বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতির ইতিহাসে পাটের অবস্থান অনন্য। একসময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় পাটকে বলা হতো ‘সোনালি আঁশ’। দীর্ঘ সময়ের ঐতিহ্য বহনকারী এই ফসল এখনো দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। তবে পাট চাষে দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত বীজের সংকট ও আমদানিনির্ভরতা।
বর্তমানে দেশে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবছর পাঁচ থেকে ছয় হাজার টন পাটবীজের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বছরে মাত্র দুই হাজার টন উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারে। বাকি চার হাজার টন বীজ ভারত থেকে আমদানি করতে হয়।
সূত্র জানায়, এই বীজ আমদানি করতে প্রতিবছর সরকারের ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি আমদানি করা বীজের গুণগত মান নিয়েও কৃষকের মধ্যে রয়েছে নানা অভিযোগ। ফলে মানসম্মত দেশীয় পাটবীজ উৎপাদন বাড়াতে জোর দিচ্ছে সরকার।
পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনার পর উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে বিএডিসি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে সংস্থাটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে পাটবীজের উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের চাহিদার পুরোটা মেটাতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ উৎপাদনবর্ষে ১০ কোটি টাকার নতুন একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এই সময়ে পাটবীজ উৎপাদন দুই হাজার ২১০ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে উৎপাদন পাঁচ হাজার টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আশা করছে সরকার।
বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক দেবদাস সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে বিএডিসির ছয়টি চুক্তিভিত্তিক পাটবীজ উৎপাদন জোন রয়েছে। নতুন কর্মসূচির আওতায় আগামী দুই বছরে আরো ১২টি নতুন চুক্তিভিত্তিক চাষি জোন স্থাপন করা হবে। এতে মোট জোনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৮টিতে। পাশাপাশি দুটি খামারে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বছরে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন পাটবীজ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬-২৭ সালে দুই হাজার ২১০ টন, ২০২৭-২৮ সালে তিন হাজার ১৫০ টন, ২০২৮-২৯ সালে চার হাজার ৪০০ টন এবং ২০২৯-৩০ সাল থেকে পাঁচ হাজার টন পাটবীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয়ভাবে পাটবীজের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে একদিকে যেমন আমদানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কৃষকরাও কম দামে উন্নতমানের বীজ পাবেন। এতে পাটের উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে।
তাঁদের মতে, পাটবীজ উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো গেলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সহজ হবে। এর মধ্যে ‘নাবি পাটবীজ উৎপাদন’ পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আধুনিক এই পদ্ধতির মাধ্যমে কম সময়ে এবং তুলনামূলক ভালো মানের বীজ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাটের জিনোম উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই গবেষণার সুফল এখনো মাঠ পর্যায়ে পৌঁছেনি।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. এ এস এম কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন উন্নতমানের পাটবীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। অতীতে সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি। পাটবীজের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে এরই মধ্যে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের নানা পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে দেশে পাটবীজের আমদানিনির্ভরতা শুরু হয়ে ক্রমে তা আরো বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে চোরাপথে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নিম্নমানের পাটবীজ দেশে প্রবেশ করতে থাকে, যা দেশীয় পাট উৎপাদনের মান ও ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়। এই খাতের গবেষণা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৫৭টি পাটের জাত, ২২৩টি কৃষি-প্রযুক্তি এবং ৬৯টি শিল্প ও কারিগরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
সূত্র মতে, পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা শুধু আমদানি ব্যয় কমাবে না, দেশের কৃষি খাতে একটি বড় অর্জন হিসেবেও বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে দেশের সোনালি আঁশ পাটের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের পথ আরো সুগম হবে।



