kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

জলে-স্থলে ঈদের প্রস্তুতি!

মোস্তফা মামুন

মোস্তফা মামুন   

৬ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জলে-স্থলে ঈদের প্রস্তুতি!

ঈদের আগে শেষ লেখা। সে রকম লেখায় ঈদ ঈদ একটা ভাব থাকাই নিয়ম। দুই ঈদ ধরে সেটা করা যাচ্ছে না। করোনার হানায় ঈদ এমন দূরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে ঈদসংক্রান্ত আলোচনা ঠিক জমে না। করোনার ভয়, দূরপাল্লার গাড়ি বন্ধ মিলিয়ে বাড়ি গিয়ে ঈদোৎসব করার সুযোগও সীমিত।

এই সীমিত সুযোগে আরেকটা জিনিস সীমিত হওয়ার কথা ছিল। সড়ক দুর্ঘটনা। হয়নি। মহাসমারোহে চলছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে উল্টো ফল দেখা যাচ্ছে। এক পরিবারের চারজন মারা গেল এক ধাক্কায়। আর স্পিডবোটটা যে ডুবল সেটাতে এমন চাপাচাপি হওয়ার কারণ কি এটা যে পর্যাপ্ত যানের অভাবে যে যেখানে পারছে চড়ে বসছে! দেখে দেখে মনে হচ্ছে ঈদ উপলক্ষে এমন ঘটনা আরো ঘটবে। আর লঞ্চ দুর্ঘটনা সাধারণত ঘটে ঈদের পর। একসঙ্গে ফিরতে গিয়ে চাপে পড়ে অনেক দরিদ্র প্রাণসহ নদীতে ডোবার কত যে ঘটনা!

লঞ্চ ডোবার পর জানা যায় এর অনুমোদন ছিল না। লাইসেন্স ছিল না। সেটা যখন ঘোষণা করা হয় তখন এমন হাসি পায়। যাদের কাজ হচ্ছে অনুমোদনহীন যান চলাচল ঠেকানো তারাই দুর্ঘটনার পর বুক ফুলিয়ে এমনভাবে জানান যে এটা ছিল অনুমোদনহীন। তখন মনে হয় অনুমোদন যেন মঙ্গল গ্রহ থেকে দেওয়া হয়। আরো জানা যায়, প্রভাবশালী কোনো মানুষ নামে বা বেনামে এর মালিক ছিলেন। মানুষ মারা শেষে রং বদলে এই যানগুলো আবার চলতে শুরু করে। প্রভাবশালী মালিকদের অবশ্য রং বদলানোর দরকার পড়ে না। এই দেশের ব্যবস্থাটা এমন ক্ষয়ে গেছে যে ওরা এই রক্তলাল রং নিয়েও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন।

অতএব সড়ক দুর্ঘটনা লকডাউনের ঈদেও খুব কমবে না। লঞ্চডুবির চোখ-রাঙানিও রইল। আর কিছুই করার যখন নেই তখন চলুন রসিকতাই শুনি।

ইংল্যান্ডের এক দরিদ্র মুদি দোকানদারের ডেলিভারিম্যান পর পর দুইবার অ্যাকসিডেন্ট করল। ওসব দেশের আইন তো আর আমাদের মতো নয় যে যার যা খুশি করে জায়গামতো কিছু টাকা খাইয়ে পার পেয়ে যাবে। কাজেই দুইবার ক্ষতিগ্রস্তদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে সে প্রায় নিঃস্ব। দোকানটাই বিক্রি করে দিতে হবে এমন অবস্থায় ঘরে বসে সে আগামী অনিশ্চিত দিনগুলো নিয়ে ভাবছে। এই সময় হঠাৎ ছেলে দৌড়ে এসে বলল, ‘বাবা, তাড়াতাড়ি এসো। ভাইয়া বাসের নিচে চাপা পড়েছে।’

দোকানির মুখে হাসি ফুটল। যাক, এবার তাহলে ভাগ্য বদলাল। বিরাট ক্ষতিপূরণ পেয়ে আগের ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।

আমাদের দুর্ভাগাদের অবশ্য সে সুযোগও খুব নেই। তাত্ক্ষণিক একটা ক্ষতিপূরণ দেওয়া জেলা প্রশাসন বা সে রকম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে, তার অঙ্ক দেখে শিউরে উঠি। ওদের জীবনের দাম কয়েক হাজার টাকা! কে জানে, কয়েক হাজার টাকার জীবন বলেই বোধ হয় এ নিয়ে অত ভাবনা কারো নেই। এক পরিচিতজন একবার বলছিলেন, ‘বাংলাদেশে এই একটা জায়গায় দেখবে টাকা খুব দ্রুত দিয়ে দেয়। দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে। কেন জানো?’

‘কেন?’

‘লাশগুলো দ্রুত কবর দেওয়া বা সৎকারের জন্য। কারণ না হলে যে এই লাশগুলো পচে-গলে...’

