বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনায় মামলা করেছে পুলিশ। ওই মামলায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে থানার উপপরিদর্শক ওমর ফারুক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। পরে অভিযান চালিয়ে ১৮ আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার আসামিদের আদালতে হাজির করলে বিচারক তাঁদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে গ্রেপ্তারকৃত এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে আহত করা হয়।
মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ মাসুদ খান জানান, হামলার ঘটনার পর থেকেই থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে হামলায় জড়িত ১৮ জনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হামলায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে চুরি, মাদকসহ একাধিক মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, থানার হাজতে থাকা অবস্থায় রিয়াজ নিজেই নিজের মাথায় আঘাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত ১১টার দিকে তাঁকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এলাকায় রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর বিকেলে কয়েক শ মানুষ মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালায়। এ সময় ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে মারধর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ ঘটনায় পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হন।
পুলিশ হামলাকারীদের চিহ্নিত করে যে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করে, তাঁরা সবাই উপজেলার ফুল্লশ্রী গ্রামের বাসিন্দা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ফুল্লশ্রী গ্রামের মান্নান ফকির (৬৫), তানজিলা বেগম (২৬), সিদ্দিক ফকির (৬০), ঝুমুর আক্তার (৩৬), নাছিমা বেগম (৪৫), মোসা. তাহমিনা (৫০), হাবিবুর রহমান (৪৫), গিয়াস উদ্দিন ফকির (৬২), রিফাত ফকির (১৮), মমতাজ বেগম (৬০), ময়না বেগম (৪৮), শারমিন আক্তার (২৫), রাজু হাওলাদার (১৮), মনোয়ারা বেগম (৫০), মো. সবুজ ফকির (৩২), আসমা বেগম (৩৪), নাজমা আক্তার (৪০) ও নাইম ফকির (১৮) ।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নিন্দা
বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামিমা পারভীন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত বুধবার আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ চুরির মামলায় বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের বাসিন্দা রিয়াজ ফকির (২৬) নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে। রিয়াজের বিরুদ্ধে আগে থেকেই থানায় মাদকসংক্রান্ত মামলা ছিল। থানায় হাজতে থাকাকালীন মাদকাসক্ত রিয়াজ নিজের মাথায় নিজে আঘাত করে রক্তাক্ত হন। পুলিশ দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
কিন্তু পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে এলাকায় রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই গুজবকে কেন্দ্র করে একদল লোক সংঘবদ্ধ হয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালায় এবং ভাঙচুর করে। এ সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালায়। গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা বাংলাদেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতি’। এমন হামলা শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিই নয়, বরং এটা জননিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি।
বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন দেশের সব নাগরিকের প্রতি আহবান জানাচ্ছে যে আপনারা মিথ্যা বা গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রচলিত আইনকে শ্রদ্ধা করুন, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করুন এবং যেকোনো অভিযোগ বা অসন্তোষের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণ করুন, যার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়।