• ই-পেপার

পুরান ঢাকার বিয়ের পদ

  • জমজমাট বিয়ের অনুষ্ঠান আর আদর-আপ্যায়নের জন্য খ্যাতি রয়েছে পুরান ঢাকার। অবস্থাপন্নরা তো বটেই, নিম্নবিত্তরাও ছেলে-মেয়ের বিয়েতে আয়োজনের কোনো কমতি রাখেন না। পুরান ঢাকার বিয়ের কিছু বিশেষ খাবারের রেসিপি দিয়েছেন রন্ধনশিল্পী লিপি ইসমাইল

পাঁচ তারকা হোটেলের বিয়ের খাবার

বড় বড় হোটেল এবং রিসোর্টেও আয়োজন করা হয় বিয়ের অনুষ্ঠান। চাহিদামতো নানা খাবারের আয়োজন করে এসব প্রতিষ্ঠান। বিয়ের খাবারের কয়েকটি রেসিপি দিয়েছেন ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের এক্সিকিউটিভ সু শেফ এম ডি পলাশ মোল্লা

পাঁচ তারকা হোটেলের বিয়ের খাবার

গরুর রেজালা

উপকরণ

গরুর মাংস ২ কেজি, আস্ত ধনে ১ চা চামচ, আস্ত জিরা ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া আধা চা চামচ, জিরা গুঁড়া আধা চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, গরম মসলা আধা চা চামচ, লাল মরিচ ৫-৬টি, তেজপাতা ২-৩টি, হলুদ গুঁড়া আধা চা চামচ, তেল ১ কাপ, টক দই ১ কাপ, লবণ স্বাদমতো

পাঁচ তারকা হোটেলের বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

মাংস ধুয়ে লবণ দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। ধনে ও জিরা ভেজে গুঁড়া করে নিন।

একটি হাঁড়িতে তেল দিয়ে এতে পেঁয়াজ কুচি, আদা বাটা, রসুন বাটা, লাল মরিচ, তেজপাতা, হলুদ গুঁড়া ও লবণ দিয়ে মাখিয়ে চড়িয়ে দিন। পানি শুকিয়ে আসা পর্যন্ত মাঝারি আঁচে রান্না করুন।

কষানো হলে ৩-৪ কাপ পানি দিয়ে মাঝারি আঁচে ঝোল ঘন হয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ঝোল ঘন হয়ে এলে ভাজা ধনে ও জিরা গুঁড়া দিয়ে নেড়ে আরো ৪-৫ মিনিট রান্না করে নামিয়ে নিন। ব্যস, তৈরি বিয়েবাড়ির মজাদার স্বাদের গরুর মাংসের রেজালা।

 

রূপচাঁদা ফ্রাই

উপকরণ

রূপচাঁদা ৮টি ২০০ গ্রাম করে, রসুন বাটা ১০ গ্রাম, লেবু ২০ গ্রাম, লবণ ৫ গ্রাম, হলুদ গুঁড়া ১০ গ্রাম, মরিচ গুঁড়া ২০ গ্রাম, জিরা গুঁড়া ৫ গ্রাম, বেসন ১০ গ্রাম, কর্নফ্লাওয়ার ১০ গ্রাম, সরিষার তেল ১০ গ্রাম, সয়াবিন তেল ৪০০ গ্রাম, ডিম ১টি

পাঁচ তারকা হোটেলের বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

মাছগুলো ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। প্রতিটি মাছের গায়ে হালকা করে ২-৩টি চিরুনি (কাট) দিন।

একটি বাটিতে রসুন বাটা, লেবুর রস, লবণ, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, সরিষার তেলসব ভালোভাবে মিশিয়ে মাছগুলো মাখিয়ে ২০-৩০ মিনিট মেরিনেট করুন।

একটি বাটিতে বেসন, কর্নফ্লাওয়ার, ডিমসব ভালোভাবে মিশিয়ে ঘন ব্যাটার তৈরি করুন। মেরিনেট করা মাছ ব্যাটারে ভালোভাবে কোট করে নিন।

কড়াইয়ে সয়াবিন তেল গরম করে মাঝারি আঁচে মাছ উল্টেপাল্টে সোনালি ও ক্রিসপি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। ভাজা হলে টিস্যু পেপারে তুলে অতিরিক্ত তেল ঝরিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

 

নান

উপকরণ

 

ময়দা ১ কেজি, লবণ ১০ গ্রাম, ইস্ট ২ গ্রাম, বেকিং পাউডার ৪ গ্রাম, তরল দুধ ২৫০ গ্রাম, সয়াবিন তেল ১০ গ্রাম, ঘি ১০ গ্রাম, বাটার ১০ গ্রাম, চিনি ৩০ গ্রাম, পানি ২৫০ গ্রাম

পাঁচ তারকা হোটেলের বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

একটি বাটিতে কুসুম গরম পানি (২৫০ গ্রাম থেকে অল্প) নিন। এতে চিনি ও ইস্ট দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে ১০ মিনিট ঢেকে রাখুন। ইস্ট ফুলে উঠলে বুঝবেন এটি প্রস্তুত।

একটি বড় পাত্রে ময়দা, লবণ ও বেকিং পাউডার মিশিয়ে নিন। এরপর ইস্ট মিশ্রণ, দুধ, বাকি পানি, সয়াবিন তেল, ঘি ও বাটার দিয়ে ভালোভাবে মথে নরম ডো তৈরি করে ১০-১২ মিনিট রেখে নিন। এরপর অল্প তেল মেখে ঢেকে এক-দেড় ঘণ্টা উষ্ণ জায়গায় রেখে দিন, যতক্ষণ না ডো ফুলে দ্বিগুণ হয়।

এরপর ডো ছোট ছোট লেচি করে ডিম্বাকৃতি করে বেলে নান শেপ দিন। চাইলে ওপর দিয়ে সামান্য পানি বা দুধ ব্রাশ করতে পারেন।

গরম তাওয়ায় নান দিয়ে ঢেকে ঢেকে ছেঁকুন। এক পাশ ফুলে উঠলে উল্টে অন্য পাশ ছেঁকুন। অথবা ২৩০ থেকে ২৫০ ডিগ্রি তাপে ৫-৭ মিনিট বেক করুন। গরম নানের ওপর অল্প বাটার বা ঘি ব্রাশ করে গরম গরম বাটার চিকেন, গ্রিল চিকেন, কাবাব, বিরিয়ানি বা যেকোনো কারির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

 

বিফ কালাভুনা

উপকরণ

বিফ ১৬০০ গ্রাম, আদা বাটা ২০ গ্রাম, রসুন বাটা ১০ গ্রাম, পেঁয়াজ ৩০০ গ্রাম, টমেটো ১টি, হলুদ গুঁড়া ৮ গ্রাম, মরিচ গুঁড়া ২০ গ্রাম, ধনে গুঁড়া ৫ গ্রাম, জিরা গুঁড়া ৫ গ্রাম, সরিষার তেল ১০০ গ্রাম, সয়াবিন তেল ১০০ গ্রাম, এলাচ ২ গ্রাম, তেজপাতা ২ গ্রাম, লং ২ গ্রাম, দারচিনি ৫ গ্রাম, ভাজা মসলা ৫ গ্রাম, কালিজিরা ১০ গ্রাম, ব্ল্যাক পেপার ৫ গ্রাম, চিলি ফ্লেক্স ৫ গ্রাম

পাঁচ তারকা হোটেলের বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

একটি বড় বাটিতে মাংসের সঙ্গে আদা বাটা, রসুন বাটা, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, ব্ল্যাক পেপার, চিলি ফ্লেক্স, লবণসব ভালোভাবে মিশিয়ে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট মেরিনেট করুন।

