জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ত্রিশালকে ‘কবি নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি ঘোষণা শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও মননের এক নবজাগরণ। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী ঘোষণা আমাদের সামনে এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছে, যেখানে আমরা বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘হেরিটেজ থিম সিটি’ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি।
বিশ্বমানের থিম শহর হিসেবে ত্রিশালকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দুটি পথ উন্মুক্ত। একদিকে ইউরোপীয় থিম শহরগুলোর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, যা নগর ব্যবস্থাপনাকে করে তোলে অত্যন্ত কার্যকর; অন্যদিকে শান্তিনিকেতন বা কুমিল্লার বার্ডের মতো দেশীয় প্রেক্ষাপটে পরীক্ষিত ‘নগর-গ্রাম’ মেলবন্ধনের সফল নজির, যা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে প্রগাঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। তাই আমাদের পরিকল্পনাটি শুধু প্রযুক্তিনির্ভর কিংবা শুধু ঐতিহ্যবাহী হলেই হবে না, বরং এই দুই ধারার এক দারুণ সমন্বয় হতে হবে। টেকসই ও প্রাণবন্ত নজরুল সিটি গড়ার স্বার্থে আমাদের দেশীয় মাটির বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তার সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠ নির্যাসটুকু মিলিয়ে একটি সমন্বিত মডেল তৈরির দিকেই এখন নীতিনির্ধারকদের মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।
বিদেশি মডেলের সঙ্গে দেশীয় প্রেক্ষাপটের এই মেলবন্ধন কেন জরুরি, তা বুঝতে হলে আমাদের সামাজিক ও ভৌগোলিক মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে। স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন বা ডেনমার্কের ওডেন্সের মতো শহরগুলো তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে যেভাবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেছে, তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। কিন্তু একই সঙ্গে শান্তিনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের শিখিয়েছে, কিভাবে আধুনিকতার যান্ত্রিকতাকে এড়িয়ে প্রকৃতির কোলে শিল্প-সাহিত্য ও জীবনবোধকে লালন করা যায়।
শান্তিনিকেতনের তপোবনসদৃশ পরিবেশ কিংবা বার্ডের সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন মডেল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নগর মানেই কংক্রিটের জঙ্গল নয়; নগর মানে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সহাবস্থান। নীতিনির্ধারকদের কাছে আবেদন, ইউরোপীয় মডেলগুলোর কারিগরি উৎকর্ষ গ্রহণের পাশাপাশি দেশীয় এই ‘কেস স্টাডিগুলো’ নিয়ে গভীরে কাজ করা প্রয়োজন। কারণ যে প্রযুক্তি বা পরিকল্পনা স্থানীয় মানুষের জীবনধারা, আবহাওয়া ও ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে বিযুক্ত, তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হতে পারে না। আমরা এমন এক ‘হাইব্রিড নগরায়ণ’ চাচ্ছি, যেখানে প্রযুক্তি হবে আধুনিক এবং প্রাণ হবে দেশীয়।
‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’-এর প্রয়োগ এবং ‘ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)’ ও ‘ল্যান্ড পুলিং’-এর মতো কৌশলী আইনি মডেলগুলো এখানে কার্যকর করা সম্ভব। অযোধ্যার রামমন্দির নির্মাণ প্রকল্প বা সমগোত্রীয় মেগাপ্রজেক্টের ক্ষেত্রে আমরা উচ্ছেদ ও সামাজিক ভোগান্তির যে করুণ চিত্র দেখেছি, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশীদারির মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। ল্যান্ড পুলিং মডেলে স্থানীয় মালিকদের উচ্ছেদ না করে বরং তাঁদের জমির একটি অংশ উন্নয়নের কাজে লাগিয়ে অবশিষ্ট অংশকে বহুগুণ মূল্যবান করে তোলা সম্ভব, যা নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের এক আধুনিক বাস্তবায়ন।
