• ই-পেপার

[ প্রাণ প্রকৃতি ]

সবুজ তাউড়া আর বামন মাছরাঙা

  • শরীফ তানভীর আহম্মেদ

[ আরো জীবন ]

বেঞ্চটাই তাঁর বিছানা, দায়িত্বই জীবন

১৯৮৫ সাল থেকে প্রায় চার দশক ধরে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

বেঞ্চটাই তাঁর বিছানা, দায়িত্বই জীবন
মাত্র ১২ হাজার টাকায় ছয়জনের সংসার চালাতে হয় রাখালকে। ছবি : লেখক

আওয়াজটা আসছিল জগন্নাথ হলের রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলা থেকে। হাঁটুতে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন কেউ। কাছে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী রাখাল চন্দ্র দে। সবার কাছে যাঁর পরিচিত রাখালদা নামে। কী এমন হলো যে ভরদুপুরে কাঁদছেন? বললেন, দাদা রে, মার কথা মনে পইড়ছে। মা বুড়া অই গেছে। ছ মাস অইল মাইয়াটারেও দেখি না। চাইলেই তো বাড়ি যাইতাম হারি (পারি) না।

কেন তিনি বাড়ি যেতে পারছেন না? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে রাখালের জন্মস্থান ফেনী থেকে ঘুরে আসা যাক। শৈশবে ডানপিটে ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে বই-খাতা রেখে পাড়া দাপিয়ে বেড়াতেন। ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হবেন। ধরবেন সংসারের হাল। অভাবের কারণে তা আর হয়ে উঠল না। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। অনটনের সংসারে অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। ১৯৮৫ সালে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে কিশোর রাখাল চলে আসেন রাজধানীতে। তাঁর ঠিকানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। থালা-বাসন ধোয়ার কাজ জোটে সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে। মাসে ১০০ টাকা বেতন। কয়েক বছর পর সেটি বেড়ে হয় ৩০০ টাকা। সুধীরবাবু মারা যাওয়ার পর রাখাল চলে যান হলের জিতেনবাবুর ক্যান্টিনে। সেখানে দৈনিক ৩০ টাকা করে পেতেন। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই হলেই আছেন। রাখালের বেতন এখন মাসে ১২ হাজার টাকা। এখন তিনি কাজ করেন রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ায়। সকাল-বিকাল তরকারি কাটেন। দুপুর এবং রাতে ছাত্রদের খাবার পরিবেশন করেন। জগন্নাথ হলের ছাত্ররা রাখালকে চেনেন কিছুটা রাগী মানুষ হিসেবে। এর পেছনে আছে এক করুণ গল্প। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক রাখাল। বাড়িতে তাদের সঙ্গে থাকেন মা-ও। প্রায় ১০ বছর ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি তাঁর ছোট ভাই। প্যারালিসিসে আক্রান্ত সেই ভাইয়ের ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় সব খরচ রাখালকেই বহন করতে হয়। এমন অবস্থায় অনেককে দেখা যায়, ভাই তো দূরে থাক, মায়েরও খোঁজ নেন না। রাখাল ব্যতিক্রম। মা ও অসুস্থ ভাইকে নিয়ে সংসারের বিশাল বোঝা সামলান একা। তাঁর আয় স্বল্প, কিন্তু মন বড়। রাখালের ছেলে এখন চট্টগ্রাম পলিটেকনিকে এবং মেয়েটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের খরচও দিতে হয়। বৃদ্ধা মা ও নিজের কন্যাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া-আসায় প্রায় দুই হাজার টাকা লাগে। ফলে সংসারের খরচের কথা ভেবে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ দেন। রাখালের কান্নার কারণ এই আর্থিক অসংগতি। বললেন, বাড়িত মা আছে, মাইয়া আছে। কিন্তু মন চাইলেই তো আর যাইতাম হারি না। যাওন-আইওনের ম্যালা খরচ।