একটি বড় কড়াইয়ে সয়াবিন তেল ও সরিষার তেল একসঙ্গে গরম করুন। তেলে এলাচ, তেজপাতা, লবঙ্গ, দারচিনি ও কালিজিরা দিন। হালকা সুগন্ধ বের হলে পেঁয়াজ মাঝারি আঁচে গাঢ় বাদামি করে ভাজুন। এবার টমেটো কুচি বা বাটা দিয়ে ভালোভাবে কষান। তেল ভেসে উঠলে মেরিনেট করা মাংস দিয়ে উচ্চ আঁচে ১০-১৫ মিনিট ভালোভাবে কষান।

এরপর আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট রান্না করুন। মাঝে মাঝে নেড়ে দিন। প্রয়োজনে অল্প অল্প পানি দিন। গ্রেভি শুকনা রাখতে হবে। মাংস নরম ও কালচে হলে ভাজা মসলা ছড়িয়ে আরো ৫ মিনিট ভুনা করে নামিয়ে নিন।

 

 

বিয়ের খাবার

পোলাও, রেজালা, বোরহানি, বিরিয়ানি, জর্দা, রোস্ট, কাবাবসহ বিয়েতে বাহারি ভোজের আয়োজন থাকে। এসব খাবারের রেসিপি দিয়েছেন রন্ধনশিল্পী জান্নাত আরা এনি

বিয়ের খাবার

কাচ্চি বিরিয়ানি

উপকরণ

খাসির মাংস ৫০০ গ্রাম (বড় টুকরা), বাসমতী চাল ২৫০ গ্রাম, আলু ২-৩টি (বড় টুকরা করে কাটা), পেঁয়াজ বেরেস্তা আধাকাপ, টক দই আধাকাপ, আদা বাটা ও রসুন বাটা ১ চা চামচ করে,বিরিয়ানি মসলা ১ টেবিল চামচ, কাঁচা মরিচ ৪-৫টি,আলুবোখারা ও কিশমিশ ১০-১২টি করে, ঘি ৩ টেবিল চামচ, তেল ভাজার জন্য ও রান্নার জন্য, কেওড়া জল বা গোলাপ জল ১ চা চামচ, ফুড কালার (ঐচ্ছিক) সামান্য (দুধে মেশানো), লবণ স্বাদমতো

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

মাংসে টক দই, আদা-রসুন বাটা, বিরিয়ানি মসলা, লবণ, সামান্য তেল ও বেরেস্তা মিশিয়ে কমপক্ষে ২-৩ ঘণ্টা রাখুন। সামান্য ফুড কালার ও লবণ মাখিয়ে আলু হালকা ভেজে তুলে নিন। পর্যাপ্ত পানি, লবণ ও গোটা গরম মসলা (এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ) দিয়ে চাল ৮০ শতাংশ সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নিন।

একটি ভারী তলাযুক্ত হাঁড়িতে প্রথমে মেরিনেট করা মাংস সমান করে বিছিয়ে দিন। এর ওপরে ভাজা আলু, কাঁচা মরিচ, আলুবোখারা ও কিশমিশ ছড়িয়ে দিন। এরপর সিদ্ধ চালের একটি স্তর তৈরি করুন। ওপরে বাকি বেরেস্তা, ঘি, কেওড়া জল বা গোলাপ জল ও দুধে ভেজানো ফুড কালার দিন।

হাঁড়ির মুখ আটা বা ফয়েল পেপার দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দিন, যাতে ভেতরের ভাপ বাইরে না আসে। প্রথমে ৫-৭ মিনিট মাঝারি আঁচে এবং তারপর ১ থেকে দেড় ঘণ্টা একেবারে কম আঁচে দমে রাখুন। দম থেকে নামানোর পর সাবধানে হাঁড়ির মুখ খুলে আলতো হাতে মিশিয়ে পরিবেশন করুন।

 

বোরহানি

উপকরণ

​​টক দই ১ কেজি, পুদিনাপাতা বাটা

১ টেবিল চামচ, কাঁচা মরিচ বাটা ১ চা চামচ, ভাজা জিরা গুঁড়া ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া আধা চা চামচ, সরিষা গুঁড়া ১ চা চামচ (বাটা হলেও হবে), বিট লবণ ১ চা চামচ (বা স্বাদমতো), সাধারণ লবণ স্বাদমতো, চিনি ১-২ টেবিল চামচ (স্বাদমতো)

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

টক দই, পুদিনাপাতা বাটা, কাঁচা মরিচ বাটা, জিরা গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, সরিষা গুঁড়া, বিট লবণ, সাধারণ লবণ, চিনি ও গোলমরিচ গুঁড়া একটি ব্লেন্ডারে নিন।

কোনো পানি যোগ না করে প্রথমে সব উপকরণ ভালোভাবে ব্লেন্ড করুন, যাতে মসলা মিশে যায়। এবার পরিমাণমতো ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে আরো একবার ব্লেন্ড করে নিন।

একটি ছাঁকনির সাহায্যে বোরহানি ছেঁকে নিন। এটি পরিবেশনের জন্য তৈরি। পরিবেশনের সময় বরফের টুকরা যোগ করুন।

 

জর্দা

উপকরণ

পোলাওয়ের বা বাসমতী চাল ১ কাপ, চিনি এক-দেড় কাপ (স্বাদমতো), ঘি ২ টেবিল চামচ, জর্দার রং (কমলা) সামান্য (আধা চা চামচ বা তারও কম), দারচিনি ২ টুকরা, এলাচ ৩-৪টি, তেজপাতা ১টি, কিশমিশ ও মোরব্বা কুচি ২ টেবিল চামচ, কাজু বা পেস্তাবাদাম কুচি সাজানোর জন্য, পানি সিদ্ধ করার জন্য পর্যাপ্ত

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

প্রথমে পর্যাপ্ত পানিতে জর্দার রং দিয়ে ফুটিয়ে নিন। চাল দিয়ে দিন এবং ৮০ শতাংশ সিদ্ধ করুন। সিদ্ধ চালের পানি ঝরিয়ে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে একবার ধুয়ে নিন।

একটি পাত্রে ঘি গরম করে দারচিনি, এলাচ ও তেজপাতা হালকা ভেজে নিন। পানি ঝরানো চাল দিয়ে হালকা করে মিশিয়ে নিন। চিনি দিয়ে দিন এবং খুব সাবধানে মিশিয়ে দিন।

চিনি গলে চালের সঙ্গে মিশে গেলে কিশমিশ ও মোরব্বা মিশিয়ে দিন। পাত্রের মুখে ঢাকনা দিয়ে কম আঁচে (৫-১০ মিনিট) দমে রাখুন, যাতে চাল পুরোপুরি সিদ্ধ হয় এবং চিনি শুকিয়ে যায়।

দম থেকে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন। ওপরে বাদাম কুচি ও পছন্দমতো মিষ্টি (যেমনরসগোল্লা) দিয়ে সাজিয়ে নিন।

 

জালি কাবাব

উপকরণ

মাংসের কিমা ২৫০ গ্রাম, বুটের ডাল (ভিজিয়ে সিদ্ধ করা) আধাকাপ, পেঁয়াজ কুচি সিকি কাপ, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, শাহি গরম মসলা গুঁড়া আধা চা চামচ, কাঁচা মরিচ কুচি স্বাদমতো, ধনেপাতা কুচি ১ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, ডিম ২টি (একটি কাবাবের মিশ্রণে, অন্যটি ভাজার জন্য), তেল ভাজার জন্য

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

একটি পাত্রে মাংসের কিমা, বুটের ডাল, আদা, রসুন, গরম মসলা ও লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে নিন। পানি শুকিয়ে ঝরঝরে করে নামান। সিদ্ধ মিশ্রণটি পাটা বা ব্লেন্ডারে মিহি করে বেটে বা ব্লেন্ড করে নিন। এর সঙ্গে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা কুচি এবং একটি ডিম (ফেটিয়ে) দিয়ে ভালো করে মেখে নরম মিশ্রণ তৈরি করুন।

