মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অবসানের ঘোষণা দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও দুই দেশের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল।
ইরানি শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দুই দিনে ইরানে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে দ্য গার্ডিয়ান গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা গত দুই দিনে ইরানের উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের রসদ ও গুদাম রয়েছে।
তবে ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন বাহিনী শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, বিমানবন্দর, রেলপথ ও বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এমনকি বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের এলাকা এবং চীন-ইরান রেল করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও আঘাত হানা হয়েছে। ইরান এই হামলাকে ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
ইরানের বুশেহর, চাবাহার, বন্দর আব্বাস ও সিরিক শহরে মার্কিন বোমা হামলার পর এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার ‘প্রতিশোধ’ হিসেবেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) উপসাগরীয় দেশগুলোতে রাতভর হামলা চালায়। কুয়েতের আকাশসীমায় তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইরান জানিয়েছে, কুয়েতের আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জুফায়ার ও শেখ ইসা ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম, স্যাটেলাইট অ্যান্টেনাসহ রসদ সরবরাহ অবকাঠামো ও জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। কাতার ও জর্দানেও মধ্যরাতে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। জর্দান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশসীমায় অন্তত আটটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ভূপাতিত করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা এই হামলাকে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের ‘লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কাতার ও কুয়েত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ওপর কোনো হামলায় অংশ নেয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যাতে তারা ওয়াশিংটনকে তাদের মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে এবং মার্কিন আগ্রাসনের ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
এদিকে এই চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে। ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোক মিছিলের পর গতকাল খামেনির মরদেহ তাঁর জন্মভূমি মাশহাদ শহরে নেওয়া হয়। সেখানে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করার কথা। মার্কিন হামলায় রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং ইরাকে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে সমাহিত করার সময় কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হলেও মার্কিন আগ্রাসন শেষকৃত্যের সূচিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে তেহরান জানিয়েছে।
বর্তমান এই সংঘাতের ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হাতে গোনা কয়েকটি ট্যাংকার ছাড়া এই রুট দিয়ে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই ইরানের ওপর থেকে ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের সিদ্ধান্ত বাতিল করায় ইরান তড়িঘড়ি করে রাতারাতি প্রায় এক কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি তেল রপ্তানি করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যেকোনো পক্ষের সামান্য ভুল হিসাব-নিকাশ এই পরিস্থিতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই, দ্য গার্ডিয়ান



