কালো জামের মতো অন্ধকার ঘর। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলেন ইশতিয়াক আহমেদ। শরীরটা ভিজে যাচ্ছে ঘামে। সেদিকে খেয়াল নেই। হূিপণ্ডটা ধুপধুপ করছে।
পাশের বেডসুইচে চাপ দিলেন। দেয়ালঘড়িটায় তাকালেন, রাত আড়াইটা। অন্যদিন ঘুম ভাঙলে এই ঘড়িটার টিকটিক আওয়াজ শুনতে পান। আজ পাচ্ছেন না। ঘড়িটা কি নষ্ট! পরখ করতে আরেকবার তাকালেন।
না, ঘড়িটা সচল।
খাট থেকে নেমে হাতঘড়িটার সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিলেন। সময় ঠিক আছে।
তিনি টয়লেটে গেলেন। ফিরে এসে ফ্রিজ খুলে এক বোতল পানি ঢকঢক করে গিললেন।
আবার শুয়ে পড়বেন, নাকি কিছুক্ষণ বসে থাকবেন—ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখ গেল ঘরের অ্যাকোয়ারিয়ামটার দিকে। কয়েকটা গোল্ডফিশ, ভেসে আছে। ইশতিয়াক আহমেদের মনে হলো, রাতের নীরবতা এই মাছগুলোও বোঝে, তারাও হয়তো টের পায় রাত-দিন। তিনি মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন একদৃষ্টে।
প্রায় রাতেই ইশতিয়াক আহমেদ ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে ওঠেন, ধড়ফড় করে জেগে উঠে কাঁপতে থাকেন। কাঁপুনি বন্ধ হলে বাথরুমে যান, ফিরে এসে পানি পান করেন, অ্যাকোয়ারিয়ামটার দিকে চোখ রেখে বসে থাকেন। আজও একই।
কিন্তু কারো সঙ্গে তিনি স্বপ্নটার কথা বলেন না। দ্বিতীয়বার ঘুমানোর আগে রিডিং টেবিলে গাঢ় নীল রঙের একটা ডায়েরিতে শুধু কিছু লেখেন।
২.
ভোর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তার পানি সেকেন্ডেই ইঞ্চি অতিক্রম করছে, যেন ডুবিয়ে দেবে বাসিন্দাদের। চারদিকে স্থবির অবস্থা তৈরি করে বৃষ্টি ঝরছেই। কোনো কোনো বাড়ির ছাদে নবীন-প্রবীণরা বৃষ্টি উপভোগ করতে নেমে পড়েছে এই সকালেই।
বৃষ্টির সৌন্দর্যের সঙ্গে নগরে এও এক সৌন্দর্য। এক ছাদ থেকে আরেক ছাদ, আরেক ছাদ থেকে আরেক ছাদে, পিচের রাস্তায় কেউ কেউ ভিজে যাচ্ছে নিবিড় মনে, কেউ যেন বছরের ক্লান্তি ধুয়ে নিচ্ছে বারিফোঁটায়; যেন বুকের ভেতর জমা ময়লা ঝেড়ে ফেলছে একেবারে, যেন শুষে নিচ্ছে আরেকটু সতেজ থাকার প্রাণশক্তি। একই সঙ্গে গাছগাছালির পাতারাও ধুয়ে চকচক করে ওঠে। ফুটে ওঠে মৌলিক সুন্দর।
ইশতিয়াক আহমেদ জানালা দিয়ে দেখছেন এসব দৃশ্য। তিনি কি বৃষ্টিতে ভিজতে চান? একটা সংশয় তাঁর চোখে-মুখে ঝুলছে। গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দেন শূন্যে। মুহূর্তে ভিজে যায় বৃষ্টির ফোঁটায়। টেনে এনে দেখেন ভেজা হাতটা। হাতের জল মুখমণ্ডলে মাখেন।
একটা অতীত এসে ভিড় করে তাঁর নির্জন ফ্ল্যাটে। সেই মক্তব, সেই স্কুল, কলেজ...
এমন দিনে ছুটির ঘণ্টা পড়তেই হৈহৈ করে ছুট। কত খেলা—ফুটবল, ডাংগুলি, পুকুরে সাঁতার—কী রঙিন ছিল দিনগুলি; নির্ভার, নির্মেদ, ভাবনাহীন। ইশতিয়াক আহমেদ মৃদুস্বরে পাঠ করেন তাঁর প্রিয় বর্ষার একটি কবিতা—
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায়—
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।...’