মিশ্রণটি থেকে ছোট ছোট কাবাব তৈরি করে হাতের তালুতে চেপে চ্যাপ্টা আকার দিন। বাকি ডিমটি সামান্য পানি (৪-৫ ফোঁটা) দিয়ে ফেটিয়ে নিন। একটি প্যানে ডুবো তেল গরম করুন। কাবাবগুলো ডিমের মিশ্রণে ভালো করে ডুবিয়ে গরম তেলে সাবধানে ছেড়ে দিন। বাদামি রং হওয়া পর্যন্ত ভেজে তেল ঝরিয়ে তুলে নিন। গরম গরম জালি কাবাব পরিবেশন করুন বিরিয়ানি, পোলাও বা সসের সঙ্গে।

 

সাদা পোলাও

উপকরণ

 

চাল (বাসমতী বা চিনিগুঁড়া) ১ কাপ, গরম পানি দেড় কাপ, পেঁয়াজ কুচি ১-২টি, আদা বাটা আধা টেবিল চামচ, ঘি বা তেল ২ টেবিল চামচ, তেজপাতা ১টি, এলাচ ২টি, দারচিনি ২টি ছোট টুকরা, লবণ স্বাদমতো, কিশমিশ, কাজুবাদাম অল্প (ঐচ্ছিক)

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

চাল ভালো করে ধুয়ে ১০-১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন, তারপর পানি ঝরিয়ে নিন।

একটি পাত্রে ঘি বা তেল গরম করে তাতে তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি ও পেঁয়াজ কুচি (দিলে) দিয়ে হালকা ভেজে নিন।

এবার পানি ঝরানো চাল ও আদা বাটা দিয়ে ৫-৭ মিনিট মাঝারি আঁচে ভাজুন। গরম পানি ও লবণ দিয়ে নেড়ে দিন। কিশমিশ, কাজুবাদাম এই সময় দিতে পারেন। পানি শুকিয়ে এলে আঁচ একদম কমিয়ে দিন এবং পাত্রটি ঢেকে দিন।

১০-১৫ মিনিট দমে রাখুন। মাঝে একবার আলতোভাবে নেড়ে দিতে পারেন। পোলাও ঝরঝরে হয়ে গেলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

 

আলুবোখারার চাটনি

উপকরণ

আলুবোখারা ১০০ গ্রাম, চিনি এক কাপের তিন ভাগের এক ভাগ, তেঁতুলের ক্বাথ ১-২ চামচ, ভিনেগার ১ টেবিল চামচ, শুকনা মরিচ গুঁড়া আধা চা চামচ, টালা পাঁচফোড়ন গুঁড়া ১ চা চামচ, আদা কুচি বা বাটা আধা চা চামচ, লবণ স্বাদমতো

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

প্রথমে আলুবোখারা অল্প গরম পানিতে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে নরম করে নিন। একটি পাত্রে পানি ও চিনি মিশিয়ে মাঝারি আঁচে ফুটতে দিন। সিরা সামান্য আঠালো হয়ে এলে ভিজিয়ে রাখা আলুবোখারাগুলো দিয়ে দিন।

এবার এতে ভিনেগার, মরিচ গুঁড়া, পাঁচফোড়ন গুঁড়া ও লবণ দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিন। হালকা আঁচে ৫-১০ মিনিট রান্না করুন। আলুবোখারা কিছুটা নরম হয়ে মিশ্রণটি ঘন ও থকথকে হয়ে এলে নামিয়ে নিন।

ঠাণ্ডা হওয়ার পর কাচের বয়ামে সংরক্ষণ করুন এবং পোলাও বা বিরিয়ানির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

 

চিংড়ির মালাইকারি

উপকরণ

বড় চিংড়ি মাছ ৫০০ গ্রাম, নারকেলের দুধ ১ কাপ, পেঁয়াজ বাটা ১টি, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা আধা চা চামচ, হলুদ গুঁড়া ১ চা চামচ, জিরা গুঁড়া ১ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া আধা চা চামচ, গরম মসলা গুঁড়া আধা চা চামচ, গোটা গরম মসলা২টি এলাচ, ১ ইঞ্চি দারচিনি, ২টি লবঙ্গ, তেজপাতা ১টি, লবণ ও চিনি স্বাদমতো, সর্ষের তেল বা সাদা তেল ৪ টেবিল চামচ, ঘি ১ চা চামচ (শেষের জন্য)

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

চিংড়ি মাছ পরিষ্কার করে লবণ ও হলুদ মাখিয়ে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। বেশি ভাজবেন না। কড়াইয়ের তেলে তেজপাতা ও গোটা গরম মসলা ফোড়ন দিন। সুগন্ধ বেরোলে পেঁয়াজ বাটা দিয়ে হালকা ভাজুন। এরপর আদা বাটা ও রসুন বাটা দিয়ে ভালো করে কষান।

হলুদ গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া ও পরিমাণমতো লবণ দিয়ে সামান্য পানি দিয়ে মসলাটা কষিয়ে নিন। মসলা থেকে তেল ছেড়ে আসা পর্যন্ত রান্না করুন। কষানো মসলায় নারকেলের দুধ ও সামান্য চিনি মিশিয়ে দিন। ঝোল ফুটে উঠলে ভেজে রাখা চিংড়ি মাছগুলো দিয়ে দিন।

মাঝারি আঁচে ৫ মিনিট রান্না করুন। ঝোল ঘন হয়ে এলে ওপর থেকে ঘি ও গরম মসলা গুঁড়া ছড়িয়ে দিন। চুলা বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঢাকা দিয়ে রাখুন।

 

 

টিকিয়া কাবাব

উপকরণ

মাংস ৫০০ গ্রাম, বুটের ডাল আধাকাপ, আদা ও রসুন বাটা ২ চা চামচ করে, পেঁয়াজ কুচি ২ টেবিল চামচ, শুকনা মরিচ ২-৩টি, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, তেজপাতা কয়েকটি, হলুদ ও মরিচ গুঁড়া সামান্য, লবণ স্বাদমতো, ডিম ১টি (ফেটিয়ে নেওয়া), গরম মসলা গুঁড়া, জিরা ও ধনে গুঁড়া আধা চা চামচ করে, পেঁয়াজ বেরেস্তা (ঐচ্ছিক) ২ টেবিল চামচ, তেল ভাজার জন্য

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

মাংস, ডাল, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, আস্ত গরম মসলা, হলুদ, মরিচ গুঁড়া, ও লবণ দিয়ে সামান্য পানি (যাতে সিদ্ধ হয়ে শুকিয়ে যায়) দিয়ে সিদ্ধ করুন।

সিদ্ধ মিশ্রণটি পাটা বা ফুড প্রসেসরে শুকনা ও মিহি করে বেটে নিন। বাটা মিশ্রণের সঙ্গে গরম মসলা গুঁড়া, জিরা-ধনে গুঁড়া, ডিম ও পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে ভালো করে মেখে নিন।

মিশ্রণটি দিয়ে গোল-চ্যাপ্টা আকারের টিকিয়া তৈরি করুন। গরম তেলে মাঝারি আঁচে টিকিয়াগুলো সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভেজে পরিবেশন করুন।

 

কাটা মসলা মাংস

উপকরণ

১ কেজি মাংস টুকরো করা, ২ কাপ পেয়াজ  কুচি , ১ টেবিল চামচ রসূন কুচি, ১ টেবিল চামচ আদা কুচি, ১ চা চামচ ধনিয়া গুড়া, ১/২ চা চামচ মরিচ গুড়া, ৬-৭ টি শুকনা মরিচ, ১ চা চামচ হলুদ গুড়া, ১ চা চামচ জিরা গুড়া, লবণ পরিমাণ মত, ১ কাপ সয়াবিন তেল, ৪-৫ টি এলাচ, ৪-৫ টি দারচিনি , ৪-৫ টি লবঙ্গ, ২-৩ টি তেজপাতা, ১/২ কাপ টক দই, ১/২ চা চামচ চিনি