এখন রাতে রবীন্দ্র ভবনের পাঁচতলার বারান্দায় একটি বেঞ্চের ওপর ঘুমান। রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক শংকর বিশ্বাস বলেন, ২৫-২৬ বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে রাখাল। ফাঁকিবাজি করে না। খুব সৎ। তবে মাথাটা একটু গরম তাঁর। এই হলের বহু ঘটনার সাক্ষী রাখাল। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, আমনেরা তো সব দ্যান (দেখেন) ন। অন (এখন) তো হল শান্ত। আমি দেখছি, সুধীরবাবুর ক্যান্টিনে ছাত্ররা টেবিলে অস্ত্র রাখি খাইত। ডরে কেউ কথা কওয়ার সাহস হাইত (পেত) না। কদিন হর হর (পর পর) মারামারি লাইগত। কৈশোর-যৌবন পার করেছেন এই হলে। বহু ছাত্রকে দেখেছেন। সবাই এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু রাখালের ভাগ্য বদলায়নি। সবাই চলে যায়, কিন্তু আংগো (আমাদের) খবর কেউ লয় না (রাখে না)। হলের যেসব দাদা এখন বড় বড় চাকরি করেন, তাঁরা যদি আমারে একটু সহযোগিতা করেন, তাইলে আমার একটু উপকার হয়। সজল চোখে বলছিলেন রাখাল।

 

দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যারিয়াল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার

সেরাদের সেরা আমাদের রনি

আকাশ থেকে তোলা ছবির আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যারিয়াল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এই প্রতিযোগিতায় এবার সেরাদের সেরা হয়েছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী আজিম খান রনি। তাঁর আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছেন আল সানিকে

সেরাদের সেরা আমাদের রনি

ক্যামেরা নিয়ে আমার পথচলা শুরু ২০০৯ সালে। তখন থেকেই ট্রাভেল, ডকুমেন্টারি, কালচার বা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্পগুলো ফ্রেমবন্দি করার তীব্র নেশা। তবে নিজের ভালো ক্যামেরা ছিল না। একটু একটু করে নিজের পকেট খরচ কমিয়ে টাকা জমালাম। ২০১৫ সালে প্রায় এক লাখ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম জীবনের প্রথম ক্যামেরাটি। তখন থেকেই চারপাশকে একটু ভিন্নভাবে, অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কৌতূহল তাড়া করত। সমতল থেকে চারপাশের ছবি তোলার সময় হুট করে একদিন মনে হলোআচ্ছা, ওপর থেকে দেখলে এই পুরো ক্যানভাসটি কেমন দেখাত? ২০১৮ সালের দিকে ড্রোন বেশ সহজলভ্য হলো, দেরি না করে একটি ড্রোন কিনে নিলাম। উড়ানোর পর উইন্ডো স্ক্রিনে যখন ওপরের দৃশ্যটি প্রথম ভেসে উঠল, আমি সত্যি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম! মাটি থেকে যে জ্যামিতিক নকশা, বিশালতা বা মানুষের সংগ্রামী জীবনের ক্যানভাসটি আমরা সচরাচর দেখতে পাই না, ড্রোনের লেন্সে সেটি একদম পরিষ্কার, অচেনা এক রূপ নিয়ে ধরা দিল। সেই থেকে ড্রোনের চোখে পৃথিবী দেখার রোমাঞ্চকর যাত্রা শুরু আমার। ছবি তোলার এই অদম্য নেশায় এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৮টি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি।

সেরাদের সেরা আমাদের রনি
ফাস্টিং ফেস্টিভ্যাল ঢাকা

দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যারিয়াল ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ আগের। গত বছর এই প্রতিযোগিতার সেরা ১০১ আলোকচিত্রীর তালিকায় ঠাঁই পেয়েছিলাম। তবে এবারের সেরা হওয়ার আনন্দটাই আলাদা। পুরস্কার হিসেবে ট্রফির পাশাপাশি পেয়েছি পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার প্রাইজ মানি [বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় লাখ টাকারও বেশি]।

সেরাদের সেরা আমাদের রনি
গ্লিডিং থ্রু সেরেনিটি সুইজারল্যান্ড

তবে এই অর্জনের পেছনের গল্পটি সহজ ছিল না। পুরস্কারজয়ী ছবিটি ভারতের দিল্লির যমুনা ঘাটে তোলা। যেকোনো নিখুঁত অ্যারিয়াল শটের পেছনে যে কতটা মানসিক ধকল আর ধৈর্য লাগে, তা এই ছবিটির মেকিং না জানলে বোঝা যাবে না। দিল্লিতে প্রচণ্ড শীতে ভোর ৪টা থেকে ৫টার আলো-আঁধারিতে ড্রোন উড়াতে হয়েছিল। কারণ ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন আলোর ম্যাজিকই আলাদা। নিখুঁত ফ্রেম, মানুষ এবং শত শত পাখির সেই নাটকীয় মিতালি এক ফ্রেমে আনার জন্য টানা চার-পাঁচ দিন একনাগাড়ে খেটেছি। কোনো কোনো ছবির জন্য তো ২০ থেকে ২৪ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। প্রকৃতির ওপর আমাদের হাত নেই। সেকেন্ডে মাত্র ১০ থেকে ২০ মিটার গতির নিখুঁত উইন্ড স্পিড না মিললে ড্রোন স্থির রাখা যায় না। ১ মিলিমিটার থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্বের নিখুঁত অ্যাঙ্গল তৈরি করতে ড্রোনের ক্যামেরা স্লাইডারকে স্লো মোশনে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। প্রতিযোগিতার জন্য একটি পারফেক্ট মাস্টারশট চূড়ান্ত করার আগে আমাকে অন্তত ৫০০ থেকে ৭০০টি ট্রায়াল শট নিতে হয়েছিল।

