি। রাজনীতির ব্যূহ ভেদ করার কাজও করেছেন। অঞ্চল-দেশ থেকে তিনি বিশ্বপরিসরের নানা বিষয়কে কবিতায় ধারণ করার চেষ্টা করে গেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যেও সমৃদ্ধ তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় লেনিন উঠে এসেছেন দারুণভাবে। একটি কবিতার নাম ‘লেনিন’। এখানে তিনি লিখেছেন—‘লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,/অন্যায়ের মুখামুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।/আজকেও রুশিয়ার গ্রামে ও নগরে/ হাজার লেনিন যুদ্ধ করে, মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে।’ এই কবিতায় ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, চীন, ভারতবর্ষের কথাও বলা হয়েছে। ‘সযত্ন মুখোশধারী ধনিকেরও বন্ধ আস্ফাালন’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বজুড়ে লেনিনের জয় ঘোষিত হবে—এমনটাই কবিস্বপ্ন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় মানুষ কখনো সিগারেটের নাম ধরে এসেছে, কখনো দেশলাইয়ের কাঠি হয়ে, কখনো বা বৃক্ষের বেশে। মানুষের নিজস্ব বেশ তো রয়েছেই। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় কবির যে প্রস্তুতি তা হলো, মানুষের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করা। তাঁর কবিতার অন্দরমহল তাই মানুষের পক্ষে, বিশেষত যে মানুষ অধিকারবঞ্চিত, নিষ্পেষিত। অট্টালিকার সর্বত্রই যাদের ত্যাগ, শ্রম আর অশ্রু লেগে আছে, তারা সেই অট্টালিকার কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারে না। কবি সুকান্ত ভট্টচার্যের কবিতার ব্রত হচ্ছে ত্যাগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
‘আগামী’ কবিতায়ও কবি সমাজবদলের গান গেয়েছেন। নিজেকে ক্ষুদ্র অঙ্কুরিত বীজ বলে উল্লেখ করলেও অদম্য সাহসের চিত্র এখানে দেখা দেয়। কবির আহ্বানে বদলে যাবে মানুষ। বদলে যাবে সমাজ। তিনি লিখেছেন—‘সংহত কঠিন ঝড়ে দৃঢ়প্রাণ প্রত্যেক শিকড়;/শাখায় শাখায় বাঁধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়;/অঙ্কুরিত বন্ধু যত মাথা তুলে আমারই আহ্বানে/জানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।’ ‘চারাগাছ’ কবিতায় একই বিষয়ের বিস্তার। ভাঙা কুঁড়েঘরে থেকে পাশের এক অট্টালিকার দেয়ালে ছোট অশ্বত্থ চারা কবির কাছে প্রতীকী চারা হয়ে ওঠে। ভবন হয়ে ওঠে বিত্তশালীর প্রতীক। সামান্য চারা একদিন বৃহৎ বৃক্ষ হয়ে উঠবে। ছোট প্রাণ চারাগাছ যেন পুঁজিবাদ ভেঙে মার্ক্সবাদ গড়ে তোলার ভবিষ্যেক নির্দেশ করে। এই কবিতায় কবি লিখেছেন—‘তাইতো অবাক আমি দেখি যত অশ্বত্থ চারায়/ গোপনে বিদ্রোহ জমে, জমে দেহে শক্তির বারুদ;/প্রাসাদ-বিদীর্ণ-করা বন্যা আসে শিকড়ে শিকড়ে।’ সমাজের অস্থির রূপ ফুটে ওঠে ‘খবর’ কবিতার একটি চরণেই—‘যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ঝড়—’। সুকান্ত ভট্টাচার্য নিরবচ্ছিন্ন সমাজের দগদগে ক্ষতকেই তুলে আনতে চেয়েছেন আশাবাদিতায়।
‘সিগারেট’ কবিতায় কবি প্রতিবাদের সুরে প্রতিশোধলিপি এঁকেছেন। শোষকদের অসতর্ক মুহূর্তে সিগারেটের আগুন হয়ে সমস্তকে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা ঘোষিত হয়েছে। শোষকদের যেভাবে যন্ত্রণা দিয়েছে শোষকরা, শোষকদেরও সেই যন্ত্রণাই ভোগ করতে হবে। ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতাও অনুরূপ প্রতিবাদ-প্রতিশোধ ঘোষিত কবিতা। ‘বিবৃতি’ কবিতায় তিনি নিরন্ন, অসহায় মানুষের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন—‘আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,/জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,/দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,/প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।’
রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের জয় সূচিত হওয়ার পরপরই বিশ্বব্যাপী মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, বিশ্বে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের ধারা সূচিত হবে। মার্ক্সবাদের ঢেউ লেগেছিল বাংলাদেশেও। সাংগঠনিক কার্যক্রমও বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছিল। এখানকার লেখক-শিল্পীদের মধ্যে এই চেতনা পরিবর্তনের সুর নিয়ে এসেছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই স্বপ্ন ফেরি করেছেন।