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

চিনি বাদ দিয়ে সমস্ত উপকরণ মিশাতে হবে । এখন ৩০ মিনিট মেরিনেট করে একটি গরম সসপ্যানে  মিশ্রণটি ঢেলে দিন এবং উচ্চ তাপে ২০ মিনিট রান্না করুন। রান্নার সময় বার বার নাড়তে হবে। 

যখন পানি শুকিয়ে যাবে এবং তেল উপরে উঠে আসবে তখন আরও ২ কাপ পানি যোগ করুন।

নারুন এবং ৪০ মিনিটের জন্য অল্প আঁচে ঢাকনা দিয়ে রান্না করুন। বার বার নারুন ।

এবার চুলা থেকে নামিয়ে উপর দিয়ে চিনি ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।

 

শাহী চিকেন রোস্ট

উপকরণ

মুরগির পিস ৪টি, টক দই ১/২ কাপ, পেঁয়াজ বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, জিরা ও ধনে গুঁড়া ১/২ চা চামচ , হলুদ গুঁড়া ১/২ চা চামচ (ঐচ্ছিক), মরিচ গুঁড়া ১/২ চা চামচ , লবণ স্বাদমতো, তেল/ঘি ভাজার জন্য ও রান্নার জন্য, পেঁয়াজ বেরেস্তা ১/২ কাপ, কাঁচা মরিচ ৪-৫টি (আস্ত), গরম মশলার গুঁড়া (এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ): ১/২ চা চামচ, চিনি ১/২ চা চামচ

বিয়ের খাবার

যেভাবে তৈরি করবেন

​​মুরগির পিসগুলো ভালো করে ধুয়ে টক দই, আদা-রসুন বাটা, জিরা-ধনে গুঁড়ো, হলুদ-মরিচ গুঁড়ো ও সামান্য লবণ দিয়ে মাখিয়ে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা রেখে দিন।

কড়াইয়ে সামান্য তেল বা ঘি গরম করে ম্যারিনেট করা মুরগির পিসগুলো হালকা সোনালী করে ভেজে তুলে নিন।

ওই তেলেই পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ ভেজে নিন। এরপর ম্যারিনেশনের বাকি মসলাটুকু ও সামান্য লবণ দিয়ে ভালো করে কষান। প্রয়োজনে সামান্য গরম পানি  দিতে পারেন। মসলা কষানো হলে ভেজে রাখা মুরগির পিস ও আস্ত কাঁচা মরিচ দিয়ে নেড়ে দিন।

এবার ১/২ কাপ গরম জল বা দুধ দিয়ে মিশিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিন। আঁঁচ কমিয়ে দিন।মাংস সেদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে ঝোল ঘন হয়ে এলে পেঁয়াজ বেরেস্তা, গরম মশলার গুঁড়ো এবং চিনি  দিয়ে আলতো করে মিশিয়ে দিন। তেল উপরে উঠে এলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

 

 

 

 

 

বাঙালির বিয়ের ভোজ

নাহিদ ইসলাম

বাঙালির বিয়ের ভোজ

মঙ্গলকাব্যে বিয়ের ভোজ

বাঙালির বিয়ের ভোজের ইতিহাস বলতে গেলে প্রথমেই আসবে বেহুলা-লখিন্দরের কথা। তাঁদের গল্পে প্রেম ও বিয়োগ যতটা আছে, বিয়ের ভোজের বর্ণনাও ততটাই স্পষ্ট। মঙ্গলকাব্যে দেখা যায়, লখিন্দরের বিয়েতে কন্যাপক্ষ যে ভোজ সাজিয়েছিল, সেখানে নিরামিষ ও আমিষদুই ধরনের খাবারই ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। বেতের কচি আগা, বারোমাসি বেগুন, পাটশাক, হেলেঞ্চাসবই ছিল ঘিয়ে ভাজা। মুগ ডাল, মুগের বড়ি, তিলুয়া, তিলের বড়া, কুমড়ো তিলের রান্না, আর আদা বাটা দিয়ে তৈরি শুক্তো। এরপর মাছের পদে চিতল, রুই, কই, পাবদা, খলশে থেকে ইলিশপুরো নদীজীবনই ছিল হাজির। মাংসের মধ্যে ছিল খাসি, ভেড়া, হরিণ, কবুতর, এমনকি কচ্ছপও। তখনকার নিয়ম ছিল, সময় নিয়ে ধীরে ধীরে আগুনে বসিয়ে রান্না করা। স্বাদ যেন অমৃত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালি বিয়ের ভোজে দুটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ার মতোঘিয়ের ব্যবহার, আর থাকত বহু পদ। রান্নার উপকরণ খুব বেশি বাইরে থেকে আসত না। নিজেদের জমির চাল, পুকুরের মাছ, আর আশপাশের সবজি ও গরু-ছাগলের দুধ দিয়েই হতো বিয়ের ভোজের আয়োজন।

নিরামিষ কমে বাড়ল আমিষ

এরপর সময় বদলাতে থাকল। শাক্ত-শৈব উপাসনা, পরে ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালির থালা বদলাল ধীরে ধীরে। মুসলিম বিয়েতে নিরামিষ কমে এলো, আমিষ একটু জায়গা বাড়াল। কিন্তু ভোজ যে বাঙালির কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ, এই বোধ কিন্তু যুগে যুগে একই রয়ে গেল। নবাবদের আমলে খাবারের তালিকায় কাবাব, কোরমা, জাফরানি ভাত, বাদাম পেস্তা-ঘি-জাফরানের ব্যবহার বৃদ্ধি পেল। অতিথিপরায়ণতা তখনো বাঙালির প্রধান গুণ।

ইংরেজ আমল

ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের ভোজে জায়গা নিল ডাল, আলুর দম এবং নানা পদ ও রূপের শাক ভাজা। এরপর এলো ফলার’—দই, চিড়া, মণ্ডা, বাতাসা এক থালা। যারা বড়সড় ভোজ দিতে পারত না, তারাও ফলার দিয়েই সমান আতিথেয়তা দেখাতে পারত। এই সময়ই লুচি, কচুরি, খাজা, সন্দেশের বহুরূপী সমাহার ঢুকে পড়ে বাঙালির বিয়ের টেবিলে।

১৮৭৩-৭৪ সালে রসগোল্লার আগমন বাঙালির বিয়েতে নিয়ে এলো এক বিরাট পালাবদল। বিয়ের আসরে মিষ্টিমুখ করানোর রেওয়াজে সন্দেশের সঙ্গে রসগোল্লাও স্থায়ী আসন করে নিল। তিলকুট, আমসন্দেশ, কামরাঙা সন্দেশও তখন বেশ জনপ্রিয়।

ক্যাটারিং ব্যবস্থার বিকাশ ও মোরগ-পোলাওয়ের যুগ

উনিশ শতকের শেষ দিকে ঢাকায় যে ক্যাটারিংব্যবস্থা গড়ে উঠল, সেটা শুধু ব্যবসা ছিল না; রাজবাড়ির প্রাচীর পেরিয়ে বিয়ের ভোজকে সাধারণ মানুষের উঠানে আনার এক বিপ্লব ছিল সেটা। আবেদ অ্যান্ড কোং-এর জন্ম সেই প্রেক্ষাপটেই। নবাব আহসানউল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এরা রান্না, শামিয়ানা, চেয়ার-টেবিলসহ সবকিছু এক ছাতার নিচে এনে দিল। এর আগে বিয়েবাড়ির রান্না মানে ছিল গৃহস্থের নিজের জমিদারি সামলানোর কৌশল। পাড়ার কেউ হাঁড়ি ধার দিচ্ছে, কেউ চাল দিচ্ছে, কেউ মাছ কেটে দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ক্যাটারিং ছিল নব্য আধুনিকতা।