বলতে বলতে তাঁর চেহারা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। নিজেও মাথা ঠিক ঠাণ্ডা রাখতে পারছিলাম না। থাক, চলুন আরেকটা রসিকতা শুনি।

মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে দুটি গাড়ির। দুই ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে এসেছে। একজন কথা শুরু করল, ‘এই সময় আমাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখা দরকার।’ তারপর পকেট থেকে ছোট্ট একটা মদের বোতল বের করে অন্যজনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন, এক ঢোক খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করুন। তারপর না হয় কথা বলা যাবে।’

অন্য ড্রাইভারটি এক ঢোকের বদলে কয়েক ঢোকই খেয়ে ফেলল। তারপর বলল, ‘এবার আপনি নিন।’

প্রথম ড্রাইভারটি বোতল বন্ধ করে বলল, ‘না। আমি এখন খাব না। একটু পর পুলিশ আসবে। সে যদি টের পায় যে আমি মদ খেয়েছি, তাহলে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।’

শুনেছি স্পিডবোটের চালকের কাছে সে রকম বোতলজাতীয় কিছু ছিল। সেবনও করেছিল সম্ভবত। কিন্তু এসব বোতলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাতে একটা অদৃশ্য জাদুর চেরাগও আছে, যেটা দিয়ে ওরা ঠিকই পার পেয়ে যায়। সামান্য চালকদের কী সেই শক্তির উৎস! ক্ষমতাবান মালিক। জিম্মি করার মতো শ্রমিক সংগঠন। এবং পেছনে বিরাট ক্ষমতাধর কোনো নেতা বা তেমন কেউ। কাজেই... থাক। রসিকতাতেই থাকি।

ধরা যাক আপনি পরপারে নয়, বরং আপনার বাড়িতেই পৌঁছতে চান, তাহলে তো কিছু না কিছুতে চড়তেই হবে। বিমান আছে এবং যদিও ইদানীং বিমানে চড়ার মানুষ বাংলাদেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তার পরও বেশির ভাগের সেই সামর্থ্য নেই। তাদের ভরসা হতে পারে রেল। বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনা তুলনায় অনেক কম, সেখানে জীবনের ঝুঁকিও প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু রেলে টিকিট নেই, যখন পৌঁছানোর সময় তখন হয়তো তাদের রওনা দেওয়ার সময় হয়। পত্রিকা-টিভির নানা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারছি রেলটা আসলে অনেকের পেটে ঢুকে বসে আছে। তাই রেলের উন্নতি হয় না। ওদিকে উন্নতি হয়ে তাদের কর্তাব্যক্তিদের পেট এমন ফুলছে যে সেটা দিয়ে ঢোল বাজানোও সম্ভব।

রেল সম্পর্কে ভারতীয় একটা কৌতুক হলো এ রকম। রেলের কামরায় একসময় লেখা থাকত, ‘আনা ফ্রি, জানা ফ্রি। আগার পাকড়ে গায়া তো খানা বি ফ্রি।’

মানে হলো, আসা ফ্রি। যাওয়া ফ্রি। আর ধরা পড়ে গেলে যেতে হবে জেলে, তখন খাওয়াও ফ্রি।

দুর্ভাগ্য আমাদের রেলে এখন সেই সুযোগও খুব একটা নেই। নেই এ জন্য যে ওঠারই তো জায়গা পাওয়া যায় না। আর এবারের ঈদে তো একদম বন্ধ। তাই সড়কে ও লঞ্চে ঠাসাঠাসি চলবেই। ঠেকানোর খুব কেউ নেই মনে হয়।

পুলিশ-সরকারি কর্তা এঁদের দোষ দিতে পারেন; কিন্তু মূল দায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতাদের। তাঁদের নিয়ে অনেক রসিকতা। এ রকম একটি রসিকতা হলো, এক লোক তাঁর ছেলে ভবিষ্যতে কী করবে এই নিয়ে খুব টেনশনে। শুনে এক বন্ধু পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘একটা ঘরে একটা টাকার বান্ডেল, এক বোতল মদ, একটা ধর্মগ্রন্থ আর একটা অস্ত্র রেখে দাও। তাহলেই বুঝতে পারবে ছেলে কী হবে?’

‘কিভাবে বুঝব?’

‘ছেলে যদি টাকা নেয়, তাহলে বুঝতে হবে তাঁর টাকার প্রতি আকর্ষণ আছে। সে বড়লোক হবে। যদি মদ খায় তাহলে বুঝতে হবে উচ্ছন্নে যাবে। যদি অস্ত্রটা নেয় তাহলে বুঝতে হবে সন্ত্রাসী হবে। আর যদি ধর্মগ্রন্থ নেয় তাহলে বুঝবে ছেলে ধর্মের পথে যাবে।’

মানুষটি তা-ই করলেন। তারপর উত্তেজনা নিয়ে দেখতে থাকলেন ছেলে কী করে। দেখলেন, ছেলে প্রথমে টাকাটা পকেটে ভরে নিল। তারপর মদের বোতল থেকে কয়েক ঢোক খেয়ে অস্ত্রটা কোমরে গুঁজে ধর্মগ্রন্থটা বগলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

বন্ধুটি শুনে বললেন, ‘তোমার ছেলেকে নিয়ে আর কোনো টেনশন নেই। সে নেতা হবে। টাকা, অস্ত্র, মাদক—এ সবকিছু যার চাই সেই হয় বড় রাজনৈতিক নেতা।’

এই যখন নেতাদের হাল তখন রক্ষাকর্তা তো আর নেই। ও হ্যাঁ, একটা উপায় আছে। আগে শুনে নিই গল্পটা। পুরনো গল্প, যাদের শোনা তাঁরা ক্ষমা করবেন।

একটা বাচ্চা ছেলে পানিতে পড়ছে। সবাই পাশ থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে; কিন্তু উদ্ধারে কেউ নামছে না। হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল একজন যুবক। ধন্য ধন্য রব উঠল। যুবকটি বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর সবাই তাঁর গুণকীর্তন করছে।

যুবকটি এসবকে পাত্তা না দিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমাকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলল কে? ওই বদমাশটাকে সামনে নিয়ে আসো।’

আমাদের সব জায়গায় বোধ হয় এ রকম ধাক্কা দেওয়া বদমাশ লোকদেরই এখন বেশি দরকার।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

 



সাতদিনের সেরা