সেরাদের সেরা আমাদের রনি
হার্ভেস্টিং রেড চিলিস বগুড়া, বাংলাদেশ

 

আমার বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনার একটা বড় অংশ কেটেছে বগুড়ায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকদুটোই সম্পন্ন করেছি বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য আসি ঢাকায়। ঢাকা কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করি। পেশাগত জীবনে ১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন নামি টেলিভিশন চ্যানেলে ভিডিও জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছি। দিনভর যান্ত্রিক ক্যামেরার পেছনে কাজ। এক ফাঁকে পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট থেকে ফটোগ্রাফির ওপর অ্যাডভান্সড কোর্স করি। বর্তমানে আমি ফ্রান্সপ্রবাসী। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমেই এই ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকেই বলেন, অ্যারিয়াল ফটোগ্রাফি বেশ ব্যয়বহুল। কথা সত্যি। গিয়ার আর ট্রাভেলের পেছনে বেশ বড় অঙ্কের টাকা খাটাতে হয়।

সেরাদের সেরা আমাদের রনি
থাউজেন্ডস অব মাইগ্রেটরি বার্ডস ফিডিং। যমুনা ঘাট, ভারত। আলোকচিত্রী : আজিম খান রনি

প্রতিটি জায়গারই একটি নিজস্ব রূপ বা গল্প থাকে। যেমনসুইজারল্যান্ডের জুরিখ লেকের শান্ত পরিবেশের একটি নিজস্ব স্নিগ্ধতা আছে, আবার বগুড়ায় চাতালে লাল মরিচ শুকানোর যে দৃশ্য, সেখানে এক অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা আর রঙের খেলা তৈরি হয়। সব সময় ছবিতে শক্তিশালী কম্পোজিশন, চমৎকার আর মানুষের জীবনের একটি অর্থপূর্ণ মুহূর্ত খুঁজি। এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ১৬টি বড় আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার ছবি প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে লন্ডন, ইতালি, রাশিয়া, স্পেন ও ভারতের মতো দেশের বড় বড় আন্তর্জাতিক এক্সিবিশনে। আমার কাছে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানে শুধু কোনো পুরস্কার জেতা বা জাজ হওয়া নয়, বরং নিজেকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করা। বিশ্বের সেরা আলোকচিত্রীদের কাজ দেখে নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ শেখার একটা মাধ্যমও দেশ-বিদেশের এসব প্রতিযোগিতা।

[ দিনগুলি মোর ]

আমাদের আব্বা

আমাদের আব্বা
অলংকরণ : তানভীর মালেক

বাবাকে আমরা আব্বা বলে ডাকতাম। আব্বাকে কখনো আমরা তুমি বলে সম্বোধন করতাম না, ‘আপনি’ বলতাম। তিনি আমাদের বোনকে ডাকতেন ‘গেদি’ আর আমাকে ও বড় ভাইকে ডাকতেন ‘গেদা’। 

আমাদের আব্বা শিক্ষিত ছিলেন না। লাঙলের মুঠি ধরা মুষ্টিবদ্ধ হাতে কলম ধরা অত সহজ ছিল না তাঁর। তবে তিনি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। সাহস করে সহোদরের সঙ্গে ক্লাস টুতে পড়তে গিয়েছিলেন। শ্রেণি শিক্ষক আব্বাকে বললেন, ‘তুমি তো বার্ষিক পরীক্ষা দাওনি, তোমাকে আবার ক্লাস ওয়ানেই পড়তে হবে।’ এ কথা শোনার পর আব্বা আর কোনো দিন স্কুলে যাননি। 