এই সময়ই পুরান ঢাকার বাবুর্চিসমাজ এক ধরনের রন্ধনশাস্ত্রের শৃঙ্খলা তৈরি করল। রান্নার কৌশল তারা এমন আয়ত্তে এনেছিল যে কোন মসলায় রেজালা ঘন হবে, কোন মাংসের টুকরা কোন তাপমাত্রায় নরম হবে, কোন পোলাওয়ে কতটা ঘি দিলে অতিথির অভিযোগ থাকবে নাসব তাদের নখদর্পণে। ধীরে ধীরে তৈরি হলো একটি অনানুষ্ঠানিক মানদণ্ড, যাকে আজও সবাই চেনে ঢাকাই বিয়ের খাবার নামে। মোরগ পোলাও এই ভোজের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। মোরগ পোলাওয়ের কথা আলাদা করে না বললে পুরো গল্পটাই অপূর্ণ থেকে যাবে। তখনকার ঢাকার বিয়েতে গরু বা খাসির মাংস নয়, প্রধান আকর্ষণ ছিল মোরগ পোলাও। এর পেছনে ছিল মোগল রন্ধনশৈলীর দীর্ঘ পরম্পরা। সেই শৈলী মেনে তৈরি হতো এমন এক মোরগ পোলাও, যা অতি যত্নে, যথেষ্ট শ্রম দিয়ে ধীরেসুস্থে প্রস্তুত করা হতো। রান্নার উপকরণের মান আর বাবুর্চির পরিমিতিবোধ ছিল অতুলনীয় এই স্বাদের আসল রহস্য।

বাঙালির বিয়ের ভোজ

ঢাকাই খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতি বইয়ে সাদ উর রহমান এই রান্নার নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। চারটি মুরগিকে টুকরা করে তার সঙ্গে মেশানো হতো এক কেজি চিনিগুঁড়া চাল। চাল, মাংস, কিশমিশ, কাজুবাদাম-কাঠবাদাম, আলুবোখারা, ঘি, দুধের সর আর জাফরানসব একসঙ্গে দমে বসানো হতো। তবে আজকের মতো ঝাল-ঝোল ছিল না। কোনো রকম মরিচ, হলুদ, ঝাঁজালো মসলা ব্যবহার করা হতো না। স্বাদের উত্স ছিল দুধ, ঘি আর সুগন্ধি জাফরান। মাংস আর চাল এমন নিখুঁত অনুপাতে মেশানো হতো যে পরিবেশনের সময় প্রতিটি দানা আলাদা করা যেত। গন্ধে ভরপুর, কিন্তু তেলতেলে নয়। চালে চাপ দিলে সুবাসিত ঘি নিঃসৃত হতো, কিন্তু হাতে লেগে থাকত না। এই সূক্ষ্ম রন্ধনশৈলীই মোরগ পোলাওকে আদি ঢাকাই বিয়ের বিশেষ খাবার করে তুলেছিল।

পুরান ঢাকার প্রবীণরা বলতেন, মোরগ পোলাও ঢাকার বাইরে ঠিকমতো রান্নাই হয় না। কেউ কেউ বলতেন, এখানকার বাতাসেই নাকি মসলার গন্ধ অন্য রকম হয়। এই রেসিপির কারিগরি সূক্ষ্মতা এতটাই ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল যে অন্য কোথাও গিয়ে তার গুণমান ঠিক রাখা সম্ভব হতো না। আর সে কথা লেখা আছে হাকিম হাবিবুর রহমান, সৈয়দ আলী আহসানসহ বহু লেখকের স্মৃতিকথায়। তাঁরা লিখেছেন, একসময় ঢাকার বিয়েতে মোরগ পোলাও কী পরিমাণ মর্যাদার প্রতীক ছিল, তা শুধু আজকের কাচ্চি বিরিয়ানির জনপ্রিয়তার সঙ্গেই তুলনীয়।

দেশভাগের পর মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বদলে যাওয়ায় বিয়ের মেন্যু একটু সাদামাটা হলো। কিছুদিন খুব জনপ্রিয় ছিল মোতি পোলাও বা ছোট কোফতাযুক্ত পোলাও। এরপর এলো সাদা পোলাও। ঝরঝরে ও হালকা। সঙ্গে রেজালা, শামি কাবাব, জর্দা, বোরহানি। এটাই ছিল তখনকার মধ্যবিত্ত বিয়ের স্ট্যান্ডার্ড মেন্যু।

বিপ্লবের নাম কাচ্চি বিরিয়ানি

ট্রেন্ড বদলাল গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে, যখন বিয়ের মেন্যুতে কাচ্চি বিরিয়ানি স্থান পেল। অবশ্য কাচ্চি বিরিয়ানি আগেও ঢাকায় ছিলনবাব পরিবারে, কিছু উর্দুভাষী পরিবারে বা পুরান ঢাকার নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘরানায়। কিন্তু বিয়ের মূল খাবার হিসেবে কাচ্চির এই রূপ নব্বইয়ের দশকের আগে দেখা যায়নি। এর পেছনে দুটি কারণকমিউনিটি সেন্টারের আবির্ভাব এবং বাবুর্চিদের রান্নার ধরন বদলানো। আগে বিয়ের আয়োজন হতো বাড়ির উঠানে বিশাল ত্রিপল

বাঙালির বিয়ের ভোজ

 

মুসলিম বিয়েতে নিরামিষ কমে এলো, আমিষ একটু জায়গা বাড়াল। কিন্তু ভোজ যে বাঙালির কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রকাশ, এই বোধ কিন্তু যুগে যুগে একই রয়ে গেল

 

টানিয়ে। তিন-চারটি বড় হাঁড়ি, কড়াইতে আলু-গরুর মাংস ভুনা কিংবা খুশকা পোলাও রান্না হতো। কাচ্চি রান্নার জন্য দরকারি উপকরণ বিশাল হাঁড়ি, খাসির মান, স্তর তৈরি ও সঠিক মেরিনেশন। এইসব সূক্ষ্ম শ্রমসাধ্য ব্যাপার নব্বইয়ের আগে অত ঘন ঘন দেখা যেত না। কিন্তু কমিউনিটি সেন্টার গড়ে উঠতেই ক্যাটারাররা বড় পরিসরে কাচ্চি রান্নার সুযোগ পেল। এক হাঁড়িতে ১৫০-২০০ জনের রান্না সম্ভব হলো। এতে খরচ হিসাব করা সহজ, লাভও বেশি। তাই কাচ্চির এক নতুন স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেল বিয়েবাড়ির কাচ্চি। আর আলোচনার বিষয়ের মধ্যে যোগ হলো আলু। কারো মতে, কাচ্চির আলু খুব নরম হতে নেই; আবার কেউ বলত, মুখে দিলেই ভেঙে যাওয়ার মতো আলুই কাচ্চির মান বাঁচায়। ঘি কম দিলে কাচ্চি শুকনো, বেশি দিলে তেলতেলে। কার বিয়ের দাওয়াতে কাচ্চির মান কেমন, তা নিয়ে চলত ভাবগম্ভীর আলোচনা। কালক্রমে কাচ্চির সঙ্গে বাধ্যতামূলক হয়ে উঠল তিনটি জিনিসজালি কাবাব, বোরহানি আর আলুবোখারার চাটনি। এসব না থাকলে খাওয়ার আনন্দ পরিপূর্ণ হয় না। পুরান ঢাকার বিয়েতে এখনো পাওয়া যায় বাদাম শরবত, জাফরানি মোরগ পোলাও, খোরাই ফিরনি, আর জামাইয়ের সামনে পরিবেশনের জন্য সাহেবানা খাওন-এর ৪৫ পদের মেন্যু। ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ এই জমকালো আয়োজন এখনো হারিয়ে যায়নি।

