থাইল্যান্ডের রাজকুমারী বাজরাকিতিইয়াভা মাহিদোল ৪৭ বছর বয়সে মারা গেছেন বলে রাজকীয় পরিবারের দপ্তর জানিয়েছে। তিনি একজন আইনজীবী এবং রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের সন্তানদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা।
শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্যাংককের একটি হাসপাতালে মারা যান। তিন বছর আগে অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হওয়ার পর থেকে সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল। অসুস্থ হওয়ার সাড়ে তিন বছর পর তার মৃত্যু হলো এবং এই পুরো সময়টায় তিনি কোমায় ছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি তার বাবা-মা এবং ভাইবোনদের রেখে গেছেন।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে একটি সামরিক প্রদর্শনীর জন্য কুকুর প্রশিক্ষণের সময় তিনি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাজপ্রাসাদ জানায়, তিনি মাইকোপ্লাজমা নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা সাধারণত নিউমোনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, ‘এই মৃত্যু শুধু দেশের মানুষের জন্য একটি দুঃসংবাদ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য গভীর শোকের বিষয়।’ তিনি রাজকুমারীকে থাইল্যান্ডের গর্ব বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, দয়া, ন্যায়বিচার ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে রাজকুমারীর অঙ্গীকার জাতির জন্য একটি মূল্যবান উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
রাজকুমারীর চিকিৎসাধীন থাকা কিং চুলালংকর্ন মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রাঙ্গণে অল্পসংখ্যক শোকাহত মানুষ জড়ো হন। তাদের অনেকের হাতেই ছিল বছরের পর বছর ধরে তোলা রাজকুমারীর বাধাই করা বা ল্যামিনেট করা ছবি।
রাজকুমারী বাজরাকিতিইয়াবা বিচারব্যবস্থার সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। কারাবন্দী নারীদের মুক্তির পর সমাজে পুনর্বাসনে সহায়তা করার জন্য চালু করা তার ‘কামলাংজাই’ প্রকল্পের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
২০২৩ সালের নববর্ষ উপলক্ষে রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের পাঠানো শুভেচ্ছা কার্ডে তাকে এবং রানী সুথিদাকে কালো পোশাকে দেখা যায়। অনেক থাই নাগরিক এটিকে রাজকুমারীর শারীরিক অবস্থার গুরুতরতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন।
১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন যুবরাজ ভাজিরালংকর্ন ও তার স্ত্রী রাজকুমারী সোমসাওয়ালির ঘরে বাজরাকিতিইয়াবার জন্ম হয়। রাজা ভাজিরালংকর্নের তিন স্ত্রীর গর্ভে মোট সাত সন্তান রয়েছে। আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর পূর্ণ রাজকীয় নাম ‘বজ্রকিতিয়ভা নরেন্দ্র দেব্যবতী’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
থাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলে যুবরাজ দীপংকর রশ্মিজ্যোতিকেই সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখা হয়, কারণ দেশটির রাজকীয় উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় ছেলেসন্তানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে রাজকুমারী বজ্রকিতিয়ভার দীর্ঘ সরকারি অভিজ্ঞতার কারণে ধারণা করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন, এমনকি কোনো অল্পবয়সী রাজার অভিভাবক হিসেবেও দায়িত্ব নিতে পারেন।
বজ্রকিতিয়ভা থাইল্যান্ডের থামাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ২০০২ সালে সেখান থেকে আইনে স্নাতকোত্তর এবং ২০০৫ সালে অভিযুক্তদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তার সম্মানে কর্নেল ল স্কুলে একটি বৃত্তি চালু করা হয় এবং থাইল্যান্ড ও কর্নেলের মধ্যে আইন বিশেষজ্ঞ বিনিময় কর্মসূচিও প্রতিষ্ঠিত হয়।
পড়াশোনা শেষে তিনি কিছু সময় জাতিসংঘে থাইল্যান্ডের স্থায়ী মিশনে কাজ করেন। পরে দেশে ফিরে সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রিয়াতে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এরপর ২০১৭ সালে তিনি জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিয়োগ পান।
রাজকুমারী বজ্রকিতিয়ভা নারী কারাবন্দীদের পুনর্বাসন এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি নারী বন্দীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করেন এবং নারীদের জন্য জাতিসংঘের সম্মানসূচক শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার উদ্যোগের ফলেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নারী বন্দীদের যত্ন ও কারাগারের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য ‘ব্যাংকক বিধিমালা’ গ্রহণ করে।