তবু আব্বা ছিলেন আমাদের তিন ভাই-বোনের বর্ণ পরিচয়ের শিক্ষক। অ, আ, ক, খ, ১, ২ লেখা শেখেছি আব্বার কাছে। কিভাবে কলম ধরতে হয়, কিভাবে খাতায় মার্জিন টানতে হয়—সব শিখিয়েছেন আব্বা।

আমাদের আব্বা একজন পরিশ্রমী কৃষক। তা-ও আবার নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক। তিনি ফসলের মাঠকেই ভালোবাসতেন।  

আব্বা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারতেন না, আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। কৃষিকাজ শেষ করে বাড়িতে এসে আমাদের খোঁজ নিতেন। গ্রামের হাট থেকে এসে মাকে বলতেন, ‘গেদা কনু গেছে? গেদি?’

আমরা দৌড়ে এসে আব্বাকে জড়িয়ে ধরতাম। তিনি পকেট থেকে মুড়মুড়ি, বাতাসা, সন্দেশ, কখনো চিনিহাজ বের করে হাতে দিতেন। আমরা তা নিয়ে খুশি হতাম, আনন্দে লাফালাফি করতাম। 

১১ বছর চলছে আমরা আব্বাকে আর আব্বা বলে ডাকতে পারি না। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট। এর পর থেকে আমাদের কেউ গেদা, গেদি বলে ডাকে না। আব্বার মুখ থেকে সেই গেদা আর গেদি ডাক কত যে মধুমাখা ছিল, কত স্নেহ-মমতা ছিল, বড় হয়ে এত দিন পরে এসে বুঝলাম। 

আব্বা, আমরা তিন ভাই-বোন এখন অনেক বড় হয়েছি। তার পরও আমরা আপনার মুখের সেই গেদা আর গেদি ডাক খুব মিস করি। 

আব্বা, এই যে আব্বা। আপনি কি শুনছেন?

 

মোজাম্মেল হক সজল

প্রভাষক (বাংলা)

হাতিয়া ডিগ্রি কলেজ, সখীপুর, টাঙ্গাইল

 

 

[ প্রাণ-প্রকৃতি ]

কী খেয়ে বাঁচবে কড়ি কাইট্টা?

সরওয়ার পাঠান

কী খেয়ে বাঁচবে কড়ি কাইট্টা?
দেশি কড়ি কাইট্টা ছবি : শুভব্রত সরকার

কৈশোরে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল আমাদের গ্রাম। শত শত পাখি, বহু জাতের স্তন্যপায়ী, অসংখ্য সরীসৃপ আর কিছু উভয়চর প্রাণীর সরব উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল প্রকৃতি। শৈশব থেকেই আমার দৃষ্টি ছিল ওদের ওপর। কৈশোরে না বুঝে ওদের অনেকের পেছনে ছুটেছি গুলতি হাতে।

একদিন গুলতি হাতে বাড়ির অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীপারের এক বাঁশঝাড়ের ভেতর হাঁটছিলাম। হঠাৎ সামনে সাদা কিছু একটা দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কাছে গিয়ে জিনিসটি হাতে তুলে নিতেই দেখলাম একটি ডিম, আকারে দেশি মুরগির ডিমের চেয়ে কিছুটা ছোট, লম্বাটে ধরনের। সাদা ডিমটি হাতে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। এখানে ডিম এলো কোথা থেকে? তখনই চোখে পড়ল যে নরম ঝুরঝুরে মাটির ওপর থেকে ডিমটি নিয়েছিলাম, সেখানে আবছাভাবে সাদাটে আরো কিছু দেখা যাচ্ছে। হাত দিয়ে মাটি সরাতেই প্রায় ১০টির মতো ফকফকা সাদা ডিম বেরিয়ে এলো। আমার সঙ্গে ছিল গ্রামের এক দুর্দান্ত শিকারি কিশোর দুলাল। গ্রামীণ বনের বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সেই বয়সেই বেশ ভালো জ্ঞান তার। সে ডিমগুলো দেখে বলে উঠল, ‘এইগুলি কাইট্টার (কচ্ছপ) ডিম।’ চমকে উঠলাম। কারণ কচ্ছপ যে মাটির নিচে ডিম পাড়ে, এটি জানা ছিল না। দুলাল তখন সবজান্তার মতো মাথা দুলিয়ে বলল, ‘জানোস, কাইট্টায় কিন্তু চোখের দৃষ্টি দিয়া ডিম ফোটায়, মাটির নিচে ডিম পাইড়া একটু দূরে বইসা একদৃষ্টিতে জায়গাটার দিকে চাইয়া থাকে, আর তার চোখের তাপে একসময় ডিম ফুইট্টা বাচ্চা বাইর হইয়া আসে।’ কথাগুলো বলে সে আশপাশে কচ্ছপ খুঁজতে লাগল। হেসে বললাম, দূর ব্যাটা চোখের তাপে আবার ডিম ফুটে নাকি, এটি অসম্ভব ব্যাপার।

কী খেয়ে বাঁচবে কড়ি কাইট্টা?