নিজে তুলে নিন, যেটা ইচ্ছা সেটা খান

২০০০ সালের পর বাঙালির বিয়ের খাবারে আরেক বড় রদবদল আসে বুফে মেন্যুর মাধ্যমে। শুরুটা হয় শহুরে উচ্চমধ্যবিত্তদের মাধ্যমে। কয়েক বছরের মধ্যেই ঢাকার বিয়ের সংস্কৃতি পুরো পাল্টে দেয় বুফে। একসময় বিয়ের আয়োজন মানেই ছিলএকজন পরিবেশন করবে, আপনি বসে থাকবেন। এখন অতিথিকে বলছেননিজে তুলে নিন, যেটা ইচ্ছা সেটা খান। খাওয়ার স্বাধীনতার এই পরিবর্তন মানুষ দারুণ উপভোগ করল। বুফের মাধ্যমে বিয়ের মেন্যু হয়ে উঠল গোটা দুনিয়ার স্বাদের প্রদর্শনী। এক কোনায় দেখা যায় থাই টম ইয়াম স্যুপের স্টেশন, গরম ধোঁয়া উঠে আসছে; আরেক দিকে বড় প্যানে সিজলার, ইতালীয়-কন্টিনেন্টাল ঢঙে চিকেন স্টেক। তার পাশে মান্দি-আরবি খাবার, যার নরম মাংস আর সুগন্ধি চাল অতিথিদের মুগ্ধ করে। ননস্টপ ভিড় ফুচকা স্টেশনেওপেঁপে মেশানো ফুচকা-ছোলা-দই-টক-মিষ্টি চাট।

বুফের আরেক আকর্ষণ স্টার্টারচিকেন উইংস, পনির পাকোরা, রোল, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বেবিকর্ন। শিশু থেকে বৃদ্ধসবাই নিজের মুড অনুযায়ী প্রথমেই রকমারি হালকা খাবার চেখে দেখতে আগ্রহী হন। ডেজার্টেও বিপ্লব ঘটায় বুফে। রসগোল্লা, ফিরনি, জর্দার পাশে জায়গা করে নিল বেক্ড রসগোল্লা, রসমালাই কেক, বাকলাভা, ক্যারামেল পুডিং, এমনকি চিজ কেকও। বিয়েকে একরকম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী বানিয়ে দিল ফিউশন ডেজার্টের। মেয়েপক্ষ আর ছেলেপক্ষের আতিথেয়তার প্রতিযোগিতায় বুফে যেন নতুন হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যার মেন্যু যত বৈচিত্র্যময়, সে তত এগিয়ে।

বুফে জনপ্রিয় হওয়ার আরেক কারণ পরিবেশনার স্বস্তি। একজন পরিবেশক কারো পাত মিস করলে বা বেশি ঢেলে দিলে কত কাণ্ডই না ঘটত! এখন আর সেই সুযোগ বা অভিযোগ কোনোটাই নেই। অতিথি যা খাবেন, তা নিজেই তুলে নেবেন। বাড়তি খাবার ম্যানেজ করাও সহজ। কমিউনিটি সেন্টারের লোকদের কাজও কম। তাই অনেক ক্যাটারার দ্রুত চলে যায় বুফে মেন্যুতে। বুফে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো যে এখন বর-কনে যা-ই হোক, অতিথিরা খোঁজেন বুফে স্টেশনে নতুন কী আছে। এই পরিবর্তন শুধু রুচির নয়, সামাজিক আচরণও পাল্টে দিয়েছে। বুফে লাইনে দাঁড়ানোর মধ্যে, শৃঙ্খলার সঙ্গে রকমারি খাবার পাতে তুলে নেওয়ার মধ্যে দারুণ এক স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যায়। তাই বলে পোলাও, রোস্ট, রেজালা কি এখন অতীত? না, সেটা বলা যায় না। বরং প্রজন্মভেদে বিভাজন স্পষ্ট। যাঁরা বিয়েতে খাবেন স্বাদের জন্য, তাঁরা চান রোস্ট, রেজালা, খুশকা পোলাও ইত্যাদি; আর যাঁরা ইনস্টাগ্রামে ছবি দেবেন, তাঁরা খোঁজেন বুফে স্টেশনে নতুনত্বহোক মান্দি, সুশি কিংবা পাস্তা।

বাঙালির বিয়ের ভোজ আসলে সময়ের সঙ্গে বদলানো এক লম্বা ইতিহাস। শুরু হয়েছিল বেহুলার শুক্তো দিয়ে; তারপর ঘিভাজা শাক, রসগোল্লা, মোরগ পোলাও, মোতি পোলাও, কাচ্চিসব পেরিয়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছে বুফের বহুরঙা টেবিলে। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি। বিয়েতে নিমন্ত্রণ মানেই খাওয়ানো এবং শেষে সেই পরিচিত প্রশ্নখাবার কেমন হলো? এই এক বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে বাঙালির ভোজসংস্কৃতির ইতিহাস।

ছবি : সংগৃহীত

 

 

 

ঢাকার ওয়েডিং ভেন্যু

আতিফ আতাউর

ঢাকার ওয়েডিং ভেন্যু
বিয়ের ভেন্যু হিসেবে আলাদা সুনাম রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা’র

শহরে বিয়ে অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন ভেন্যু, হল, কনভেনশন সেন্টার, পাঁচতারা হোটেলগুলোই বেশি জনপ্রিয়। শীত মৌসুমে ঢাকা শহরের চারদিকেই বিয়ের হিড়িক পড়ে যায়। তাই এই সময়ে বিয়ের ভেন্যু ভাড়া করা খুবই কঠিন কাজ। ক্ষেত্রভেদে দু-তিন মাস আগে বুকিং দিয়ে রাখতে হয়।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল

এখানে আরো আছে উইন্টার গার্ডেন। খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠান করতে যাঁদের পছন্দ, তাঁদের জন্য। গ্র্যান্ডিওর, সেপ্লনডিওর, এলিগ্যান্সতিনটি বিয়ের প্যাকেজ পাবেন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। গ্র্যান্ডিওর প্যাকেজটি নিলে বিনামূল্যে ভেন্যু সাজানো, হানিমুন স্যুটে রাতযাপন, এক ঘণ্টার স্পা করানোর সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া বিয়ে-পরবর্তী সময়ে আটটি ডিনার ভাউচার পাওয়া যাবে। সেপ্লনডিওর প্যাকেজ নিলে বিনামূল্যে ভেন্যু সাজানো, হানিমুন স্যুটে রাতযাপন এবং বিয়ে-পরবর্তী সময়ে চারটি ডিনার ভাউচার পাওয়া যাবে। রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুম, দৃষ্টিনন্দন বাগান, ক্রিস্টাল বলরুমও বিয়ে আয়োজনের জন্য আদর্শ।

আমারি ঢাকা

বিয়ে ও বিবাহবার্ষিকীর মতো জমকালো দাওয়াতের জন্য হোটেল আমারি ঢাকা অতিথির জন্য বিশেষ প্যাকেজ রেখেছে। ইডেন গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠান করতে চাইলে আলাদা করে হলের ভাড়া দিতে হবে না। বুফে রেস্তোরাঁয় রাতের খাবারের জন্য ভাউচারও দেওয়া হয়। সঙ্গে পাবেন এক কেজির একটি কেক এবং সকালের নাশতাসহ একটি জুনিয়র স্যুটে এক রাত থাকার সুযোগ। ১৪ তলায় অবস্থিত অঙ্কিতা, কারিশমা, দোয়েল এবং এ কে হলরুম ভাড়া করলে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি শহরের মনোরম দৃশ্যও উপভোগ করতে পারবেন অতিথিরা।

