রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে এগিয়ে দেওয়া আর কাউকে ফেলে রাখা মানবতার ওপর আঘাত।
রুহুল কবীর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা

রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে এগিয়ে দেওয়া আর কাউকে ফেলে রাখা মানবতার ওপর আঘাত।
রুহুল কবীর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা


বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারক ও ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত। তাঁরা জানান, আগামী দিনে দুই দেশের সহযোগিতা শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সংযোগেও তা বিস্তৃত হবে।
গতকাল রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএফএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতসহ অন্যরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমানে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। গত পাঁচ দশকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পে দেশটি যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার সুফল বাংলাদেশ নিতে পারলে উন্নয়নের গতি আরো বাড়বে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ভারত, চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন। তবে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্পায়নের জন্য চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশে আরো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সোলার প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা বাড়ানো দরকার। এ ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
তিনি বলেন, বেইজিংয়ের গ্রেট হলে এক অনুষ্ঠানে চীনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘কেরি দ্য ফ্লাগ অব ইউর মাদার অ্যান্ড ফাদার’ সেই ধারাবাহিকতায় আজ তারেক রহমান দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সংগত কারণেই আমাদের দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য পরিপূর্ণভাবে চীননির্ভর হয়ে পড়েছে। আমাদের মতো দেশকে যদি এগিয়ে যেতে হয়, আমাদের অর্থনীতির গতিকে আরো অনেক বেশি প্রবাহিত করতে হবে। আমাদের স্ট্র্যাটেজিক টার্গেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হতে পারে চীন। কেননা চীনের সেই সামর্থ্য আছে।’
তিনি বলেন, ‘চীন থেকে আমাদের বাণিজ্যের আকার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এই ২০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় সবটাই আমাদের আমদানি করতে হয় চীন থেকে। আমাদের এখান থেকে আমরা এক বিলিয়ন ডলারও রপ্তানি করতে পারি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এই রপ্তানি সামর্থ্য বাড়ানোর জন্য চীন সরকারের প্রচুর আগ্রহ আছে। এটাই হচ্ছে আমাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট।’
একই অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। সফরের তিনটি বড় অর্জন রয়েছে। প্রথমত, দুই দেশ ‘চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশ পরস্পরের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন অগ্রগতি হয়েছে। চীনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বিদেশি অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে যৌথ কর্মপরিকল্পনাও সই হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন তার সামর্থ্যের মধ্যে পূর্ণ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক করিডর এবং সমুদ্রভিত্তিক আঞ্চলিক সংযোগ গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ উদ্যোগে অন্য দেশও অংশ নিতে পারবে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, মিয়ানমারে নতুন সরকার গঠনের পর প্রত্যাবাসনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, আসিয়ান, জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা মোকাবেলায় বিশ্বের কোথাও স্থায়ী সমাধানের কোনো ‘মহৌষধ’ আবিষ্কার হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, নদী ও সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রাকৃতিক বাস্তবতা। এ কারণে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্লুইস গেট ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল শনিবার সকালে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন ২০ পরিবারের মধ্যে নতুন বাড়ি নির্মাণের প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ও গৃহস্থালি সামগ্রী হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় শক্তিশালী স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
তিনি বলেন, দেশের স্লুইস গেটগুলোর দায়িত্ব এখন থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে থাকবে না। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা পালন করবেন, যাতে প্রয়োজনের সময় দ্রুত স্লুইস গেট খুলে দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা যায়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের রাজনীতির মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে যেকোনো দুর্যোগ ও সংকটে মানুষের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। ‘সবার আগে বাংলাদেশ, ক্ষমতার আগে জনগণ’—এই নীতি সামনে রেখেই সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, শুধু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নয়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্য চাষি ও গবাদি পশু পালনকারীদের জন্যও সরকার সহায়তা কর্মসূচি নিয়েছে। যধাঁদের বীজতলা, চারা কিংবা কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাঁদের সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষয়ক্ষতির জরিপ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, সড়কসহ সব ধরনের অবকাঠামো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার সব সময় দেশের মানুষের পাশে থাকবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার জনবান্ধব ও দরিদ্রবান্ধব নীতি অনুসরণ করছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয় এবং সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটি নীতি প্রণয়ন করেছেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ, ক্ষমতার আগে জনতা’। আমরা ক্ষমতাবান নই, আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমরা জনগণের জন্য কাজ করি। যেকোনো দৈবদুর্বিপাকে সরকার জনগণের পাশে থাকবে।”