কচ্ছপের ডিম দেখে আমার রবিদাসপাড়ার লিলির মায়ের কথা মনে পড়ল। রবিদাসরা শজারু, শূকর থেকে শুরু করে ইঁদুর পর্যন্ত ভক্ষণ করে থাকে। গুইসাপ কিংবা কচ্ছপের ডিম কোনোটাতে তাদের অরুচি নেই। সেই পাড়ার এক দীর্ঘদেহী নারী ছিলেন লিলির মা, আমরা তাঁকে খুব ভয় পেতাম। তিনি ছিলেন সূর্যপূজারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। চোখ দুটি ছিল রক্তজবার মতো লাল। মাঝেমধ্যে শিকার করা প্রাণী নিয়ে যেতাম তাঁর কাছে। আসলে ভাব জমানোর চেষ্টা। তিনিও আমাকে বেশ আদর করতেন। ফাঁদে আটকে পড়া ইঁদুর আর কাঠবিড়ালি নিয়মিত তাঁর কাছে সরবরাহ করতাম। তাই কচ্ছপের ডিমগুলো দেখে সবার আগে তাঁর কথা মনে পড়ল। এগুলো দেখে তিনি নিঃসন্দেহে খুব খুশি হবেন। এগুলো তাঁর কাছে নিয়েও গিয়েছিলাম। তবে সেই কম বয়সী অপরিপক্ব মাথায় একবারও সেই চিন্তা আসেনি যে কাজটি মোটেও ঠিক হচ্ছে না।

সেদিন যার ডিম খুঁজে পেয়েছিলাম, সেটি দেশি কড়ি কাইট্টা। গ্রামের এমন কোনো ডোবা, নালা, বিল কিংবা পুকুর ছিল না, যেখানে তার অস্তিত্ব নেই। ডুবিয়ে রাখা নৌকার গলুইয়ে কিংবা জলাশয়ের পারে বহুবার তাদের রোদ পোহাতে দেখেছি। মানুষের সাড়া পেলে ধুম করে পানিতে নেমে যেত। সবচেয়ে ভালো লাগত, যখন এদের বাচ্চারা গলা উঁচু করে জলের ওপর ভেসে থাকা মরা ডালের ডগায় বসে থাকত। যেই ওদের ধরার জন্য কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম, ওরা টুপ করে পানিতে পড়ে হারিয়ে যেত। এভাবে ডালের ডগায় বসে থাকা কড়ি কাইট্টার বাচ্চার দিকে ঢিল ছোড়া গ্রামের শিশুদের এক মজার খেলা ছিল।

চৈত্র মাসের শেষে স্ত্রী কড়ি কাইট্টা জলাশয়ের পাশের বাঁশঝাড় কিংবা ঝোপ-জঙ্গলের নিচের নরম মাটি খুঁড়ে ডিম পাড়ত। এরপর ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ডিমগুলোকে ঢেকে সে চলে যেত। সূর্যের আলোর উষ্ণতায় একসময় ডিমগুলো থেকে বাচ্চা ফুটে বেরিয়ে আসত। এরপর ওরা দল বেঁধে রওনা হতো জলাশয়ের উদ্দেশে। সদ্য ফোটা বাচ্চারা নির্ভুল নিশানায় ঠিকই পৌঁছে যেত জলাশয়ের কাছে, এ যেন প্রকৃতির এক অতি রহস্যময় ইঙ্গিত।

শুকনা মৌসুমে যখন বেশির ভাগ জলাশয় শুকিয়ে যেত, কড়ি কাইট্টা লুকিয়ে থাকত মাটির নিচে। তখন জমি চাষ করার সময় কৃষকের লাঙলের ডগায় উঠে আসত এদের দেহ। এ ছাড়া ঝোপঝাড়ের নিচে শুকনা পাতা ঝাড়ু দেওয়ার সময় কড়ি কাইট্টা খুঁজে পাওয়া যেত। মুসলমান ছাড়া অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে কচ্ছপের মাংস অতি প্রিয়। অনেকের কাছে আবার এটি ‘জল খাসি’ নামে পরিচিত। কড়ি কাইট্টার ওজন সর্বসাকল্যে দুই-আড়াই কেজি। ওজন কিংবা সংখ্যা—দুইভাবেই তখন খোলাবাজারে কড়ি কাইট্টা বেচাকেনা চলত।

