চোখ-জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা রোমাঞ্চকর অনুভূতির জন্য বান্দরবানের লামা উপজেলা পর্যটনে বেশ এগিয়ে। হাতে মেঘ ছুঁয়ে দেখা কিংবা পাহাড়ি সৌন্দর্যে বুঁদ হতে চাইলে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরতে যান অনেকেই। মিরিঞ্জা, মারাইংছা হিল, সুখিয়া ভ্যালি, রিভার হিল, বিলছড়ি বৌদ্ধ বিহার, নুনারঝিরি, আইম্যারা ঝিরি, নকশাঝিরিসহ অসংখ্য ঝরনা, মাতামুহুরী নদী ও লামা খালে নৌকাভ্রমণ, দুখিয়া-সুখিয়াসহ অসংখ্য পাহাড় ট্রেকিং, লামা খাল, মাস্টারপাড়া সুড়ঙ্গসহ দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে লামা উপজেলায়।
সেদিন মে মাসের ২০ তারিখ। লামার সৌন্দর্যের টানে কক্সবাজারগামী বাসে উঠে ভোরে চকোরিয়ায় পৌঁছলাম। একক ভ্রমণ। এ জন্য অবশ্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। সেসবে এরই মধ্যে আমি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। একটি হোটেলে নাশতা সেরে নিলাম। পাহাড়ের সৌন্দর্য যেন ভালোভাবে উপভোগ করতে পারি এ জন্য ধীরগতির লোকাল বাসে উঠলাম। লামা পর্যন্ত বাসভাড়া ৭০ টাকা রাখল। মাতামুহুরী বাস সার্ভিসে চড়েছি। বাস ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। পাহাড়ের খাঁজে সবুজের সমারোহ আর আঁকাবাঁকা রাস্তা সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। লামা পর্যন্ত রোমাঞ্চকর যাত্রা বেশ উপভোগ্য লাগল।
বান্দরবানকে বলা হয় বাংলাদেশের দার্জিলিং। এখানে এলে নাকি ভারতের অন্যতম পর্যটন স্পট দার্জিলিংয়ের ফিল পাওয়া যায়! আদতেও যেন তাই। বান্দরবানের গভীর অরণ্য কিংবা পাহাড়গুলোর বেশির ভাগই থানচি, আলীকদম কিংবা লামা উপজেলার অন্তর্গত। লামা ও আলীকদম উপজেলার ঝরনাগুলোর পথ যেমন দুর্গম, তেমনি রোমাঞ্চকর। মাতামুহুরী নদীর সৌন্দর্যও কম নয়। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে। কী সুন্দর তার পথ! চারপাশে পাহাড় আর নির্জন অরণ্য। সবুজের সমাহার। লামার পথে কিছুদূর যেতেই মিরিঞ্জা ভ্যালি। চকোরিয়ার কাছাকাছি এবং যাতায়াতের সুবিধার জন্য মিরিঞ্জা ভ্যালিতে পর্যটক বেশি আসে। এখানে থাকা ও খাওয়ার জন্য কটেজ কিংবা জুমঘর পাওয়া যায়। অনেক পর্যটক ভোরে মিরিঞ্জা ভ্যালির সৌন্দর্য উপভোগ করে চকোরিয়া, মহেশখালী কিংবা কক্সবাজারে চলে যায়। কক্সবাজারগামী পর্যটকের সংখ্যাই বেশি।
ঘণ্টাখানেক সবুজ পাহাড়ি পথ পেরিয়ে লামা বাস টার্মিনালে পৌঁছলাম। লামা শহরে নেমে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের উত্পাদিত তরিতরকারি ও পণ্য বিক্রি করছে। শহরের পাশেই মাতামুহুরী নদীর খেয়াঘাট। ওপারে সুউচ্চ সব পাহাড়, অরণ্য। শহর পেরিয়েই চকোরিয়ার কয়েকটি ইউনিয়ন। এর পরেই একটি ব্রিজ। এটি পেরিয়েই সুখিয়া পাহাড়। এই পাহাড় ট্রেকিং করতে হবে। সঙ্গে পানি নেওয়া দরকার। এক দোকান থেকে পানির বোতল কিনে চলতে শুরু করলাম। মাটির আঁকাবাঁকা ভঙ্গুর পথ। চলতে কষ্ট হচ্ছে। পিচ রাস্তা থেকে পাহাড়ের সরু পথে উঠতে রোমাঞ্চকরই লাগল। কিছুদূর যেতেই মাতামুহুরী ভ্যালি। এখান থেকে নদীর দৃশ্য আরো চমত্কার দেখা যায়। এই ভ্যালিতেও জুমঘর আছে। স্থানীয় আপ্যায়নে এখানে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। পাশেই ‘আই লাভ লামা’ লেখা ফটোস্টেজ। সবাই এখানে এসে ছবি তোলে। আমিও তুললাম। এরপর আবার পাহাড়ি পথে ট্রেকিং। মাঝপথে একটি চায়ের দোকান সামনে পড়ল। সেখানে বসে চা খেয়ে খানিকটা চাঙ্গা হলাম। এখান থেকেও মাতামুহুরী নদী দেখা যায়। নদী নারীর মতো বয়ে যাচ্ছে। চারপাশের অরণ্যের বেশির ভাগই সেগুনগাছ। পোকামাকড় আর পাখির ডাক নির্জনতাকে যেন আরো মোহময় করে তুলেছে। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো হালকা ঝড়। আরেকটু পর ঝুম বৃষ্টি নামল। পাহাড়ের অরণ্যে বৃষ্টিবিলাস যে কী অপূর্ব ও উপভোগ্যময়, তা লিখে প্রকাশ করা কঠিন। আবার চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। চুমুকে চুমুকে গভীর পাহাড়ের দৃশ্য দেখছি। একটু দূরে নদী। সবুজ অরণ্য বৃষ্টিতে ভিজে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। নয়নাভিরাম দৃশ্য! অনেক আকাঙ্ক্ষা ছিল পাহাড়ি বৃষ্টি দেখার। লামার পাহাড়ে আজ সে আশা পূর্ণতা পেল। এখানে ভিড় নেই বললেই চলে। প্রচণ্ড গরম বলে পর্যটকের সংখ্যা এখন কম। এর ওপর সরকারি ছুটির দিন। এটিও পর্যটক কম হওয়ার আরেক কারণ। দুর্গম পথও পর্যটকের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু পাহাড়ে গরম নেই। উপভোগ্য আবহাওয়া।
বৃষ্টির পর দুর্গম পথ আরো পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হয়ে যায়। একটু অপেক্ষা করে ভয় ও রোমাঞ্চ নিয়েই উঠতে শুরু করলাম পাহাড়ের শীর্ষস্থান সুখিয়া ভ্যালির দিকে। উঁচু-নিচু ও ভঙ্গুর পথ। চলতে চলতে আবার একটি চায়ের দোকান পেলাম। এরপর রিভার ভিউ রিসোর্ট। এখান থেকে মাতামুহুরী নদী দেখতে আরো সুন্দর লাগে। কিছু কটেজ আছে, বসার ব্যবস্থাও আছে। কটেজের ব্যালকনি থেকে মন ভরে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। নদী, পাহাড়, সবুজ আর নীলাকাশ মিলেমিশে একাকার। আরো কিছুক্ষণ পাহাড় ট্রেকিং শেষে পৌঁছলাম সুখিয়া ভ্যালি পাহাড়ে। চমত্কার স্পট। প্রকৃতি যেন আরো মোহনীয়।
প্রকৃতপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য লামা। ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা জনপদটিকে আরো বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। চকোরিয়া টু লামা/আলীকদম যেন প্রাকৃতিক শোভাময় স্বর্গের রাস্তা। চকোরিয়া থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরের মিরিঞ্জা ভ্যালি হচ্ছে মেঘের রাজ্য। লামা যেতে চোখে পড়বে এই স্বর্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মিরিঞ্জা ভ্যালি থেকে সূর্যাস্ত দেখতে স্বর্গের মতো লাগে। এখানে লুকোচুরি খেলা করে মেঘ, পাহাড় আর অরণ্য। সমগ্র লামায়ই চলে এই খেলা। মিরিঞ্জাপাড়ায় যেন সাজেকের অনুভূতি ধরা দেয়। লামা শহরের খেয়াঘাট থেকেও মাতামুহুরী নদী যেন উপভোগ্য এক সপট। ভরা যৌবনে আরো লাস্যময়ী হয়ে ওঠে নদী ও পাহাড় ঘেরা লামা। লামাপাড়া, মারমাপাড়া, মাতামুহুরী নদী, সুখিয়া ভ্যালি, মিরিঞ্জা ভ্যালি, বিভিন্ন ঝরনা লামাকে যেন স্বর্গে পরিণত করেছে। লামা টু মানিকপুর মাতামুহুরী নদী ভ্রমণ আপনার জীবনেও হতে পারে অন্যতম স্মৃতি। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা সর্পিল নদীপথের চারদিকেই সৌন্দর্যে মোড়ানো সবুজ, পাহাড় আর জলস্রোত। দুই পাশে পাহাড়, মাঝখানে নদী। পাগল করা এমন সব দৃশ্যের মুখোমুখি হতে আপনিও একদিন যেতে পারেন লামায়।
কিভাবে যাবেন
কক্সবাজারগামী বাসে চকোরিয়ায় যাওয়া যায়। বাসস্টেশন থেকে লামার বাসভাড়া ৭০ টাকা। জিপও পাওয়া যায়। ঢাকা থেকে শ্যামলী ও হানিফ বাস আলীকদম হয়ে লামা যায়। ভাড়া নন-এসি এক হাজার ১০০ টাকা। লামার খেয়াঘাট থেকে দরদাম করে এক হাজার টাকার কাছাকাছি মানিকপুর বোট ভাড়া পাওয়া যায়। লামা পার্বত্য এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট রয়েছে। চেকপোস্ট ও আবাসিক হোটেলে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি দেওয়া লাগতে পারে।





