‘চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর জন্য বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—/ নবজাতকের কাছে এ আমার অঙ্গীকার।’—এই প্রত্যয় মনে আর মননে নিয়ে কবি সুকন্ত ভট্টাচার্য চলতে শুরু করেছিলেন জীবনের অলিগলিতে। প্রকৃতি তাঁকে সেই পথচলায় বিস্তর সময় দেয়নি। তিনি যেটুকু সময় পেয়েছেন তার কোনো অপচয় করেননি। শিশুর কাছে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথই ছিল তাঁর অভীষ্ট।
১৯২৬ সালে জন্মেছেন, প্রয়াত হয়েছেন ১৯৪৭ সালে। ২১ বছর বয়স কার্যত অমর কাব্য লেখার বয়স নয়। এই বয়স পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে পরিণত হওয়ার বয়স, নিজেকে প্রস্তুত করার বয়স। এই প্রস্তুতির কালে তিনি এমন এক শিল্পীজীবন সৃষ্টি করেছেন যে তাঁকে আর বয়সের ফ্রেমে না বেঁধে সৃষ্টির গভীরতায় বিচার করতে হয়। সেই বিচারে সুকান্ত ভট্টাচার্য বিস্ময়কর সৃষ্টি বলেই বিবেচিত হন।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখেছেন ব্রিটিশ উপনিবেশ কিভাবে নির্মমভাবে জেঁকে বসেছিল। চোখের সামনে ঘটে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মার্ক্সবাদী চিন্তায় যখন অনেকে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন, ঠিক একই সময়ে দেখেছেন বিশ্বের চরমতম নির্মমতা—পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ। বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবক্ষয় চরমে পৌঁছেছিল। মন্বন্তরের ঘোরতর ছোবলে বিপর্যস্ত জনজীবন। পরমতম সংবেদনশীলতার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য মার্ক্সবাদী দর্শন মননে ধারণ করে দেখেছেন সমাজের অবনমন। হতাশার মোড়কে নিজেকে বন্দি না করে দুচোখে সাহস বুনেছেন। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় সমাজের বীভৎস চেহারার কথা তুলে এনে পরিণতিতে লিখেছেন—“তাই আজ আমারো বিশ্বাস,/‘শান্তির বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।’/তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,/দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।”
সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যে স্বল্পকালে নিজের অস্তিত্ব সুগভীর পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর জীবনের ব্যাপ্তি স্বল্পায়তনের। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি কালিক পরিসর ডিঙিয়ে ঔজ্জ্বল্য বিস্তার করে চলছে। তাঁর কবিতার রূপক-ইঙ্গিত-প্রতীকের ব্যবহার কবিতার অর্থব্যঞ্জনাকে দান করেছে বহুমাত্রিকতা। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য, উপজীব্য সম্পর্কে ধারণা লাভের পথ তিনি নিজেই সহজীকরণ করে গেছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্য পাঠকের কাছে পৌঁছেছেন তাঁর সৃষ্টির পথ ধরে। আঙ্গিকের পরিবর্তে তিনি কবিতার বিষয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শব্দের বুননে কবিতালয় নির্মাণ করেছেন। সময়সচেতন ছিলেন তিনি। রাজনীতির ব্যূহ ভেদ করার কাজও করেছেন। অঞ্চল-দেশ থেকে তিনি বিশ্বপরিসরের নানা বিষয়কে কবিতায় ধারণ করার চেষ্টা করে গেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যেও সমৃদ্ধ তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় লেনিন উঠে এসেছেন দারুণভাবে। একটি কবিতার নাম ‘লেনিন’। এখানে তিনি লিখেছেন—‘লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,/অন্যায়ের মুখামুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।/আজকেও রুশিয়ার গ্রামে ও নগরে/ হাজার লেনিন যুদ্ধ করে, মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে।’ এই কবিতায় ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, চীন, ভারতবর্ষের কথাও বলা হয়েছে। ‘সযত্ন মুখোশধারী ধনিকেরও বন্ধ আস্ফাালন’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বজুড়ে লেনিনের জয় ঘোষিত হবে—এমনটাই কবিস্বপ্ন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় মানুষ কখনো সিগারেটের নাম ধরে এসেছে, কখনো দেশলাইয়ের কাঠি হয়ে, কখনো বা বৃক্ষের বেশে। মানুষের নিজস্ব বেশ তো রয়েছেই। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় কবির যে প্রস্তুতি তা হলো, মানুষের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করা। তাঁর কবিতার অন্দরমহল তাই মানুষের পক্ষে, বিশেষত যে মানুষ অধিকারবঞ্চিত, নিষ্পেষিত। অট্টালিকার সর্বত্রই যাদের ত্যাগ, শ্রম আর অশ্রু লেগে আছে, তারা সেই অট্টালিকার কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারে না। কবি সুকান্ত ভট্টচার্যের কবিতার ব্রত হচ্ছে ত্যাগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
‘আগামী’ কবিতায়ও কবি সমাজবদলের গান গেয়েছেন। নিজেকে ক্ষুদ্র অঙ্কুরিত বীজ বলে উল্লেখ করলেও অদম্য সাহসের চিত্র এখানে দেখা দেয়। কবির আহ্বানে বদলে যাবে মানুষ। বদলে যাবে সমাজ। তিনি লিখেছেন—‘সংহত কঠিন ঝড়ে দৃঢ়প্রাণ প্রত্যেক শিকড়;/শাখায় শাখায় বাঁধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়;/অঙ্কুরিত বন্ধু যত মাথা তুলে আমারই আহ্বানে/জানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।’ ‘চারাগাছ’ কবিতায় একই বিষয়ের বিস্তার। ভাঙা কুঁড়েঘরে থেকে পাশের এক অট্টালিকার দেয়ালে ছোট অশ্বত্থ চারা কবির কাছে প্রতীকী চারা হয়ে ওঠে। ভবন হয়ে ওঠে বিত্তশালীর প্রতীক। সামান্য চারা একদিন বৃহৎ বৃক্ষ হয়ে উঠবে। ছোট প্রাণ চারাগাছ যেন পুঁজিবাদ ভেঙে মার্ক্সবাদ গড়ে তোলার ভবিষ্যেক নির্দেশ করে। এই কবিতায় কবি লিখেছেন—‘তাইতো অবাক আমি দেখি যত অশ্বত্থ চারায়/ গোপনে বিদ্রোহ জমে, জমে দেহে শক্তির বারুদ;/প্রাসাদ-বিদীর্ণ-করা বন্যা আসে শিকড়ে শিকড়ে।’ সমাজের অস্থির রূপ ফুটে ওঠে ‘খবর’ কবিতার একটি চরণেই—‘যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ঝড়—’। সুকান্ত ভট্টাচার্য নিরবচ্ছিন্ন সমাজের দগদগে ক্ষতকেই তুলে আনতে চেয়েছেন আশাবাদিতায়।
‘সিগারেট’ কবিতায় কবি প্রতিবাদের সুরে প্রতিশোধলিপি এঁকেছেন। শোষকদের অসতর্ক মুহূর্তে সিগারেটের আগুন হয়ে সমস্তকে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা ঘোষিত হয়েছে। শোষকদের যেভাবে যন্ত্রণা দিয়েছে শোষকরা, শোষকদেরও সেই যন্ত্রণাই ভোগ করতে হবে। ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতাও অনুরূপ প্রতিবাদ-প্রতিশোধ ঘোষিত কবিতা। ‘বিবৃতি’ কবিতায় তিনি নিরন্ন, অসহায় মানুষের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন—‘আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,/জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,/দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,/প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।’
রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের জয় সূচিত হওয়ার পরপরই বিশ্বব্যাপী মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, বিশ্বে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের ধারা সূচিত হবে। মার্ক্সবাদের ঢেউ লেগেছিল বাংলাদেশেও। সাংগঠনিক কার্যক্রমও বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছিল। এখানকার লেখক-শিল্পীদের মধ্যে এই চেতনা পরিবর্তনের সুর নিয়ে এসেছিল। সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই স্বপ্ন ফেরি করেছেন।
‘ছাড়পত্র’ কবিতা পুরনো পৃথিবী ভেঙে নতুন পৃথিবী গড়ার আহবান। ‘দেশলাই কাঠি’, ‘সিগারেট’ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার কবিতা। ‘প্রিয়তমাসু’ নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার আখ্যান। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বিষয়গত ঐক্য ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হয়। কবিতার নাম, শব্দ, গঠন ভিন্ন ভিন্ন হলেও অভীষ্ট অনেকটাই অভিন্ন। একের পর এক কবিতা পড়তে থাকলে কবিতার ভেতরের বারুদ উপলব্ধি করা যায়। শাণিত কবিতায় তিনি পৃথিবী বদলে দেওয়ার আহবান নিয়ে এসেছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘প্রার্থী’ কবিতায় আপাতদৃষ্টিতে ‘আর উত্তাপ দিও/রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।’ এটাই মূল সুর মনে হলেও কবি এমন আলো চেয়েছেন, যাতে প্রত্যেকে একেকটি ‘জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে’ পরিণত হতে পারে। ‘একটি মোরগের কাহিনী’ কবিতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে দুই শ্রেণির মানুষ—শোষক আর শোষিত। এই সুরই বেজে উঠেছে ‘সিঁড়ি’ কবিতায়। এখানে শোষিত শ্রেণিকে দেখানো হয়েছে সিঁড়ি হিসেবে। শোষকরা যেন সিঁড়ির মতোই শোষিতদের মাড়িয়ে চলে যায়। এই কবিতাও নিছক করুণ আখ্যান নয়; এখানে আছে প্রতিবাদলিপি। ‘আগ্নেয়গিরি’ কবিতায়—‘মিথ্যার ভিতে কল্পনার মশলায় গড়া তোমাদের শহর’ উল্লেখ করার ভেতর দিয়ে তথাকথিত সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করেছেন কবি। সেই ব্যঙ্গচিত্র ফুটে উঠেছে ‘কলম’ কবিতায়ও। ‘ঠিকানা’ কবিতায় নিজের ঠিকানা এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে গোটা দেশে যেখানেই বঞ্চনা, সেটাই তাঁর ঠিকানা। শুধু তা-ই নয়, তিনি যেন ভৌগোলিক সীমায় বন্দি নন। তাঁর ঠিকানা শুধু ভারতবর্ষ নয়। তিনি লিখেছেন—‘ইন্দোয়েশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,/রুশ ও চীনের কাছে, আমার ঠিকানা বহুকাল ধ’রে/জেনো গচ্ছিত আছে।’
‘উদ্বীক্ষণ’ কবিতায় সমাজের করুণ চিত্রের সন্ধান মেলে—‘নগরে ও গ্রামে জমেছে ভিড়/ভগ্ননীড়/ক্ষুধিত জনতা আজ নিবিড়।’ ‘বিদ্রোহের গান’ কবিতায় কবি বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন—‘বেজে উঠল কি সমরে ঘড়ি?/এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি,/আমরা সবাই যে যার প্রহরী/ উঠুক ডাক।’ ‘আমরা এসেছি’ কবিতায় মিছিলের ঝনঝনানি শোনা যায়।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতায় অবস্থান নিয়েছেন শোষিত শ্রেণির পক্ষে। তাঁর কাছে শোষিত মানুষের মুক্তি মিলবে মার্ক্সবাদ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে। তাঁর জন্মের শতবর্ষ পরে এসে আমরা দেখি, যে দুটি শ্রেণির মানুষের মধ্যে ব্যবধানের কথা বলেছেন, সেই ব্যবধান শুধু বেড়েই চলছে। পুঁজিবাদের বিস্তার এখন চরম পর্যায়ে। অন্যদিকে মার্ক্সবাদের যে যাত্রা এখানেও শুরু হয়েছিল, সেই যাত্রাও থমকে গেছে, ম্রিয়মাণ হয়েছে। তাই বলে শ্রমজীবী তার অধিকার পেয়েছে তা নয়। ফলে সুকান্ত ভট্টাচার্য শ্রমজীবীদের পক্ষে নিজের যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার প্রাসঙ্গিকতা আজও অমলিন। কোন পথে উল্লিখিত শ্রেণিবৈষম্য কমবে, শ্রমজীবী তার অধিকার ফিরে পাবে, সেটি মার্ক্সবাদের নিরিখে হবে, নাকি অন্য কোনো পথে তা জানা না থাকলেও যাদের পক্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য লড়ে গেছেন, তাদের মুক্তি আজও হয়নি। তাদের অধিকার তথা তাদের মুক্তির লড়াই জারি থাকতে হবে—রাজপথ থেকে শিল্প-সাহিত্যের আঙিনায়।
কবি লিখেছেন—‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—/কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,/ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময় :/পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি।’ ২০২৬ সালে এসেও অনাহারী-ক্ষুধিত মানুষের কাছে পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে হবে, কবিতার স্নিগ্ধতা টানবে না। ‘দুর্মর’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘দেশলাইয়ের কাঠি’, ‘ছাড়পত্র’, ‘সিগারেট’, ‘প্রার্থী’, ‘রানার’সহ বেশ কিছু কবিতার ভেতর দিয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যকে আমরা যেটুকু চিনি, তিনি তাঁর অপরাপর কবিতার মধ্যেও একই সুর-গন্ধবেষ্টিত আবহ সৃষ্টি করেছেন। এসব কবিতাকে আশ্রয় করে সামান্যের ভেতর দিয়ে যে অসামান্য উপলব্ধি হয়, সেটাই সুকান্ত ভট্টাচার্য। জন্মশতবর্ষে কালোত্তীর্ণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতি বিনম্র প্রণতি।