 

ঢাকার ওয়েডিং ভেন্যু
পাঁচ তারকা হোটেলের ছাদেও আয়োজন হয় বিয়ের অনুষ্ঠান

হলিডে ইন

হলিডে ইন হোটেলে সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম নামের তিনটি বিশেষ প্যাকেজ আছে। ১০০ অতিথি হলে হলের জন্য কোনো বাড়তি ভাড়া দিতে হয় না। নবদম্পতির বিনামূল্যে রাতযাপনের সুযোগ থাকবে এই প্যাকেজে। গোল্ড প্যাকেজ অনুষ্ঠান শেষে নবদম্পতি রাত যাপন করতে পারবেন জুনিয়র স্যুটে এবং সকালে নাশতাও খেতে পারবেন। প্লাটিনাম প্যাকেজে দম্পতির বাসা যদি হোটেল থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হয়, তাহলে হোটেল থেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা থাকবে। পাবেন এক্সিকিউটিভ স্যুটে রাতযাপনের সুযোগ।

হলিডে ইনের ইলিশ ভেন্যু

একটি মনোরম সাদা ব্যাংকুয়েট হল, যা নকশা করা হয়েছে প্রশান্তির আবহ তৈরির জন্য। ১৬ তলায় অবস্থিত দুই হাজার ৫১০ বর্গফুটের এই হল নৈসর্গিক হাতিরঝিল লেকসহ ঢাকার স্কাইলাইনের একটি অন্তরছোঁয়া ১৮০ ডিগ্রি প্যানোরমিক ভিউ জাহির করে।

রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেল

রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আছে বেশ কয়েকটি হল। এসব হলে নিয়মিত বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উত্সব, গ্র্যান্ড বলরুম, অন্তরা, লহরি, মাধবী, মল্লিকা হলের ভাড়া পড়বে দুই লাখ থেকে ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ছাদসহ মল্লিকা ভাড়া করতে চাইলে দাম পড়বে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। সুইমিংপুলের পাশের জায়গাটিও ভাড়া নেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে জায়গার জন্য দিতে হবে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

ঢাকার ওয়েডিং ভেন্যু
ছবি : সংগৃহীত

দি ওয়েস্টিন

বিয়ের আয়োজন করার জন্য দি ওয়েস্টিন পার্ল, রুবি ও ডায়মন্ড নামের তিনটি ভিন্ন ধরনের প্যাকেজ রয়েছে। ওয়েস্টিন ঢাকার পাঁচটি ছোটবড় হলরুমে নিজের মতো করে বিয়ের আয়োজন করতে পারেন। কেউ যদি নিজের পছন্দমতো কোনো প্যাকেজ সাজিয়ে নিতে চান, সেটিও করা সম্ভব। আছে পাঁচ-ছয় ধরনের খাবারের তালিকা। দিনটিকে বিশেষ করে তুলতে ওয়েস্টিনে আছে বিশেষ কেক ও ঘরভাড়ার প্যাকেজও।

ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট

ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের সেলিব্রেশন হল, রুফটপ গার্ডেন রেস্তোরাঁ, গ্র্যান্ড সামিট ১, ২, ৩ ও ৪-এ বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে। ছোটবড় বিয়ের আয়োজন মাথায় রেখে আটটি হলের মাধ্যমে ক্যাটারিং সার্ভিস দিচ্ছে হোটেলটি। বিশেষত তাদের সম্প্রতি রেনোভেটেড সেলিব্রেশন হলটি বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত স্মরণীয় করে তোলার মতো যেন এক স্বপ্নময় রাজকীয় প্রাসাদ! ঢাকা রিজেন্সির ১৪ তলায় অবস্থিত পাঁচ হাজার ৭২১ বর্গফুটের এই হলে রাউন্ড টেবিলে একসঙ্গে ৫০০ অতিথি স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নিতে পারেন। শীতের দুপুরে মিষ্টি রোদে ঢাকা রিজেন্সির রুফটপ গায়েহলুদের অনুষ্ঠানের জন্য চাহিদার শীর্ষে। হলরুমগুলোতে সব ধরনের ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ থাকলেও সাধারণত ওয়েডিংয়ের চাহিদা বেশি। এর প্রধান কারণ সবার সুবিধা অনুযায়ী হলসজ্জার সুযোগসহ হোটেলটির সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা।

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও

সোনারগাঁও হোটেলে বিয়ের জন্য তিনটি ভিন্ন সেট মেন্যু আছে। হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুম ছাড়াও সুরমা ও মেঘনা হলে বিয়ের অনুষ্ঠান করা যাবে। খোলা আকাশের নিচে করতে চাইলে বেছে নিতে পারেন হোটেলের ওয়েসিস ভেন্যু।

রেনেসাঁ হোটেল ঢাকা

এই হোটেলেও রয়েছে বিয়ে উত্সব আয়োজনের যাবতীয় ব্যবস্থা। দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এল আকৃতির বলরুমটি পরিচিত আর ইভেন্টস নামে। বলরুমকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। হলের ভাড়া এক লাখ টাকা থেকে শুরু, অতিথির সংখ্যা এবং পছন্দের ওপর নির্ভর করে খাবারের মেন্যুর দাম কমবেশি হয়ে থাকে। কাস্টমাইজেবল এই ভেন্যু পাঁচটি আলাদা ভাগ করা সম্ভব। তাই নিজের সুবিধামতো ছোট ছোট ভাগ করার সুযোগ থাকে। তা ছাড়া বিভিন্ন ছোট প্রোগ্রাম, যেমনপ্রি-ওয়েডিং, গায়েহলুদ, এনগেজমেন্ট পার্টি, রিসেপশন পার্টি ইত্যাদি আয়োজনের জন্যও দারুণ।

সিক্স সিজনস হোটেল

বিয়ের আয়োজনে সিক্স সিজনস হোটেল এক দারুণ ভেন্যু। এর সবচেয়ে চমত্কার ও বিলাসবহুল ভেন্যুর নাম গ্রীষ্ম বলরুম। তিন হাজার ৬৯৪ বর্গফুটের ভেন্যুটি ২২০ জন অতিথি আপ্যায়নের জন্য হতে পারে পারফেক্ট চয়েস। এর কাঠের তৈরি ছাদ এবং আধুনিক আলোকসজ্জা রুচিশীলতার পরিচয় বহন করে; আবার কাচের দেয়াল ভেদ করে পাওয়া যায় গুলশান লেকের মনোরম ভিউ। মাঝারি আকারের অনুষ্ঠান করতে চাইলে হেমন্ত হল হতে পারে বেটার অপশন। ২০০ অতিথি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন তিন হাজার ২৮৫ বর্গফুটের এই হল বেইসমেন্ট-২-এ অবস্থিত, যা কাঠের প্যানেল ও অডিও-ভিজ্যুয়াল ইকুইপমেন্টের সংমিশ্রণে চমত্কার আবহ ছড়িয়ে দেয়। আরো আছে বসন্ত হল। ছোট ও একান্ত ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য দারুণ। ১৪ তলায় অবস্থিত ৯৬৪ বর্গফুটের এই হল ৪০ জন অতিথির আয়োজনের জন্য খুবই স্টাইলিশ এক ভেন্যু, যেখান থেকে মনোমুগ্ধকর প্যানোরমিক ভিউ উপভোগ করা যায়।

