• ই-পেপার

বৃহত্তর চট্টগ্রামের চার জেলা

ঢল ও পাহাড়ধসে ৫ দিনে ৩৩ মৃত্যু

  • বান্দরবান ও কক্সবাজারে পাহাড়ধসে আরো ৭ প্রাণহানি
  • বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ পার্বত্য জেলা
  • চট্টগ্রামে পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি
  • সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে

উক্তি

উক্তি

ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।

শামা ওবায়েদ ইসলাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অবসানের ঘোষণা দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও দুই দেশের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল।

ইরানি শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দুই দিনে ইরানে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে দ্য গার্ডিয়ান গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা গত দুই দিনে ইরানের উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের রসদ ও গুদাম রয়েছে।

তবে ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন বাহিনী শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, বিমানবন্দর, রেলপথ ও বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। এমনকি বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের এলাকা এবং চীন-ইরান রেল করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও আঘাত হানা হয়েছে। ইরান এই হামলাকে গুরুতর যুদ্ধাপরাধ বলে আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

ইরানের বুশেহর, চাবাহার, বন্দর আব্বাস ও সিরিক শহরে মার্কিন বোমা হামলার পর এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) উপসাগরীয় দেশগুলোতে রাতভর হামলা চালায়। কুয়েতের আকাশসীমায় তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইরান জানিয়েছে, কুয়েতের আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জুফায়ার ও শেখ ইসা ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম, স্যাটেলাইট অ্যান্টেনাসহ রসদ সরবরাহ অবকাঠামো ও জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। কাতার ও জর্দানেও মধ্যরাতে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। জর্দান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশসীমায় অন্তত আটটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ভূপাতিত করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা এই হামলাকে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে। কাতার ও কুয়েত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ওপর কোনো হামলায় অংশ নেয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যাতে তারা ওয়াশিংটনকে তাদের মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত রাখে এবং মার্কিন আগ্রাসনের ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

এদিকে এই চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে। ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোক মিছিলের পর গতকাল খামেনির মরদেহ তাঁর জন্মভূমি মাশহাদ শহরে নেওয়া হয়। সেখানে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করার কথা। মার্কিন হামলায় রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং ইরাকে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে সমাহিত করার সময় কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হলেও মার্কিন আগ্রাসন শেষকৃত্যের সূচিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে তেহরান জানিয়েছে।

বর্তমান এই সংঘাতের ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হাতে গোনা কয়েকটি ট্যাংকার ছাড়া এই রুট দিয়ে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই ইরানের ওপর থেকে ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের সিদ্ধান্ত বাতিল করায় ইরান তড়িঘড়ি করে রাতারাতি প্রায় এক কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি তেল রপ্তানি করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যেকোনো পক্ষের সামান্য ভুল হিসাব-নিকাশ এই পরিস্থিতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই, দ্য গার্ডিয়ান

 

আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে : আইনমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি
আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে : আইনমন্ত্রী
মো. আসাদুজ্জামান

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। তবে নির্বাচনকালীন এই সরকার কোন প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, তা রায় দেখলে বোঝা যাবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। আইনমন্ত্রী গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ওপর হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপিল বিভাগে বহাল রাখা নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপি এটির জন্য বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে সংগ্রাম করেছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও যে স্লোগান দিয়ে আমরা নিরন্তর সংগ্রামের পথে হেঁটেছিলাম, সেই পথে হাঁটার মুখ্য লক্ষ্য ছিল আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। সেই প্রক্রিয়ায় ফেরার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প কোনো পথ ছিল না। আমরা সেই জায়গায় রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।

আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছিল। যে সংশোধনীগুলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছিল। যে সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্যাসিস্টের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য প্রক্রিয়া আনা হয়েছিল। যেগুলো নিয়ে আমরা বলেছিলাম, এটা আল্ট্রা ভাইরাস টু দ্য কনস্টিটিউশন। আমি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকা অবস্থায় পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনে মিস্টার বদিউল আলম মজুমদারসহ যাঁরা এই মামলা করেছিলেন এবং ইন্টারভেনার হিসেবে যাঁরা ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তখন আমাদের ইন্সট্রাকশন ছিল যে এই সংশোধনীগুলো বাংলাদেশের মানুষের জীবনে বোঝা হয়ে আছে। গণতন্ত্রের পথে অন্তরায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র উত্তরণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিকল্প কিছু নাই, তখন আমরা সাবমিশন দিয়েছিলামসেই লাইনে আমরা বলেছিলাম, সংবিধানের সেভেন ক সেভেন খ রাষ্ট্রদ্রোহিতা এটা দিয়ে অ্যাবিউজ করা হবে। এটা ফ্যাসিজমকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটা নীলনকশা।

তিনি বলেন, আপিল বিভাগ একই কথা বলে দিয়েছেন যে এটা পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেবে। আর হাইকোর্ট যেগুলো অবৈধ ডিক্লেয়ার করছেন সেগুলো বহাল রেখেছেন। সুতরাং হাইকোর্টের রায় বহাল আছে। আর বাকি যেগুলো আছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমরা পার্লামেন্টের সামনে প্লেস করব এবং সেই অনুসারে করব এবং সেখানে আমাদের এই সংশোধনীগুলো আনতে আমাদের মুখ্য বিবেচ্য বিষয় থাকবে জুলাই চার্টার। জুলাই সনদকে সামনে রেখে আমরা এই সংশোধনীগুলোকে কিভাবে মানুষের কল্যাণে যুগোপযোগী, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য উপযোগী সেটা আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে এবং পাবলিক কনসালটেশনের মধ্য দিয়ে তা সংসদে বিল আনবএই আশ্বাস দিতে পারি। আর যেগুলো অবৈধ ডিক্লেয়ার হয়েছে সেগুলো সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে।

গণভোটের যে রায় হয়েছে, সেটা সম্পর্কে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা রায়টা পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেব।

প্রক্রিয়াটা কিভাবে কত দিন লাগবেএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রায় পাওয়ার পরে আমাদের সংবিধান সংশোধন একটা কমিটি হবে, সেই কমিটির আইনি প্রক্রিয়ায় যেভাবে আসে সেভাবে আসবে। এর জন্য টাইম ফ্রেম বলা যায় না।

সংবিধানে কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হবেএমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, হবে ইনশাআল্লাহ এটা আমাদের রাজনৈতিক নির্বাচনী জাতীয় কমিটমেন্ট।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ইনশাল্লাহ, আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। এটি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আপনারা জানেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল। কিভাবে? ৯১ সালে যে নির্বাচন হলো, সেই নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে সংগ্রাম হয়েছিল, সেই সংগ্রামের ফসল ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই কনসেপ্ট থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়ায় গিয়েছি। ৯৬ সালে বিএনপি পার্লামেন্টে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিল এনেছিল। এনে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংগঠনিক রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল।

 

চট্টগ্রামে ১৯ বছরে পাহাড়ধসে ২১৬ প্রাণহানি

কাজী মনজুরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে ১৯ বছরে পাহাড়ধসে ২১৬ প্রাণহানি

প্রতিবছর বর্ষায় চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঘটনা অব্যাহত আছে। এসব ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। গত ১৯ বছরে পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর পরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপুল মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন।

২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন প্রণীত তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ২৬টি পাহাড়ে ছয় হাজার ৫৫৮টি পরিবারের বসবাস ছিল। এরপর আর এই তালিকা হালনাগাদ হয়নি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের মতে, বর্তমানে চট্টগ্রামে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালীরা পাহাড় কেটে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলার সঙ্গে জড়িত। স্বল্প আয়ের মানুষ কম ভাড়ায় বাসা পাওয়ায় ঝুঁকির কথা জেনেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন।

ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশের চশমা পাহাড় এলাকায় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে সুমাইয়া আক্তার (১২) নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। একই দিন সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ী গ্রামে আশরাফুল ইসলাম তানভীর (১০ মাস) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার রহমাননগর আবাসিক এলাকায় পাহাড়ধসে দেয়াল ভেঙে চাপা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নে পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে পটিয়ায় পাহাড়ধসে একজন এবং ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর ও আকবর শাহ থানার বেলতলী এলাকায় তিনজন মারা যান। এ ছাড়া ২০২২ সালে চারজন, ২০১৯ সালে একজন, ২০১৮ সালে চারজন, ২০১৫ সালে পাঁচজন, ২০১৩ সালে দুজন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১১ সালে বাটালি হিলে ১৭ জন এবং ২০০৮ সালে মতিঝরনায় ১২ জন পাহাড়ধসে মারা যান।

২০০৭ সালের ১১ জুন লেডিস ক্লাব, কুসুমবাগ, কাছিয়াঘোনা, মতিঝরনা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হন। চলতি বছরের ৮ জুলাই পর্যন্ত গত ১৯ বছরে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ২১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

২০০৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি পাহাড় রক্ষায় ৩৬টি সুপারিশ করেছিল। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল পাহাড়ে ব্যাপক বনায়ন, পাহাড়ের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন হাউজিং প্রকল্প নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ের ঢালে গাইডওয়াল ও ড্রেন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশের বসতি উচ্ছেদ, পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাহাড়ি বালু উত্তোলন বন্ধ করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ।

তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর নেতারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন তো পাহাড়ই নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোও মানুষ দখল করে ফেলেছে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির গাফিলতি ছিল। পরিবেশ ও পাহাড় রক্ষায় যেসব আইন রয়েছে, সেগুলো যদি সরকারি সংস্থাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করত, তাহলে পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা থাকার কথা না। জনপ্রতিনিধিরা ইতিবাচক ভূমিকা নিলে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করলে পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে দেওয়া কঠিন কিছু নয়।

চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ থানার ফয়স লেকসংলগ্ন ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল, ৩ নম্বর ঝিল এলাকা, জঙ্গল সলিমপুর, লালখান বাজার, ষোলশহর স্টেশনসংলগ্ন পাহাড়, বিজয়নগর, আকবর শাহ থানার বেলতলী ঘোনা, বার্মা কলোনি, বায়েজিদ লিংক রোড, ফিরোজ শাহ কলোনি, মতিঝরনা ও বাটালি হিল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। মূলত স্বল্প আয়ের মানুষ এসব এলাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। এসব পাহাড়ে বিদ্যুৎ ও পানির সুবিধাও রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পাহাড় রক্ষায় কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। ২০০৭ সালের দুর্ঘটনার পর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি যে ৩৬টি সুপারিশ করেছিল, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে পাহাড়ে অবৈধ বসতি থাকত না। পাহাড়গুলো চট্টগ্রামের নান্দনিক আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠত। পাহাড় সংরক্ষণের জন্য কোনো ধরনের বরাদ্দ নেই।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সরকারি আমলা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পাহাড় কাটার সঙ্গে যুক্ত। আমরা পরিবেশবাদী সংগঠন হিসেবে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। এ জন্য সভা, সমাবেশ, মিছিল, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি।

২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন প্রণীত তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ২৬টি পাহাড়ে ছয় হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করত। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে ছয় হাজার ১৭৫টি পরিবারের বসবাস ছিল। ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩৮৩টি। এরপর আর ওই তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি।

চট্টগ্রাম নগরীর বাটালি হিলের পাদদেশে একটি টিনশেড ঘরে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন রহিমা আক্তার। স্বামী দিনমজুর। রহিমা বলেন, পাহাড়ধসের ভয় তো সব সময়ই থাকে। কিন্তু এখানে বাসাভাড়া কম হওয়ায় পরিবার নিয়ে এখানেই থাকি।

চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁরা পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাঁদের সরিয়ে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁরা ভূমিহীন হলে সরকারের খাসজমি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, যাতে নিরাপদে থাকতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, অনেক সময় পাহাড়ে বসবাসকারীরাও সেখান থেকে যেতে চান না। নগরীতে সরকারি খাসজমি নেই, উপজেলার দিকে রয়েছে। কিন্তু তাঁরা সেখানে যেতে আগ্রহী নন। এ বিষয়গুলো সমন্বয় করতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরীর সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, চলতি বছর পাহাড় কাটা বন্ধে ৪৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ১১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।