‘ছাড়পত্র’ কবিতা পুরনো পৃথিবী ভেঙে নতুন পৃথিবী গড়ার আহবান। ‘দেশলাই কাঠি’, ‘সিগারেট’ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার কবিতা। ‘প্রিয়তমাসু’ নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার আখ্যান। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বিষয়গত ঐক্য ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হয়। কবিতার নাম, শব্দ, গঠন ভিন্ন ভিন্ন হলেও অভীষ্ট অনেকটাই অভিন্ন। একের পর এক কবিতা পড়তে থাকলে কবিতার ভেতরের বারুদ উপলব্ধি করা যায়। শাণিত কবিতায় তিনি পৃথিবী বদলে দেওয়ার আহবান নিয়ে এসেছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘প্রার্থী’ কবিতায় আপাতদৃষ্টিতে ‘আর উত্তাপ দিও/রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।’ এটাই মূল সুর মনে হলেও কবি এমন আলো চেয়েছেন, যাতে প্রত্যেকে একেকটি ‘জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে’ পরিণত হতে পারে। ‘একটি মোরগের কাহিনী’ কবিতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে দুই শ্রেণির মানুষ—শোষক আর শোষিত। এই সুরই বেজে উঠেছে ‘সিঁড়ি’ কবিতায়। এখানে শোষিত শ্রেণিকে দেখানো হয়েছে সিঁড়ি হিসেবে। শোষকরা যেন সিঁড়ির মতোই শোষিতদের মাড়িয়ে চলে যায়। এই কবিতাও নিছক করুণ আখ্যান নয়; এখানে আছে প্রতিবাদলিপি। ‘আগ্নেয়গিরি’ কবিতায়—‘মিথ্যার ভিতে কল্পনার মশলায় গড়া তোমাদের শহর’ উল্লেখ করার ভেতর দিয়ে তথাকথিত সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করেছেন কবি। সেই ব্যঙ্গচিত্র ফুটে উঠেছে ‘কলম’ কবিতায়ও। ‘ঠিকানা’ কবিতায় নিজের ঠিকানা এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে গোটা দেশে যেখানেই বঞ্চনা, সেটাই তাঁর ঠিকানা। শুধু তা-ই নয়, তিনি যেন ভৌগোলিক সীমায় বন্দি নন। তাঁর ঠিকানা শুধু ভারতবর্ষ নয়। তিনি লিখেছেন—‘ইন্দোয়েশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,/রুশ ও চীনের কাছে, আমার ঠিকানা বহুকাল ধ’রে/জেনো গচ্ছিত আছে।’
‘উদ্বীক্ষণ’ কবিতায় সমাজের করুণ চিত্রের সন্ধান মেলে—‘নগরে ও গ্রামে জমেছে ভিড়/ভগ্ননীড়/ক্ষুধিত জনতা আজ নিবিড়।’ ‘বিদ্রোহের গান’ কবিতায় কবি বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন—‘বেজে উঠল কি সমরে ঘড়ি?/এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি,/আমরা সবাই যে যার প্রহরী/ উঠুক ডাক।’ ‘আমরা এসেছি’ কবিতায় মিছিলের ঝনঝনানি শোনা যায়।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতায় অবস্থান নিয়েছেন শোষিত শ্রেণির পক্ষে। তাঁর কাছে শোষিত মানুষের মুক্তি মিলবে মার্ক্সবাদ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে। তাঁর জন্মের শতবর্ষ পরে এসে আমরা দেখি, যে দুটি শ্রেণির মানুষের মধ্যে ব্যবধানের কথা বলেছেন, সেই ব্যবধান শুধু বেড়েই চলছে। পুঁজিবাদের বিস্তার এখন চরম পর্যায়ে। অন্যদিকে মার্ক্সবাদের যে যাত্রা এখানেও শুরু হয়েছিল, সেই যাত্রাও থমকে গেছে, ম্রিয়মাণ হয়েছে। তাই বলে শ্রমজীবী তার অধিকার পেয়েছে তা নয়। ফলে সুকান্ত ভট্টাচার্য শ্রমজীবীদের পক্ষে নিজের যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার প্রাসঙ্গিকতা আজও অমলিন। কোন পথে উল্লিখিত শ্রেণিবৈষম্য কমবে, শ্রমজীবী তার অধিকার ফিরে পাবে, সেটি মার্ক্সবাদের নিরিখে হবে, নাকি অন্য কোনো পথে তা জানা না থাকলেও যাদের পক্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য লড়ে গেছেন, তাদের মুক্তি আজও হয়নি। তাদের অধিকার তথা তাদের মুক্তির লড়াই জারি থাকতে হবে—রাজপথ থেকে শিল্প-সাহিত্যের আঙিনায়।
কবি লিখেছেন—‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—/কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,/ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময় :/পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি।’ ২০২৬ সালে এসেও অনাহারী-ক্ষুধিত মানুষের কাছে পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে হবে, কবিতার স্নিগ্ধতা টানবে না। ‘দুর্মর’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘দেশলাইয়ের কাঠি’, ‘ছাড়পত্র’, ‘সিগারেট’, ‘প্রার্থী’, ‘রানার’সহ বেশ কিছু কবিতার ভেতর দিয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যকে আমরা যেটুকু চিনি, তিনি তাঁর অপরাপর কবিতার মধ্যেও একই সুর-গন্ধবেষ্টিত আবহ সৃষ্টি করেছেন। এসব কবিতাকে আশ্রয় করে সামান্যের ভেতর দিয়ে যে অসামান্য উপলব্ধি হয়, সেটাই সুকান্ত ভট্টাচার্য। জন্মশতবর্ষে কালোত্তীর্ণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতি বিনম্র প্রণতি।