শীতকালে বেশির ভাগ জলাশয় শুকিয়ে যেত। কচ্ছপ শিকারিদের ছইওয়ালা নৌকা এসে ভিড়ত নদীর ঘাটে। ওরা আসত গাজীপুরের নাগরী অঞ্চল থেকে। নাগরীর খ্রিস্টানপাড়ায় কচ্ছপের বেশ চাহিদা ছিল তখন। নৌকায় করে আসা কচ্ছপ শিকারিদের প্রত্যেকেই ছিল অভিজ্ঞ ‘ট্র্যাকার’। বলতে গেলে সারা দিন ওদের পেছনে লেগে থাকতাম। সকালে নৌকা থেকে নেমে শিকারিরা সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ত। ওদের হাতে থাকত বাঁশের হাতলযুক্ত লোহার ত্রিফলা। খাল-বিল আর পুকুরপারে কচ্ছপ থাকতে পারে এমন সব স্থানে ওরা ত্রিফলা দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করে যেত। যখন হঠাৎ লোহার ফলার সঙ্গে শক্ত কিছুর আঘাত লেগে কট করে শব্দ হয়ে উঠত, তখনই ওরা থমকে দাঁড়িয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করে দেখত। এভাবেই মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসত কড়ি কাইট্টার পিঠের কঠিন খোল। এরপর ওরা সঙ্গে থাকা বস্তায় ভরতো। বিকেলে শিকারিরা বস্তা ভর্তি কচ্ছপ নিয়ে নদীর ঘাটে চলে আসত। এভাবে যত দিন না নৌকা পরিপূর্ণ হয়, ওরা গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়াত কচ্ছপের সন্ধানে।

দেশি কড়ি কাইট্টাকে ইংরেজিতে বলা হয় Indian Roofed Turtle। এই নামকরণের পেছনের কারণ হচ্ছে, ওদের উঁচু পিঠ, যা দেখতে অনেকটা ঘরের চালের মতো ঢালু। বৈজ্ঞানিক নাম Pangshura Tecta. একসময় বাংলাদেশের সব জলাশয়ে কড়ি কাইট্টার দেখা মিলত। এখন বলতে গেলে এদের আর দেখাই যায় না। কেন এমনটি হলো? প্রথমেই বলতে হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা। দেশের বেশির ভাগ প্রাকৃতিক জলাশয়, বিশেষ করে পুকুর ও বিলগুলো পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক মৎস্য খামারে। চাষের শুরুতে প্রতিটি জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে সব দেশি মাছ এবং জলজ প্রাণী মেরে ফেলা হয়। এই প্রবল অপরাধে অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো মৃত্যু হয়েছে হাজার হাজার কড়ি কাইট্টার। এ ছাড়া দেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে নদীদূষণ। অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো কড়ি কাইট্টার জীবন আজ তাই বিপন্ন। বহু নদীর পানি পরিণত হয়েছে বিষের তরলে। সেখানে কোনো জলজ উদ্ভিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। নেই শৈবাল, নেই কুচো চিংড়ি। কড়ি কাইট্টা কী খেয়ে বাচবে? যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তাদের প্রয়োজনে একের পর এক জলাশয় ভরাট করে তৈরি করেছে বসতবাড়ি কিংবা ফসলের জমি। এতে সংকুচিত হয়ে এসেছে কড়ি কাইট্টার আশ্রয়স্থল। অবাধ শিকার এদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরো একটি বড় কারণ। কচ্ছপ শিকারিরা খুবই পারদর্শী। দীর্ঘ সময় ধরে ওরা খুঁজে খুঁজে নৌকা বোঝাই করে এদের নিয়ে গেছে। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন প্রণীত হওয়ার পর কচ্ছপ শিকার কমেছে। বন বিভাগের পাশাপাশি বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে কচ্ছপসহ বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায়। তাই বিশ্বাস করি, দেশি কড়ি কাইট্টা আবার স্বাভাবিক সংখ্যায় ফিরবে বাংলার বুকে।