প্রস্তাবিত নতুন এই শহরকে সফল করতে হলে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট ‘ইনক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নজরুলের সাহিত্যিক দর্শন এবং আধুনিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি চলবে। আমরা বিশ্বাস করি, শান্তিনিকেতন যেমন রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ত্রিশালও তেমনি নজরুলের দ্রোহ ও প্রেমকে অন্তরে ধারণ করে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের এক অভাবনীয় সেতুবন্ধ তৈরি করবে। যথাযথ আইনি সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণের অংশীদারি এবং দেশজ ও বৈশ্বিক জ্ঞানের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে সেই নজরুল সিটি, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হবে এক আস্থার ঠিকানা। ত্রিশালের সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, এই জনপদকে শুধু ইটের দালানে রূপান্তর না করে, একে নজরুলের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জীবন্ত নগরীতে রূপ দেওয়া সম্ভব। শৈশবে দেখা ছিমছাম নগরী ত্রিশাল এবং ভবিষ্যতের নজরুল সিটির মাঝে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারাটি অটুট রাখাই আমার এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।
পরিশেষে নজরুল সিটি যেন কোনো আর্টিফিশিয়াল শহরের প্রতিচ্ছবি না হয়ে ওঠে। আমরা এমন এক নগরীর স্বপ্ন দেখি, যা শুধু অবকাঠামোগত সূচক নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও শৈল্পিক চর্চার এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। ইউরোপীয় প্রযুক্তি আমাদের দেখাবে কিভাবে শহরকে কার্যকর করা যায়, আর শান্তিনিকেতন বা বার্ড আমাদের শেখাবে কিভাবে শহরকে মানুষের জন্য বাঁচাতে হয়। এই দুইয়ের একীভূতকরণই হবে আমাদের মূল সাফল্য।
আমাদের স্বপ্নটি যেন শুধু দাপ্তরিক নথিপত্র বা কাগজের নকশায় বন্দি না থাকে, বরং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা এবং পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ত্রিশাল যেন বিশ্বমঞ্চে টেকসই, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য ধ্রুবতারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে—এই প্রত্যাশাই আমাদের সব কাজের প্রেরণা।
লেখক : নগর পরিকল্পনাবিদ




রপ্তানি খাতের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি এখনো তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাত দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। কিন্তু একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়; পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
তারা নিরপরাধ এবং তাদের ব্যক্তিগত কোনো অপর্যাপ্ততার জন্য তারা এ কাজ করতে পারে না। দুটি দৃষ্টিভঙ্গিতে শিশু-কিশোরদের আত্মহত্যাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এক. বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আর দুই. পরিবারকেন্দ্রিক। শিশুরা একটি নির্দিষ্ট এবং বড় সময় বিদ্যালয়ে অতিবাহিত করে। এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং আড্ডায় সময় কাটে। বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি কারিকুলাম থাকে, থাকে নির্দিষ্ট কাজ, ক্লাসে অংশগ্রহণ, পড়ালেখা বিনিময় এবং এর ভিত্তিতে একাডেমিক মূল্যায়ন। পাশাপাশি তার আচার-আচরণেরও মূল্যায়ন হয়। এ কাজের মধ্যে রয়েছে সম্পর্ক, যেটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রধানত আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে থাকে। পড়ালেখার জন্য এই সম্পর্ক যদি কোনো ঘাটতি কিংবা মনোমালিন্য তৈরি করে এবং তা যদি তিক্ততায় রূপান্তরিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষার্থীদের মন কোমল এবং অনেক কিছুই তারা সহজভাবে নিতে পারে না। শিশুদের মনোজগৎ বুঝতে পারা হলো শিক্ষকের বড় কাজ। তাদের প্রতি যেমন খুব কঠোর হওয়া যাবে না, তেমনি হেলায় গা ভাসিয়েও দেওয়া যাবে না। কোমল মনে তাদের উপযোগী ব্যবহার তাদের সঙ্গে করতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরা হয়তো ক্লাসে বসেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। আড্ডার ছলে হয়তো কারো সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি কিংবা ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকদের উচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর রাখা এবং সমাধানের চেষ্টা করা।