বৃষ্টি থামার নামগন্ধ নেই। ছাতা একটা ছিল, আগের সপ্তাহে বাসায় ফেরার পথে খোয়া গেছে। তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন ‘পরের সপ্তাহে কিনে নেব’ বলে। কেনা হয়নি।
ছাদে গেলে কেমন হয়?
মন্দ হয় না, কিন্তু এ বেলায় বৃষ্টিতে ভিজে সর্দি লাগবে না তো!
লাগলেই বা কি, না-ও লাগতে পারে।
লাগতেও পারে।
এত ভেবে কি বৃষ্টিতে ভেজা যায়?
যায় না, বয়স বলে কথা আছে যে।
ভীতুরা সব সময়ই বিকল্প খোঁজে। যদি, বা, কিন্তু ইত্যাদি। সাহসীরা নেমে পড়ে।
ভিজেই বা কী হবে।
না ভিজেই বা কী হবে শুনি?
তাতেও কিছু হবে না।
নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বলতে ইশতিয়াক আহমেদ ঘরের দরজাটা খুলে বেরিয়ে পড়েন। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান অ্যাপার্টমেন্টের টপ ছাদে। দুই হাত উড়ন্ত পাখির ডানার মতো প্রসারিত করেন, মুখ আকাশের দিকে তুলে চরকি ঘোরার মতো ঘুরে ঘুরে চারপাশ ঝাপসা করে বইতে থাকা বৃষ্টিতে আবারও পাঠ করতে থাকেন—
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।...’
এক হাতে শার্টের বোতামগুলো খোলেন, শার্টটা ছুড়ে দেন হাওয়ায়, তারপর গেঞ্জিটা খুলে উড়িয়ে দেন।
বৃষ্টির নিচে ইশতিয়াক আহমেদ নিজেকে আবিষ্কার করতে থাকেন আরেক ইশতিয়াক রূপে; সেখানে নিজেকে মানুষ মনে হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনে হয় না, কারো পিতা, কারো প্রিয়তম, কারো স্বজন মনে হয় না; নিজেকে নিজও মনে হয় না। একটা হামিংবার্ড মনে হয়। আহ! কত দিন পর এমন বৃষ্টিতে ভেজা, এমন আকাশ দেখা, এমন করে নিজেকে দেখা! তিনি ঝরঝর করে কাঁদেন। তিনি ঘোরেন। ঘুরতে থাকেন দুই হাত ছড়িয়ে।
এখানে একটা দালানের সঙ্গে আরেকটা দালান দূরত্বহীন। পা বাড়ালেই এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে যাওয়া যায়। পাশের ছাদ থেকে একজন চিৎকার করে ডাকেন, ‘এই যে অধ্যাপক সাহেব, এত ওপরে উঠেছেন কেন! বৃষ্টির দিনে টপ ছাদে প্রচুর শেওলা জমে থাকে, জানেন না? নেমে আসুন এক্ষুনি। পা পিছলে গেলেই...।
৩.
‘আপনার নাম ঐশিকা?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী জানেন আপনি?’
‘তেমন কিছুই না, যতটুকু জানি, তা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত না।’
‘যা জানেন বলুন, বিষয়টি সুরাহার জন্য দরকার। প্রিয় ছাত্রী হিসেবে আপনার নাম জেনেছি। আপনাকে তিনি স্নেহ করতেন, অথবা...।’
‘স্নেহই করতেন।’
‘আর?’
‘আর যতটুকু তা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সুসম্পর্কের অধিক নয়।’
‘সেটুকুই প্লিজ।’
‘স্যার নিঃসঙ্গ জীবনের এক ফেরিওয়ালা ছিলেন। দীর্ঘদিন কারো সঙ্গে মিশতেন না। সভা-সেমিনারে যেতেন না। মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতেন। গ্রন্থ লিখতেন, কোনো সময় নিরুদ্দেশ।
ক্লাসে যখন পড়াতেন, কোমল কণ্ঠে—বুঝিয়ে বুঝিয়ে পড়াতেন। প্রচুর হাসতেন তখন সবার সঙ্গে। বোঝাই যেত না—উনারই মধ্যে আরেকটা উনি আছেন। আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন—ঐশিকা, গণিতের হিসাবটা যদি তুমি বোঝো, এবং বোঝো যে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই, তখন যদি অঙ্কগুলোর কোনো একটি তোমার সঙ্গে বিট্রে করে বসে, তখন বেঁচে থাকার বাতিঘরটা প্রচ্ছন্ন ফাঁদ ছাড়া কিছুই মনে হয় না; জীবনকে মনে হয় কাঁটাতার; লাগামহীন যন্ত্রণা ছাড়া কিছু থাকে না সেখানে।
স্যারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায় ধীরে ধীরে। বন্ধুত্বটা সম-অসমর ঊর্ধ্বে, বন্ধুত্বই। আমি কোনো কোনো ছুটির দিন স্যারের বাসায় আসতাম।’
‘বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে?’
