ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযান শুরুর প্রায় ১৪ সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধও নয়, আবার পুরোপুরি শান্তিও নয়।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনারা নিয়মিত উত্তেজনার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার পরও দায়িত্বে ফিরেছেন।
একই সময়ে পেন্টাগন ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুদ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। আর দীর্ঘায়িত মোতায়েনের কারণে সেনা সদস্যদের পরিবারও মানসিক চাপে রয়েছে।
শুক্রবার ইরান বাহরাইন ও কুয়েতের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বেড়েছে। যদিও ট্রাম্প এপ্রিল মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তবু সংঘাত কার্যত অচলাবস্থায় রয়ে গেছে।
ইরান এখনো হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে পুনরায় বড় ধরনের বিমান হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প।
সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে সেনারা
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন বাহিনীকে সর্বক্ষণ যুদ্ধ প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। ঘাঁটিগুলোতে অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, সব সময় ‘লেভেল-১০’ সতর্কতায় থাকা এবং মুহূর্তের নোটিশে অভিযানে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত চাপের ও কঠিন দায়িত্ব।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক প্রধান জোসেফ ভোটেলও বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘খুবই বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সেনাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আহত সেনাদের নতুন বাস্তবতা
যুদ্ধে আহত সেনাদের জন্য এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। মার্কিন আর্মি রিজার্ভের সার্জেন্ট কোরি হিকস ইরানি ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন। হামলায় তার শরীরে শার্পনেল বা বিস্ফোরক দ্রব্য ঢুকে একটি ধমনি ছিড়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায়। পাশাপাশি তিনি মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পান।
৩৭ বছর বয়সী প্রথম শ্রেণীর এই আর্মি বলেন, ‘ড্রোনটি দ্রুতগতিতে আসা ছোট বিমানের মতো শব্দ করছিল। এরপর সেটি ভবনে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়। আমি শুধু আগুনের বড় গোলা, প্রচণ্ড চাপ ও তাপ অনুভব করেছিলাম, তারপর আর কিছু মনে নেই।’
মার্কিন সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছেন। আহতদের ৯০ শতাংশেরও বেশি ইতোমধ্যে দায়িত্বে ফিরে গেছেন। এ পর্যন্ত সংঘাতে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
পরিবারের উদ্বেগ
দীর্ঘায়িত সংঘাত সেনাসদস্যদের পরিবারের ওপরও প্রভাব ফেলছে। ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ইয়াদিরা দেসাঁর ছেলে মার্কিন আর্মি রিজার্ভে কর্মরত। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির মধ্যেও কী কী ঘটছে তা না জানি না।’ ফলে স্বজনদের অবস্তান সম্পর্কে না জানার কারণে পরিবারগুলো উদ্বেগে থাকে।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ছেলেকে একটি বার্তা পাঠাই—সুপ্রভাত, বাবা। আমি তোমাকে ভালোবাসি। মাঝে মাঝে সে উত্তর দেয়, আমিও তোমাকে ভালোবাসি মা অথবা তোমাকে মিস করছি।
দেসাঁর দাবি, তার ছেলে কয়েকবার ইরানি ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ তার আশপাশে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি চাপের আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চললেও বিশ্লেষকদের ধারণা, যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতা কেবল যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
এদিকে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ওপরও চাপ বাড়ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ টম কারাকো বলেন, ‘যুদ্ধ শুধু অস্ত্রভাণ্ডারই ক্ষয় করে না, এটি মানুষ ও সামরিক সরঞ্জামের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে।’
গুরুতর আহত হওয়ার স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে কোরি হিকসকে। কুয়েতে যে হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন, সেখানে তার ৬ সহযোদ্ধা নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নিকোল আমর।
হিকস বলেন, ‘ড্রোনটি আঘাত হানার মুহূর্তে আমি সার্জেন্ট আমরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি আমার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে ছিলেন। এই স্মৃতি আমাকে সারা জীবন বহন করতে হবে।’