সেনামালঞ্চ

এয়ারপোর্ট রোডে নেভাল হেডকোয়ার্টার্সের পশ্চিমে সেনামালঞ্চের অবস্থান। সেনামালঞ্চের দেখভাল করে থাকে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, তাই বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং অসামরিক মানুষের জন্য খরচের মাত্রাও আলাদা। সেনামালঞ্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর বাহ্যিক সৌন্দর্য। তা ছাড়া এর আয়তনও অনেক বেশি। সেনামালঞ্চের কনভেনশন হল পাঁচ হাজার অতিথিও ধারণ করতে পারে। দিনের বেলা সেনামালঞ্চের পুরোটাই ভাড়া নিতে চাইলে খরচ পড়বে সাড়ে তিন লাখ হাজার টাকা, আর রাতে হলে গুনতে হবে কাঁটায় কাঁটায় পাঁচ লাখ। তবে এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে ভাড়া নিলে ২০ শতাংশ কম খরচ হবে, কারণ এ সময় বিয়ের অফ সিজন। কেউ চাইলে পুরো ভেন্যু ভাড়া না নিয়ে যেকোনো এক ফ্লোরও ভাড়া নিতে পারেন। নিচতলার ভাড়া পড়বে আড়াই লাখ টাকা এবং ওপরতলার ভাড়া সাড়ে তিন লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে দিন ও রাতের কোনো তারতম্য নেই।

পিএসসি কনভেনশন হল

পুলিশ স্টাফ কলেজের পাশে মিরপুর ১৪ নম্বরে এর অবস্থান। এই কনভেনশন হলের প্রবেশপথেই নজর কাড়বে মন-মাতানো একটি বাগান। বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে এই বাগান লাইট ও ফুল দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো যায়। পিএসসি কনভেনশন হলের মূল বলরুমের আয়তন প্রায় ২৩ হাজার বর্গফুট, তাই বড় জমায়েত আয়োজন করা যায় খুব সহজেই। ভাড়া দেওয়ার জন্য পিএসসি কনভেনশন হলে দুটি ফ্লোর আছে। প্রথম ফ্লোরের খরচ বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এক লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে এক লাখ টাকা। দ্বিতীয় ফ্লোরের খরচ বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এক লাখ এবং বাকি দিনগুলোতে ৯০ হাজার টাকা। কেউ চাইলে দুটি ফ্লোরই একসঙ্গে ভাড়া নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবারের জন্য এক লাখ ৮০ হাজার এবং বাকি দিনগুলোর জন্য এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। তবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যের জন্য খরচ আরো কম।

রাওয়া ক্লাব

রাওয়া ক্লাব পরিচালিত হয় রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন দ্বারা। ২০১৩ সালে এই কনভেনশন হল প্রথম চালু হয়। মহাখালী ফ্লাইওভারের পাশে বীর-উত্তম জিয়াউর রহমান সড়কে রাওয়া ক্লাব অবস্থিত। রাওয়া ক্লাবে ভিন্ন ক্যাপাসিটির তিনটি হল আছেইগল, অ্যাংকর ও হেলমেট। পর্যায়ক্রমে এই হলগুলোর ধারণক্ষমতা ২০০, ৪০০ ও ১০০০। সকালের শিফটে ১০টা-৪টার মধ্যে এই হলগুলো ভাড়া নিতে গুনতে হবে যথাক্রমে ৩০ হাজার, ৪৫ হাজার ও এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর রাতের শিফটে ৬টা-১০টায় খরচ আরো বেড়ে যাবে। তখন খরচ পড়বে যথাক্রমে ৪০ হাজার, ৬০ হাজার ও দেড় লাখ টাকা। রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের জন্য এই খরচ ৭০ শতাংশ কম।

পুলিশ কনভেনশন হল

পুলিশ কনভেনশন হল রমনা থানার পশ্চিমে ইস্কাটন গার্ডেন রোডে অবস্থিত। তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এই ভেন্যু এরই মধ্যে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। এখানেও আছে ভাড়া নেওয়ার মতো দুটি ফ্লোর। প্রথম ফ্লোরের ধারণক্ষমতা ৮০০ এবং দ্বিতীয় ফ্লোরের এক হাজার ৬০০ জন। রাওয়া ক্লাবের মতোই দুই শিফটে পুলিশ কনভেনশন হল ভাড়া দেওয়া হয়। সকালের শিফট ১১টা-৫টা এবং রাতের শিফট ৬টা-১২টা। বছরের কোন সময়ে বিয়ে হচ্ছে, সপ্তাহের কোন দিনে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, কোন শিফট ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে পুলিশ কনভেনশন হলের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

শাহীন হল

তুলনামূলক কম খরচে ভালো ভেন্যু হিসেবে শাহীন হল অন্যতম। তেজগাঁও পুরনো এয়ারপোর্ট রোডে বিএএফ শাহীন কলেজে এই ভেন্যুর অবস্থান। শাহীন হলের স্টেজ ডিজাইন ঢাকা শহরের বিয়ের ভেন্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা।

শাহীন হলের ভাড়ারও একদম ফ্ল্যাট। অসামরিক কেউ ভাড়া নিতে চাইলে যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য ৯৮ হাজার টাকা দিতে হবে, তা যে সময়ই হোক না কেন। আর বর্তমান অথবা সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের দিতে হবে ১৪ হাজার টাকা।

এগুলো ছাড়াও ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে আছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সেনাকুঞ্জ, আইসিসিবি ইত্যাদি। তবে মোটামুটি হাতের নাগালের মধ্যে ভালো ভেন্যুর কথা চিন্তা করলে এগুলোই প্রথমে আসে।

ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা

জমকালো বিয়ের আয়োজনের জন্য সুপরিচিত আইসিসিবি [ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা]। এতে রয়েছে ছয় লাখ ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গায় সুবিশাল আন্তর্জাতিক মানের পাঁচটি হল। আছে দেড় হাজার গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা এবং হেলিপ্যাড ও স্যাটেলাইট রিট্রিট সেন্টারসহ অন্যান্য অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। প্রতিটি হলের ধারণক্ষমতা ১০০ থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার জন।

ঠিকানা : কুড়িল বিশ্বরোড, ৩০০ ফিট পূর্বাচল হাইওয়ে রোড, ঢাকা

সেনাকুঞ্জ

এখানে রয়েছে দুটি কমিউনিটি সেন্টারট্রাস্ট মিলনায়তন ও সেনাকুঞ্জ-১। মূলত সামরিক বাহিনীর সদস্য ও তাঁদের পরিবারের জন্য তৈরি হলেও বেসামরিক লোকজনও এখানে বিয়ের অনুষ্ঠান করতে পারেন। এখানে ৬৫০ জনের আয়োজন করা সম্ভব। তবে ভাড়া সামরিক ও বেসামরিক আয়োজকভেদে ভিন্ন।

ঠিকানা : ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র

কার্নিভাল ও হারমনি হল দুটি বড়। ধারণক্ষমতা ৫০০ জন। এ ছাড়া ছোট একটি হল রয়েছে।

ঠিকানা : আগারগাঁও, শেরেবাংলানগর, ঢাকা

স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টার

মোট ছয়টি হল রয়েছে। এখানে সর্বোচ্চ ৩৫০ জনের খাবার সরবরাহ করা যায়। আলাদা করে কোনো হলভাড়া দিতে হয় না। তবে আলোক ও মঞ্চসজ্জার জন্য আলাদা খরচ আছে।

ঠিকানা : বাড়ি-১৯, সড়ক-৭, গুলশান-১, ঢাকা

ইমানুয়েলস কনভেনশন সেন্টার

ধারণক্ষমতা এক হাজার জন। বুকিংয়ের জন্য ন্যূনতম দুই মাস আগে যোগাযোগ করতে হয়।

ঠিকানা : সীমান্ত স্কয়ার (পঞ্চম তলা), ধানমণ্ডি, ঢাকা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পুরান ঢাকার বিয়ের পদ | কালের কণ্ঠ