‘না, স্যারের ফ্ল্যাটে। আমি এলে তিনি খুশি হতেন। একটানা ৮-৯ ঘণ্টা কথা বলতেন। আমি শুনতাম। চা করে দিতাম, রান্না করতাম, বাইরে ঘুরতে যেতাম। স্যারের একটা অন্য জীবন ছিল।’
‘যেমন?’
‘এটি তাঁর একান্ত জীবন।’
‘আমরা এমন কিছুই জানতে চাই, যা অন্যরা জানে না, যা উনার এই পরিণতির জন্য দায়ীও হতে পারে।’
‘অসম্ভব সুখের সংসার ছিল স্যারের। নিজের শিক্ষকতার চাকরি, শিক্ষক স্ত্রী, ফুটফুটে দুই সন্তান; যে দেখত সেই মুগ্ধ হতো। স্যার যেন দেব, স্ত্রী যেন দেবী, সন্তান যেন অলৌকিক দূত।’
‘এরপর?’
‘স্যারের স্ত্রী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। সঙ্গে নিয়ে যান দুই সন্তান। বছর কয়েকে উচ্চশিক্ষা শেষ হয়; স্ত্রী ফেরেন না। স্যার অপেক্ষা করেন। স্ত্রী আজ আসব, কাল আসব বলে সময় পার করেন। তারপর আর ফিরবেন না জানিয়ে যোগাযোগ অনিয়মিত করে দেন। ভাঙতে থাকে বিশ্বাস, বাড়তে থাকে দুজনের দূরত্ব, দূরত্ব দীর্ঘ হলে বিচ্ছেদের ঘণ্টা বাজে। একদিন স্যার জানতে পারেন—যেখানে স্ত্রী পড়তে যান, সেখানে পিএইচডিরত স্যারেরই জুনিয়র সহকর্মীর সঙ্গে লিভ টুগেদারে উনার স্ত্রী। তিনি দিক হারান। স্ত্রী-সন্তান করে করে মুষড়ে যান। এরপর তিনি হয়ে যান একার ভেতরে একটা মমি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন, ক্লাস নিতেন, বেরিয়ে যেতেন। অ্যালকোহলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।’
‘আপনাকে তিনি পছন্দ করতেন?’
‘জানি না।’
‘আপনি করতেন?’
‘হয়তো করতাম, হয়তো না। হয়তো তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’
‘আর কিছু জানা আছে?’
‘একটি দুঃস্বপ্নের কথা বলতেন, আবার বলতেনও না। তাঁর টেবিলে একটা নীল ডায়েরিতে আমি কিছু লেখা দেখেছি। কিছু পাতা লুকিয়ে পড়েছিও।’
‘তিনি বেঁচে থাকলে আপনাকে বিয়ে করতেন?’
‘মনে হয় না, আবার চাইতেও পারতেন।’
‘আপনি করতেন?’
‘সময় বয়ে যায়নি কি?’
‘তবু?’
‘নীল ডায়েরিটা পাওয়ার পর আমি তাঁর সঙ্গেই থাকতাম, শুধু এর আগের দিন এক দিনের জন্য ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম, ফিরে আসতে চেয়েও পারিনি।’
৪.
চার দিন পার হলো। কেউ আসেনি। কয়েকজন ছাত্র ফ্রিজিং ভ্যানে স্যারকে নিয়ে চলল স্থায়ী ঠিকানার দিকে। তখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। আমার পাশে বিধিতা, অরুণিমা, বৃষ্টি আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমার সামনে অবারিত এক প্রান্তর, ছাইরঙা; তার মধ্যে ভেসে আছে স্যারের মুখটা—ভাঙা, মলিন কিন্তু ঈষৎ হাসির চিত্রে ভাস্বর, যেমনটি দেখেছিলাম শেষবার মিলনের পূর্বমুহূর্তে।